advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সুন্দরবনে ৩ বছরে বাঘ বেড়েছে ৮টি

মো. মাহফুজুর রহমান
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ০০:৫৭
advertisement

বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনে বাঘের সঠিক সংখ্যা কত, তা জানতে ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা জরিপ কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। মাঝপথে বিরতি দিয়ে ২০১৪ সালের নভেম্বরে আবার শুরু হয়ে জরিপ শেষ হয় ২০১৫ সালের মার্চে। দুই বছর ধরে বনবিভাগ ও দেশের কয়েকজন বাঘ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে জরিপকাজ চালানো হয়। ওই জরিপে বাঘের সন্ধান পাওয়া যায় ১০৬টি। গতকাল বুধবার সর্বশেষ বাঘ জরিপের ফল প্রকাশ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন জানান, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪টি। আগারগাঁও বনভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এ জরিপের ফল প্রকাশ করেন। বনবিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০০৪ সালের

গবেষণায় সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৪৪০টি। ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা করা হয়। এতে ১০৬টি বাঘের নমুনা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালে আমেরিকার দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি অর্থায়নে বাঘ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যামেরার সাহায্যে এ গণনা করা হয়। খুলনা বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এ প্রকল্পে জনবল ও ৭০টি ডিজিটাল ক্যামেরা সরবরাহ করে।

পরিবেশ উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার আমাদের সময়কে জানান, বাঘ রক্ষায় ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্বের বাঘ আছে এমন দেশগুলোর সম্মেলনে যোগদান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, তা আমরা পালন করতে পেরেছি। ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, আমাদের দেশে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। বর্তমান জরিপে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৪টি। আমরা আশা করি, সরকারের সময়োপযোগী তৎপরতার মাধ্যমে আমরা অদূর ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়াতে পারব। তিনি বলেন, ইউএসএআইডির আর্থিক সহযোগিতায় ইবহমধষ ঞরমবৎ ঈড়হংবৎাধঃরড়হ অপঃরারঃু (ইঅএঐ) প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনার কার্যক্রম শুরু করা হয় ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত চারটি ধাপে সাতক্ষীরা, খুলনা ও শরণখোলা রেঞ্জের তিনটি ব্লকের ১ হাজার ৬৫৬ বর্গ কিমি এলাকায় বিশেষ এক ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মোট ২৪৯ দিনব্যাপী পরিচালিত এ জরিপ কার্যক্রমে ৬৩টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ, ৪টি জুভেনাইল এবং ৫টি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাঘের সর্বমোট ২ হাজার ৪৬৬টি ছবি পাওয়া যায়। ঝঊঈজ মডেলে তথ্য বিশ্লেষণ করে সুন্দরবনের প্রতি ১০০ বর্গ কিমি এলাকায় বাঘের আপেক্ষিক ঘনত্ব পাওয়া যায় ২.৫৫+০.৩২। সুন্দরবনে বাঘের বিচরণ ক্ষেত্র ৪ হাজার ৪৬৪ কিমি এলাকাকে আপেক্ষিক ঘনত্ব দিয়ে গুণন করে বাঘের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে ১১৪টি। এ হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা শতকরা ৮ ভাগ বেড়েছে। ব্লক অনুযায়ী বাঘের ঘনত্ব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শরণখোলা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (৩.৩৩ বাঘ/১০০ বর্গ কিমি) এবং খুলনা রেঞ্জে বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে কম (১.২১ বাঘ/১০০ বর্গ কিমি)।

এদিকে সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন আমাদের সময়কে জানান, ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ক্যামেরা ব্যবহার করে বাঘের একটি জরিপ করা হয়। তাতে দেখা যায়, সুন্দরবনে ২০০টি বাঘ আছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও খাবারের জোগান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বলছেন, এই বনে সর্বোচ্চ ২০০টি বাঘ বসবাস করতে পারবে। সম্প্রতি সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মোট ৩২০টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পকারখানার দূষণের প্রভাব সুন্দরবনের ওপর ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে বলে বেশ কয়েকটি গবেষণায় উঠে এসেছে।

এতে বাংলাদেশে সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধ শিকার, খাবারের অভাব এবং প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্ব কমছে। এ ছাড়া সুন্দরবন এলাকার ভেতরের নদী দিয়ে যান চলাচল ইত্যাদিও প্রভাব ফেলছে বাঘের বসবাসে।

ইতিহাস বলছে, বনবিভাগ বিভিন্ন সময়ে বাঘের সংখ্যার ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। বনবিভাগের হিসাবে বাঘের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ও কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে বনবিভাগ জানিয়েছিল, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ৪৪০। আবার ২০০৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান ক্যামেরা পদ্ধতিতে বাঘ গণনা করে জানান, বাঘের সংখ্যা ২০০। দুটি হিসাবই সঠিক ধরে নিলে বলতে হয়, মাত্র দুই বছরে বাঘ ২৪০টি কমে গেছে।

২০১০ সালে বনবিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশের যৌথ জরিপে বাঘের সংখ্যা হয় ৪০০ থেকে ৪৫০। এ তথ্যও সঠিক ধরলে বলা যেতে পারে, ৪ বছরে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ২০০৪ সালের অবস্থায় ফিরে গেছে। এর পাঁচ বছর পরের এক হিসাবে ক্যামেরা পদ্ধতিতে ২০১৫ সালে সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপে বনবিভাগ জানায়, বাঘের সংখ্যা ১০৬টি। বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে পুরো সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১৭০ বলে জানানো হয়। পরের বছর ২০১৬ সাল থেকে বনবিভাগ ও ওয়াইল্ড টিম বাঘ গণনা কাজ করে। এর পর ভারতের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের পশ্চিমবঙ্গ অংশে বাঘের সংখ্যা ১০০ বলা হয়। আর এবার বাংলাদেশ দাবি করল, সুন্দরবনে গত ৩ বছরে ৮টি বাঘ বেড়ে মোট সংখ্যা ১১৪ দাঁড়িয়েছে।

advertisement