advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খুশির ঈদ ও নজরুলজয়ন্তী

যতীন সরকার
২৪ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ মে ২০১৯ ০৯:২৩
advertisement

‘ইসলাম বলে সকলের তরে মোরা সবাই,/সুখ-দুঃখ সমভাগে ভাগ করে নেবো সকলে ভাই, নাহি অধিকার সঞ্চয়ের!/কারো আঁখি জলে কারো ঝাড়ে কিরে জ্বলিবে দ্বীপ?/দু’জনার হবে বুলন্দ্নসিব, লাখে লাখে হবে বদ্নসিব/এ নহে বিধান ইসলামের।’ রমজানের রোজার শেষে যে ঈদ আসে, সেই ঈদুল ফিতর উপলক্ষ করেই কাজী নজরুল ইসলাম এই কথাগুলো লিখেছিলেন এবং সবাইকে ইসলামের মর্মবাণী স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

শুধু এখানেই নয়, আরও অনেক অনেক লেখার মাধ্যমে তিনি তেমনটি করেছেন। কবিতাসহ প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতিতেও ইসলামের প্রাণশক্তিরই উদ্ঘাটন করেছেন। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর কাছে লিখিত একটি পত্রে একান্ত দৃঢ় আস্থার সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইসলামের সত্যিকার প্রাণশক্তি গণতন্ত্রবাদ, সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সমানাধিকারবাদ।’ ১৯৪০ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্মেলনে সভাপতির ভাষণেও তিনি বলেছিলেন, ‘ধনীর দৌলতে, জ্ঞানীর জ্ঞানভাণ্ডের সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে।

এ নীতি স্বীকার করেই ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে পেরেছে। আজ জগতের রাজনীতির বিপ্লবী আন্দোলনগুলির যদি ইতিহাস আলোচনা করে দেখা যায়, তবে বেশ বোঝা যায় যে, সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রবাদের উৎস মূল ইসলামেই নিহিত রয়েছে। আমার ক্ষুধার অন্নে তোমার অধিকার না থাকতে পারে। কিন্তু আমার উদ্বৃত্ত অর্থে তোমার নিশ্চয়ই দাবি আছে-এ শিক্ষাই ইসলামের।’ এ ১৯৪০ সালেই তখনকার মুসলিম লীগ লাহোরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ উত্থাপন করে।

মুসলমানের রাষ্ট্র পাকিস্তানে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ঘটবে-এমন কথাই নানা ভাব ও ভাষায় তারস্বরে ঘোষিত হতে থাকে এবং এতে মুসলমান সমাজে এক ধরনের মৌতাতের সৃষ্টি হয়ে যায়। ইসলামের প্রতিষ্ঠাকে লক্ষ্যবিন্দুতে রেখেই পাকিস্তান আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। এমনকি বামপন্থিদেরও কেউ কেউ ‘মুসলমানের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ তথা পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষাবলম্বী হয়ে ওঠেন এবং পাকিস্তানে শোষণমুক্তির সুযোগ অবারিত হয়ে যাবে বলেও মনে করেন। অথচ নজরুলের চিত্তে পাকিস্তান সম্পর্কে সামান্য মোহত্ব সঞ্চারিত হয়নি, বরং তিনি প্রস্তাবিত পাকিস্তানকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ফাঁকিস্তান’।

বাস্তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাঁচ বছর আগেই নজরুলের চিন্তক ও বাচকজীবনের অবসান ঘটে। তাই পাকিস্তান কীভাবে ইসলামকে নিয়েই চূড়ান্ত ফাঁকিবাজি করে চলছিল, নজরুল তা অনুভব করতে পারেননি অথবা সেই অনুভবের বাণীরূপ দিতে পারেননি। তবে আমরা সবাই সেই ফাঁকিবাজি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। শুধু পাকিস্তান জমানার কথাই বা বলি কেন? অপরিমেয় জ্ঞান আর মানের বিনিময়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা অর্জন করেছি, সেই বাংলাদেশেও কি ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা’, তেমন মানুষদের দেখা মেলে না? কিংবা দেখা মিললেও তাদের সংখ্যা কি একেবারে কোটিকে গুটিক? না। যা কাক্সিক্ষত, বাস্তবে তা হয়নি।

সেই কত বছর আগে নজরুল তার কবিতায় যেসব প্রশ্ন রেখেছিলেন, সেসব একটি প্রশ্নেরও কাক্সিক্ষত উত্তর আমরা পাইনি। তাই আজও সেই প্রশ্নসংকুল কবিতাটি পড়ে আমাদের কেবলই হাহাকার করতে হয়-‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনি নিজ/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?/দীন কাঙালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাগিদ/কোথা সে মহান শক্তিসাধক আনিবে যে পুন ঈদ?/ছিনিয়া আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি/ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি?/ সমাধির মাঝে গণিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?/রোজা ইফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।’ তবে এ সঙ্গেই মনে রাখা উচিত : নজরুল শুধু প্রশ্ন উত্থাপন করেই ক্ষান্ত হননি কিংবা আমাদের জন্য কেবল হাহাকারের উপাদানই রেখে যাননি। উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল এবং হাহাকারের বদলে আমাদের করণীয়ও তিনি নির্দেশ করে দিয়ে গেছেন।

বঞ্চকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বঞ্চিতদের যা করতে হবে ও বলতে হবে, তারও দিশা দেখিয়ে স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলে দিয়েছেন-‘সিঁড়িওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ/চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা;/মোদের হিস্যা আদায় করিতে ঈদে/ দিল হুকুম আল্লাহ-তা’লা।/দ্বার খোলো সাততলা-বাড়িওয়ালা, দেখো কারা দান চাহে/মোদের প্রাপ্য নাহি দিলে যেতে নাহি দেবো ঈদগাহে।’ তখনকার সাততলা বাড়িওয়ালার উত্তরসূরিরা আজ কততলার মালিক? তাদের কুকা-ের শিকার হয় যারা, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাদের দুরবস্থার খবর কি আমরা প্রতিনিয়তই পাই না?

