advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জল সংকটে বন্ধের উপক্রম কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প

জিয়াউর রহমান জুয়েল, রাঙামাটি
২৩ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ০০:৫৭
advertisement

বিশালাকার টারবাইনের ওপর দিয়ে জলধারা গড়িয়ে পড়ে যে শক্তি তৈরি হয় তা দিয়েই উৎপাদন হয় জলবিদ্যুৎ। আর এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে বিশেষ প্রকল্পবাঁধ দিয়ে পানি ছাড়ায় অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে কাপ্তাই হ্রদের পানি। এমনিতেই চলছে খরা মৌসুম, তার ওপর বৃষ্টি না হওয়ায় ‘পানি সংকটে’ পড়েছে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের চারটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাকি ইউনিটটিও সচল রাখা হয়েছে কোনোভাবে। ফলে ২৪২ মেগাওয়াটের স্থলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে কেবল ৩০ মেগাওয়াট। সহসাই বৃষ্টি না হলে সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএ আবদুজ্জাহের।

১৯৬০ সালে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর প্রবাহে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মিষ্টি পানির কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ। বিদ্যুতের পাশাপাশি প্রকল্পকে ঘিরে মৎস্য উৎপাদন, নৌ-যোগাযোগ, জলেভাসা জমিতে কৃষি

চাষাবাদ, সেচ, ব্যবহার্য পানি সরবরাহ, পর্যটনসহ যোগ হয় বিভিন্ন সুযোগ ও সম্ভাবনা। কিন্তু দীর্ঘ ৫৯ বছরে একবারও কাপ্তাই হ্রদের সংস্কার, ড্রেজিং বা খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পলি জমে আর নিক্ষেপ করা হাজার হাজার টন বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে হ্রদের তলদেশ। এতে নাব্যতা কমে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কৃত্রিম এ জলাশয়। আর ফিবছর শুষ্ক মৌসুমে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় নৌ-পরিবহনও বিঘিœত হয়। সেই সঙ্গে হ্রদটি ঘিরে জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল মানুষরাও পড়েন সংকটে। তাই দ্রুত ড্রেজিং করে নাব্যতা না ফেরালে সম্ভাবনাময় হ্রদটি পরিত্যক্ত জলাশয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএ আবদুজ্জাহের। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ‘রুলকার্ভ অনুযায়ী বর্তমানে হ্রদে পানি থাকার কথা ৭৮ দশমিক ২২ এমএসএল (মিন সি লেভেল)। কিন্তু রয়েছে ৭২ দশমিক ৪৫ এমএসএল। পানির উচ্চতা ৬৮ এমএসএলে নেমে গেলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব ইউনিটই বন্ধ হয়ে যাবে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

দেশের বৃহৎ এ হ্রদের ওপর নির্ভর করে চলছে মৎস্য ভা-ার, পর্যটন শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য। এ হ্রদের নৌপথই জেলার ছয়টি উপজেলার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। প্রতিবছর খরা মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে হ্রদে জেগে উঠে অসংখ্য ডুবোচর। কিন্তু এবার অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। দখল, দূষণ আর মানবসৃষ্ট বর্জ্যরে সঙ্গে পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় কাপ্তাই হ্রদে দেখা দিয়েছে নাব্যতা সংকট। এ কারণে মধ্য এপ্রিল থেকে রাঙামাটি জেলা শহরের সঙ্গে বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলার যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। আর এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ছয় উপজেলার চার লাখেরও বেশি মানুষ। বর্তমানে ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় চড়ে কিংবা হেঁটেই দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে দুর্গম উপজেলাবাসীকে। তবে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ওইসব উপজেলায় পণ্য পরিবহনে বেড়েছে কয়েকগুণ খরচ আর দুর্ভোগ। আর এতে বেড়ে গেছে নিত্যপণ্যের দাম। বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। খেটে খাওয়া কয়েক লাখ মানুষের হাতে এখন কোনো কাজ নেই।

বরকল উপজেলার স্থানীয় সাংবাদিক পুলিন বিহারী চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ে এবার মৌসুমি ফলের ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় সেগুলো রাঙামাটি শহরে নিতে না পারায় দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। এতে উৎসাহ হারাচ্ছেন তারা।’ রাঙামাটি নৌ-পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম বলেন, ‘হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় মধ্য এপ্রিল থেকে ছয় উপজেলায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়েছেন পাঁচ শতাধিক নৌযান শ্রমিক।’ কাপ্তাই হ্রদ রক্ষা ও নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত এটির ড্রেজিং করার দাবি জানিয়েছেন এ নেতা।

বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর মো. মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের চলাচলকারী নৌযানের পারমিট আমরা ইস্যু করি। কিন্তু হ্রদটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় ড্রেজিংয়ের বিষয়ে কিছুই বলতে পারছি না। সরকার অনুমতি দিলে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করব।’

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘নাব্যতা সংকটে দিন দিন কাপ্তাই হ্রদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, লঞ্চ চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। হ্রদের ড্রেজিং না হওয়া পর্যন্ত সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। কাপ্তাই হ্রদের ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার জন্য আমরা বারবার উচ্চ পর্যায়ে চিঠি দিয়েছি। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএর একটি প্রতিনিধি দল সার্ভে করে গেছে। তার পরও কেন কাজটি হচ্ছে না তা আমি বুঝে উঠতে পারছি না।’

তবে আশার কথা শুনিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে গত ৫ মে কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি দবিরুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘দেশে মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে কাপ্তাই লেক। জেলার একটি বড় অংশের জীবিকাও এর ওপর নির্বাহ করছে। তবে অবৈধ দখল, দূষণ, পলি ভরাটসহ নানা কারণে লেকটি তার স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। এজন্য এটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’