advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান খাদেমসহ অর্ধশতাধিক দায়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ০৯:১৬
advertisement

রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ২৭ প্রাণহানির ঘটনায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন খাদেমসহ অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়ী। ওই ঘটনায় গঠিত একটি তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদনে বিধি লঙ্ঘন এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দায়িত্বে ত্রুটিবিচ্যুতির প্রমাণ পেয়েছে।

গতকাল বুধবার গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যাদের নাম প্রতিবেদনে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে হুমায়ুন খাদেম ছাড়াও রাজউকের সাবেক সদস্য ডিএম ব্যাপারী, সাবেক নগর পরিকল্পনাবিদ জাকির হোসেন, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমান, সাবেক অথরাইজড অফিসার-২ সৈয়দ মকবুল আহমেদ, সাবেক সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ উল্লাহ এবং জমির মূল মালিক সৈয়দ মো. হোসাইন ইমাম ফারুককে দায়ী করা হয়েছে।

নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ হাউজিং লিমিটেড। গত ২৮ মার্চ এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন নিহত হওয়ার পর এ ভবন নির্মাণে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে এফআর টাওয়ারের ১৮ তলা আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ভবনের নকশাটি অনুমোদন প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল, তবে অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬ এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অনুমোদিত উচ্চতা লঙ্ঘন করা হয়েছে। ২০০৫ সালে ২৩ তলার যে নকশা রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট করেছিল, সেটি বৈধ ছিল না। এ ২৩ তলা নকশার ওপর ভিত্তি করে ২০, ২১ ও ২২ তলার বিপরীতে ঋণ গ্রহণের জন্য বন্ধকে অনুমতি দেওয়া ঠিক হয়নি। রাজউক ভবনটির নির্মাণ ব্যত্যয় সম্পর্কে জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ২৩ তলা ভবনের নকশাটি সংঘবদ্ধ চক্র কর্তৃক অবৈধভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা হয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ হাউজিং লিমিটেড ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

পাশাপাশি ওই জমির মালিক প্রকৌশলী ফারুক এবং এফআর টাওয়ার ওনার্স সোসাইটিও অগ্নিদুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারে না বলে মত দিয়েছে কমিটি। এফআর টাওয়ারের জমির মূল মালিক ছিলেন প্রকৌশলী ফারুক। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ভবনটি নির্মাণ করে রূপায়ণ। ভবনের নাম রাখা হয় এফআর (ফারুক-রূপায়ণ) টাওয়ার। অগ্নিকাণ্ডের পর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা চারটি তদন্ত কমিটি করে। গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ১৯৯০ সালে এফআর টাওয়ারের মাল্টিপারপাস কমার্শিয়াল ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অনুমোদন যথাযথ ছিল। ১৯৯৬ সালে ওই ভবনের ১৮ তলা আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া যথাযথ থাকলেও অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইমারত বিধিমালা মানা হয়নি।

১৯৯৬ সালে ইমারত বিধিমালা জারি হওয়ার পরও ভবনটির নকশা অনুমোদন করা হয় ১৯৮৪ সালের পুরনো বিধিমালার আলোকে। এ ক্ষেত্রে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান হুমায়ুন খাদেম দায় এড়াতে পারেন না। ৭০ শতাংশ ভবনে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা : রাজউক রাজধানীর প্রায় ৭০ শতাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে রাজউক। ৩৩ শতাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিকা-ের সময় দ্রুত প্রস্থানের জন্য বিকল্প সিঁড়ি বলতে কিছু নেই। ৬৭ শতাংশ ভবনে এ সিঁড়ি থাকলেও ব্যবহারোপযোগী মাত্র ৪৩ শতাংশ। রাজউকের ২৪টি দল ১ হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবন পরিদর্শন করে এ তথ্য দিয়েছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ১৫ শতাংশ বহুতল ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। বহুতল ভবন নির্মাণে যে পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান রাখার কথা, তা মানা হয়নি ৩৭ শতাংশ ভবনের (৬৬৯টি) ক্ষেত্রে। ৪৭৪টি বহুতল ভবন নকশা দেখাতে পারেনি, যা পরিদর্শন করা ভবনগুলোর ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ৪৪টি বহুতল ভবনেরও নকশা পায়নি রাজউক। গতকাল গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এসব তথ্য জানান।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সাংবাদিকদের এ সংক্রান্ত যে পর্যালোচনা নোট দেওয়া হয়েছে সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিদর্শন করা ১ হাজার ৮১৮ ভবনের মধ্যে ২৭৫টি ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ওই ১৮১৮টি ভবনের মধ্যে রাজউক ছাড়া সরকারের অন্যান্য সংস্থা থেকে অনুমোদিত ভবন রয়েছে ২০৭টি। এগুলোর মধ্যেও ৪৪টি ভবন ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হয়েছে নিয়ম না মেনে। ৬৬টির ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়নি। রাজউকের ২৪ দলের তদন্তে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের দেখা যায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায়। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার অ্যালার্ম, হোস পাইপ, ফায়ার হাইড্রেন্ট) ১ হাজার ২২২টি ভবনে নেই। আছে ৫৩৯টিতে। জরুরি নির্গমন সিঁড়ি যথাযথ আছে এমন ভবন ৭৮৬টি। তবে সেগুলোর মধ্যে ৫৯১টিই ব্যবহার করার মতো নয়। অগ্নিনির্গমন সিঁড়িই নেই ৬০২টিতে।

advertisement