কিন্তু সেসব দুরবস্থার প্রতিকারের তাগিদ কি আমরা অনুভব করি? নজরুলের ঈদের কবিতা কি আমাদের ঘা মেরে জাগিয়ে দেয়? শুধু ঈদ কিংবা অন্য অন্য ধর্মীয় পার্বণ উপলক্ষ করে কবিতা লিখেই নজরুল তার সামাজিক দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ হলো বলে মনে করেননি। প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বদল ঘটানো ছাড়া ‘চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালারা’ যে তাদের ‘হিস্যা আদায়’ করে নিতে পারবে না, এ বিষয়ে তিনি ছিলেন পূর্ণ সচেতন। সেই সচেতনতা থেকেই তিনি প্রগতি-চেতন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন এবং সে রকমই একটি সংগঠন শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘লাঙল’-এর সম্পাদক হয়েছিলেন। এই ‘সম্প্রদায়ের’ ইশতেহারটিও তিনিই রচনা করেছিলেন।

এতে ছিল-‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতাসূচক স্বরাজ্য লাভই এই দলের উদ্দেশ্য।... আধুনিক কলকারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টিমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকরী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতদসংক্রান্ত কর্মিগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে। ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্তশাসনবিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের উপর বর্তিবে-এই পল্লীতন্ত্র ভদ্র-শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’ ‘লাঙল’ পত্রিকায় এ ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং কী আশ্চর্য, এর ৪৬ বছর পর আমরা আরেক ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলাম।

সেই রাষ্ট্রের যে সংবিধান আমরা রচনা করেছিলাম, এতে তো নজরুল রচিত ইশতেহারটির মূল মর্মই প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন : আমরা কি এর মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি? পারিনি যে-সে কথা প্রমাণ করার জন্য বাকবিস্তারের প্রয়োজন পড়ে না। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই আমরা স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছি, রক্তের অক্ষরে লিখিত সংবিধানকে কাটাকুটি করে করে এর মূল মর্মকেই পরিত্যাগ করেছি, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ থেকে বহু দূরে সরে এসেছি।

কাজী নজরুল ইসলামকে ‘জাতীয় কবি’রূপে ঘোষণা দিয়েছি। কিন্তু তার ভাবনা ও কর্মের সদর্থক উত্তরাধিকার বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। নজরুলের দৃষ্টিতে যেভাবে ইসলামের চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন ঘটেছিল, সেই সত্যকে যথাযথভাবে অনুধাবন ও অনুসরণের কোনো চেষ্টাই আমরা করিনি। ইসলামের নাম নিয়ে শোষণভিত্তিক বৈষম্যমূলক সমাজবিধানের প্রতি যারা সমর্থন জ্ঞাপন করে, তাদের ইসলামবিরোধীরূপে অবলোকন করে তীব্র ঘৃণার প্রকাশ ঘটিয়ে নজরুল তার ‘ভাঙার গান’ কাব্যের ‘শহিদী ঈদ’ কবিতায় লিখেছিলেন-‘ইসলাম তুমি দিয়ে কবর/মুসলিম বলে কর ফখর/মোনাফেক তুমি সেরা বে-দীন।/ইসলামে যারা করে জবেহ/্তুমি তাহাদেরই হও তাবে/তুমি জুতো বওয়া তারই অধীন!/নামাজ রোজার শুধু ভড়ং/ইয়া উয়া প’রে সেজেছ সং/ত্যাগ নাই তোর এক দিদাম!/কাঁড়ি হাঁড়ি টাকা কর জড়,/ত্যাগের বেলাতে জড়সড়!/তোর নামাজের কি আছে দাম?’

ঈদের মতো ইসলাম ধর্মীয় উৎসবকে বিষয়বস্তু করে কবিতা রচনা করতে গিয়েও কিংবা তার অন্যবিধ রচনায় ইসলামের মর্মার্থ উদ্ঘাটন করতে গিয়েও নজরুল প্রথাগত ধর্মের চেতনাকে অনুষ্ঠান সর্বস্বতার ভার থেকে মুক্ত করে এনেছেন, সাম্প্রদায়িকতার খোলস ভেঙে সর্বজনীন মানবিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এমনটিই করেছেন হিন্দু ধর্মীয় উৎসব কিংবা পুরাণের নবজন্ম ঘটানোর ক্ষেত্রেও। এবারের অর্থাৎ ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠে, বিশেষ করে রমজান ও ঈদুল ফিতর নিয়ে নজরুলীয় ভাবনাকেই স্মরণ করছি। কারণ এবারের নজরুলজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে সেই সময়টিতে-যখন ‘রমজানেরই রোজার শেষে আসছে খুশির ঈদ’।

সেই ঈদ যাতে সবারই জন্য খুশির বার্তা নিয়ে আসে, কারো জীবনেই যাতে হররোজ রোজা না থাকে, নজরুলকাক্সিক্ষত ‘পূর্ণ স্বাধীনতামূলক স্বরাজ্যের’ স্বাদ যাতে আমরা পূর্ণরূপে পেতে পারি-তেমনটিই তো আমাদের কাম্য। সেই কাম্য সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে লক্ষ্যবিন্দুতে রেখেই তো নজরুল ‘বিদ্রোহী’ হয়েছিলেন। বিদ্রোহীর সেই প্রত্যয় ও প্রতিজ্ঞা ধারণ করেই পালিত হোক এবারের নজরুলজয়ন্তী। য় যতীন সরকার : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক