advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চ্যাম্পিয়ন হতে হলে ভাগ্যও লাগবে

আলী আসিফ শাওন
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ০১:১৮
advertisement

তিন দিনের ছুটি কাটিয়ে বিশ্বকাপ দলের সঙ্গে যোগ দিতে লন্ডনে যাওয়ার আগের রাতে আমাদের সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের সময়ের রাজনৈতিক প্রতিবেদক আলী আসিফ শাওন।

সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ জয় এবং সিরিজে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সে দেশের মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে গেছে। টাইগার সমর্থকরা প্রত্যাশা করছেন, বাংলাদেশ দল আইসিসি বিশ্বকাপ জিতবে। এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রত্যাশাটা আমার কাছে মনে হয় বেশি বাড়াবাড়ি। কারণ ক্রিকেটে কিছু ব্যাপার আছে।

খেলার মাঠে উইকেট, বিশ্বকাপের মানসিক চাপ; অনেক কিছু ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। মাশরাফির মতে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে গেলে শুধু ভালো খেললে হয় না, ভাগ্যও সুপ্রসন্ন থাকতে হয়। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ধরেন আপনি ফাইনাল পর্যন্ত গেলেন এবং ওইদিনই বাজে ক্রিকেটটা খেললেন, কাপ পাবেন না। এশিয়া কাপে যেমনটা হয়েছে, ৭০ ওভার ভালো খেলার পরও ২০ ওভার বাজে খেলে আমরা ম্যাচ হেরে গেছি। যে কারণে প্রত্যাশার কথাটা ওভাবে বলা ঠিক নয়। তবে এটাও সত্যি। প্রত্যাশা কখনো কমবে না। প্রত্যাশা থাকবেই। এটা নিয়েই খেলতে হবে। আমরা যেটা ভাবছি, বেশি চাপ নেওয়া যাবে না। মানুষ প্রত্যাশা করছে তার মানে প্রচুর মানুষের দোয়াও আছে।

আশা করছি, সাপোর্টারদের দোয়া থাকলে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারব। নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) হয়েছেন প্রায় ৪ মাস। এমপি হিসেবে সময় কেমন কাটছে বা জনপ্রতিনিধির ভূমিকায় কেমন উপভোগ করছেন জানতে চাইলে মাশরাফি বলেন, আমার জন্য কাজ দুইটা। একটা হচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের প্লেয়ার হিসেবে মাঠে খেলতে হয়। আবার নড়াইলের সংসদ সদস্য।

এ কারণে খুব দ্রুত ‘মাইন্ড শিফট’ (সিদ্ধান্ত পরিবর্তন) করতে হয়। খেলার মাঠ থেকে যখন চলে আসি তখন রাজনীতির বিষয়গুলো দেখতে হয়। আবার রাজনীতি থেকে যখন খেলায় চলে যাব তখন আমাকে পুরো খেলাটা দেখতে হয়। এ সময়ের মধ্যে ভালো বা খারাাপ যে বিষয়টাই সামনে আসুক না কেন? সেটা সমাধান করতে হয়। তবে আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি।

তিনি বলেন, আর উপভোগের কথা যদি বলেন, দায়িত্ব অনেক। দায়িত্বটা কে কতটুকু অনুভব করে, সেটা বড় বিষয়। আমি যেটা অনুভব করি, আমার এলাকাটা আসলেই অনেক অনুন্নত। নড়াইলের আপামর মানুষ যেন সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতো পায় তা আপাতত আমি দেখাশোনা করছি। এবং এটা আমি উপভোগও করছি। নড়াইলকেন্দ্রিক ভাবনার শুরুটা জানতে চাইলে মাশরাফি বলেন, দিনশেষে আমি নড়াইলের সন্তান।

আমি এর আগে একটা ফাউন্ডেশন করেছিলাম, তা নিয়েও নড়াইলকেন্দ্রিক কাজ করেছি। তা না হলে নড়াইলের মানুষরাই বলত আমি নড়াইলে কিছু করিনি বা করতে চাইনি। সম্প্রতি নড়াইলের এক ডাক্তারের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়ে নিজ থেকেই তিনি বলেন, মাঝখানে হসপিটালের একটা ব্যাপার হলো, ওখানে কিছুটা কনট্রোভার্সি হয়েছে, হয়নি তা না। আমারও কিছু কথা আছে। সেই কথাগুলো আমি বলতে পারি।

আমার আঞ্চলিক ভাষার কারণে তারা হয়তো মনে করেছে আমি ধমকের সঙ্গে কথা বলেছি। আসলে তা না। এটা আমার আঞ্চলিক টান। তার জন্য আমি সব জায়গায় দুঃখ প্রকাশ করেছি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, আজকে তো ৪ মাস আমি সংসদ সদস্য হয়েছি। এর আগে আজীবন আমি প্রত্যেকটা ডাক্তারকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করি।

এইটা তো তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আমি করি। এটা তাদের বোঝা উচিত। এখনো তাদের প্রতি আমার ওই শ্রদ্ধাবোধটা আছে। আমি দেখলাম একটা অন্যায় হচ্ছে, আমি ¯্র্েরফ ওই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি। অনেকে আবার ইস্যু করার চেষ্টা করেছেন, আমি আড়াইটার সময় হাসপাতালে দেখতে গেছি ডাক্তার আছে কিনা? আমি দেখেছি কোনো ছুটির দরখাস্ত ছাড়াই হাজিরা খাতায় উনি তিনদিন ধরে অনুপস্থিত।

