advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কিছু ব্যাংকে প্রয়োজন মেটানোর টাকাও নেই

হারুন-অর-রশিদ
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ১৪:০৮
advertisement

ব্যাংকিং খাতে অর্থ সংকট তীব্র আকার নিচ্ছে। ঋণ বিতরণ দূরের কথা, প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থও নেই কয়েকটি ব্যাংকের। চাহিদামাফিক আমানত সংগ্রহ করতে না পারায় সংকট বাড়ছে ব্যাংকগুলোতে। পরিস্থিতি উত্তরণে ইতোমধ্যে সুদহারও বাড়ানো হয়েছে।

তবে সম্প্রতি ঋণখেলাপিদের লাগাতার ছাড় এবং কয়েক বছরে বিভিন্ন ব্যাংকের বড় ধরনের সংকটের কারণে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু গ্রাহক আস্থাহীনতায় নয়, সরকারের কিছু নীতির কারণে ব্যাংকের আমানত বাড়ছে না বলেও জানান ব্যাংকাররা। অধিকাংশ ব্যাংক আইনি সীমা লঙ্ঘন করে ঋণ বিতরণ করেছে। নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ ব্যাংকগুলোর কাছে নেই।

এমনকি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর অর্থ নেই কোনো কোনো ব্যাংকের। ফলে তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

বছর দুয়েক আগেও ব্যাংকগুলোর কাছে অলস অর্থ ছিল দেড় লাখ কোটি টাকা। এখন তা নেমে এসেছে ৬৩ হাজার কোটি টাকায়- সেগুলো আবার বিভিন্ন বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হিসেবে রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়ার মতো নগদ অর্থ নেই অধিকাংশ ব্যাংকের হাতে।

শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে; কিন্তু অর্থ দিতে পারছে না ব্যাংক। এ সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় আমানত বাড়ানো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চে ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চে যা ছিল ৯ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা।

এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। আমানত সংগ্রহ তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যাংকের তারল্য ৬ দশমিক ১৯ শতাংশ কমে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের মার্চে তরল সম্পদ (লিকুইড অ্যাসেট) দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা। গত বছরের মার্চে যা ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি টাকা।

এক বছরে তারল্য কমেছে ১৬ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা। ব্যাংকিং পদ্ধতি অনুসারে, ঋণের টাকা নগদ হিসেবে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া হয় না। অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়।

অর্থাৎ যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা হয়, ওই পরিমাণ অর্থ আমানত হিসেবে যোগ হয়। আবার ব্যাংকগুলো নতুন নতুন গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ঋণের তুলনায় আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি থাকার কথা।

কিন্তু এখন উল্টো ঘটছে। ঋণের তুলনায় আমানত কম বাড়ছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে নতুন আমানত সংগ্রহ আনতে পারছে না।

অন্যদিকে ব্যাংকের অর্থ ঋণের নাম নিয়ে তা ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাধারণত ঋণের টাকার অপব্যবহার বাড়লে সেই অর্থ ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে চলে যায়। গ্রাহকের আস্থাহীনতা সৃষ্টির পেছনে মূলত ৩টি কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক. সম্প্রতি ঋণখেলাপিদের মাফ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন ছাড়ের ঘটনা; দুই. ভয়াবহ অনিয়মের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জমা করা অর্থ ফেরত না পাওয়া এবং তিন. এসব ঘটনায় কাউকে শাস্তি না দেওয়া।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঋণখেলাপিদের ব্যাপক ছাড় দেওয়ার প্রভাব পড়ছে। এতে ভালো গ্রাহকও টাকা ফেরত দিতে চাচ্ছে না।

কারণ খেলাপি হলেই সুবিধা বেশি। ব্যাংক খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমলেও অর্থ রাখার বিকল্প সুযোগ কম। তাই মানুষ ব্যাংকের বাইরে অর্থ রাখবে এমনটি নয়।

তবে সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি থাকায় অনেকে সেখানে অর্থ রাখছেন। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে মূলত খেলাপিদের বিভিন্ন উপায়ে মাফ করার কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার।

কিন্তু তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ঋণখেলাপিদের আগেও ছাড় দেওয়া হয়েছে আবার নতুন করেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ঋণখেলাপিরা।

এখন সেই অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমানতকারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে ঋণখেলাপিদের। ইতোমধ্যে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিতে অবলোপন নীতিমালা ও খেলাপি নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে।

একটি নতুন নীতিমালা জারি করে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরের ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়ে জারি করা সার্কুলার স্থগিত করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবির করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এফএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। এর আগে বিগত কয়েক বছর ঋণখেলাপিরা ছাড় নিয়ে প্রায় এক লাখ কোটি খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে নিয়েছেন। সুবিধা নিয়েও তারা পরিশোধ করেননি।

আবার তারাই নতুন করে ছাড় পেতে যাচ্ছেন। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকারের সুবিধা গ্রহণ করে নয়-ছয় সুদহার কার্যকরের ঘোষণা করেন ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। কিন্তু পাহাড়সম খেলাপি ঋণের কারণে তা কার্যকর হয়নি।

আমানতকারীদের ব্যাপকহারে ঠকানোর কারণে ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কার্যকর না করলেও সরকারি ব্যাংক কার্যকর করেছে।

এ জন্য সরকারের ব্যাংকের আমানত কমে যাচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, আমরা নয়-ছয় সুদহার কার্যকর করেছি। কম সুদের কারণে আমাদের ৯ হাজার কোটি টাকা আমানত কমে গেছে।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এমডি খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সুদের কারণে গ্রাহকের আস্থা কমেছে এমন নয়, তবে প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি।

বেশি সুদে অর্থ জমা রাখার সুযোগ থাকায় গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখছেনÑ এটিই স্বাভাবিক। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত জনসাধারণ ৬৮ হাজার ৯৭২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন।

অন্যদিকে এই সময়ে ব্যাংক জমা রেখেছেন ৫৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার পরিমাণ ১৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুলাইয়ে ব্যাংকগুলোয় আমানত ছিল ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। বেসরকারি একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, প্রায় সব ব্যাংকই অর্থ সংকটে পড়েছে। এর কারণ মূলত দুটি। সরকারের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। সেই কাজে অর্থায়ন করছে ব্যাংকগুলো।

ওই সব প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে অর্থায়ন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২১৪ কোটি ডলার কেনা হয়েছে। এর বিপরীতে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিন্দুকে জমা হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রের টাকাও ব্যাংক থেকে বাইরে চলে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোয় অর্থ সংকট তীব্র হচ্ছে। সাধারণত ঋণ দিলে তা আবার ব্যাংকেই ফিরে আসে ওই অর্থ। কিন্তু এ দুটি ক্ষেত্রে তা ঘটছে না।

advertisement