আমি সেটাই তুলে ধরেছি। আলটিমেটলি ওই অন্যায়ের সঙ্গে আমি কীভাবে আপস করি? কারণ, এটা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ডাক্তাররা সবাই যেন নিজ নিজ স্টেশনে থেকে কাজ করেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটাকে মূলমন্ত্র ধরে নিয়েই কাজটা করেছি। উনার ছুটির দরখাস্ত থাকলে আমি তো কোনো কথাই বলতে পারতাম না। এখন আপনারা বলেন, আমার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমি কোথায় অন্যায় করলাম? আমি যদি অন্যায় করে থাকি ওই ভাষাটার কারণে। তার জন্য আমি বাংলাদেশের সব ডাক্তারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলাম।

খেলার মাঠে কৌশলী অধিনায়ক মাশরাফি রাজনীতির মাঠে কেমন করছেন, জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, রাজনীতিতে আমি এত কৌশলী হওয়ার চেষ্টা করছিও না। কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানাই। আমি যেহেতু রাজনীতিতে নতুন আসছি, তাই আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে উনাকে জানাই, দলের সিনিয়র নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনেক সময় পরামর্শ করি।

অন্য এমপিদের ক্ষেত্রে বিরোধ দেখা যায় স্থানীয় পর্যায়ে কিন্তু ন্যাশনাল ফিগার হওয়ার কারণে সারাদেশে ‘ অ্যান্টি আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্ট’ মনে ধারণ করেন, এমন অনেকেই এখন পান থেকে চুন খসলেই আপনার বিরোধিতা করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাশরাফি বলেন, আপনি যেটা বলছেন, সেটা ঠিক। আমার এটা মেনে নিতে হচ্ছে, কিছু করার নেই। রাজনীতিতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যে পরিমাণ আক্রমণ আমাকে করা হয়েছে, আমি সেটা গ্রহণ করেছি। আমার কথা হচ্ছে, আমি কাউকে অসম্মান করেছি কিনা।

আমি আরেকটা রাজনৈতিক দলকে অসম্মান করেছি কিনাÑ সেটাও বিবেচনায় আনা উচিত। সেটা কিন্তু অন্য কেউ বিবেচনায় আনেনি। একতরফা বলে গেছে। আসলে সবার বোঝা উচিত, আমি ওই লেভেলের রাজনীতি কোনোদিন করিনি বা করতেও যাচ্ছি না। আমার এলাকার দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমি ¯্রফে নড়াইল-২ নিয়েই থাকতে চাই। আমার এলাকার কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সেটাই আমার ধ্যানজ্ঞান।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, উন্নয়ন কাজের ফলে আমার এলাকার ভিন্ন দলের, ভিন্ন মতের মানুষ যারা আছেন, তাদেরও তো উপকার হয়। ভিন্ন মতের মানুষরাও যেন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকার চেষ্টা করছি, যেন নড়াইলের পরিবেশ ভালো হয়।

নড়াইলের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে কেমন সমর্থন পাচ্ছেন জানতে চাইলে মাশরাফি বলেন, এখন পর্যন্ত সবাই আন্তরিক। আমি সেভাবেই কাজ করছি। আমাদের নড়াইলে দুটা আসন। নড়াইল ১-এ আছেন মুক্তি ভাই, উনি সিনিয়র নেতা, উনার অনেক অভিজ্ঞতা। আমি উনার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিব। আমি চাচ্ছি, সবাই মিলেমিশে কাজ করতে। তারকা ক্রিকেটার হওয়ার সুবাদে এমপি হিসেবে আপনার গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতা অনেক। মন চাইলেই প্রধানমন্ত্রী কিংবা কোনো মন্ত্রীর দপ্তরে সরাসরি চলে যেতে পারেন।

নড়াইল ২-এর মানুষ অনেক ভাগ্যবান বলতে হয়! এ প্রসঙ্গে মাশরাফি বলেন, সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আপনাকে যখন কেউ ‘অ্যাকসেস’ (প্রবেশাধিকার) দিবে, তখন আপনি বাজেভাবে সেটাকে কাজে লাগাবেন না ভালোভাবে; সেটা আপনাকেই বুঝতে হবে। আমাকে প্রধানমন্ত্রী যে আন্তরিকতা দিয়ে পছন্দ করেন, সেটা আমি বুঝি। সে কারণে আমি কাজ ছাড়া হুটহাট কোথাও যাওয়া পছন্দ করি না।

আমার নির্দিষ্ট কারণ থাকলে আমি অবশ্যই সবার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী আমাকে সহায়তা করেছেন। মোটামুটি সব মন্ত্রণালয় থেকে আমার এলাকার উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা পাচ্ছি। আলাপচারিতার ফাঁকে মাশরাফি এটাও জানিয়ে রাখলেন, বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নড়াইলের উন্নয়নের জন্য বেশ দাবিও করে এসেছেন।

এর মধ্যে নড়াইলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিটি পার্ক, ইকোনমিক জোন এবং নড়াইল ও লোহাগড়া হাসপাতাল আধুনিকায়ন অন্যতম।

advertisement