advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মুহম্মদ আকবর
২৪ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ মে ২০১৯ ০৯:০৭
advertisement

সংগীতের শিক্ষক, রবীন্দ্রসংগীত-স্বরলিপিকার শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রয়াণবার্ষিকী আজ। ১৯৯২ সালের ২৪ মে তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। অবিকৃত স্বর ও উচ্চারণে তিনি দীর্ঘকাল রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষা দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে পৃথিবীব্যাপী যাদের খ্যাতি রয়েছে, প্রায় সবাই তার শিক্ষার্থী কিংবা অনুসারী। ক্ষণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এর উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

শুধু শিক্ষাদানেই নয়, বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রসংগীত তথা রবীন্দ্রসাহিত্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের অবদান। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে ১৯৩০ সালে শান্তিনিকেতনের বাইরে বিশ্বে প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনই এর প্রমাণ। অথচ তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভুলতে বসে এপার-ওপার বাংলার মানুষ। বলা যায়, দীর্ঘদিন তাকে নিয়ে তেমন আলোচনাই ছিল না। তার জন্মস্থান নেত্রকোনার গুটিকয়েক ব্যক্তি তার কর্ম তো দূরে থাক, তার নামও কেউ জানত না।

প্রায় তিন দশক পর বর্তমানে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাহাম গ্রামে মহাসমারোহে গড়ে উঠছে শৈলজারঞ্জন মজুমদার সংস্কৃতিকেন্দ্র। বাহাম গ্রামেই জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। মোহনগঞ্জের সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিত এ কাজটির উদ্যোক্তা ও বাস্তবায়নকারী হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান। শৈলজারঞ্জন মজুমদার রসায়নের কৃতী ছাত্র ছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯২৬ সালে প্রথম শ্রেণি পেয়ে কেউ উত্তীর্ণ হননি। এর পর সুযোগ পান শান্তিনিকেতনে রসায়নের শিক্ষকতা করার। তবে এর আগেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এক সময় রসায়ন বাদ দিয়ে সংগীতের ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পর্যায়ক্রমে হয়ে যান সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ।

টানা ২০ বছর তিনি ওই দায়িত্ব পালন করেন। সংগীত ও রসায়নশাস্ত্র, দুদিকেই সমান দরদ থাকায় রবীন্দ্রনাথ তার প্রসঙ্গে ‘সংগীতের রসায়ন’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। তার জন্মদিনে লেখা রবীন্দ্রনাথের আশীর্ব্বাণী, ‘জন্মদিন এল তব আজি,/ভরি লয়ে সংগীতের সাজি/বিজ্ঞানের রসায়ন রাগ রাগিণীর রসায়নে পূর্ণ হলো তোমার জীবনে।/কর্মের ধারায় তব রসের প্রবাহ যেথা মেশে/সেইখানে ভারতীর আশীর্ব্বাদ অমৃত বরষে।’

শৈলজারঞ্জনকে গীতাম্বুধি (গীত+অম্বুধি) অর্থাৎ গানের সাগর, গানের টাইপ মাস্টার বলে রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই ডাকতেন। শৈলজারঞ্জনের কারণেই নেত্রকোনার প্রতি তার দরদ ছিল, ছিল কৌতূহল। তবে অবিভক্ত ভারতে বাংলাদেশের নানা জায়গায় গেলেও নেত্রকোনায় তিনি কখনো যাননি। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের পরম ঘনিষ্ঠ নির্মলকুমারী মহলানবিশের বইয়ে পাই, ‘একদিন রবীন্দ্রনাথ দুটি কবিতা লিখেছিলেন। একটির নিচে লেখা নেত্রকোনা এবং অন্যটির নিচে লেখা জোড়াসাঁকো।

হেসে রবীন্দ্রনাথ বলছিলেন, আগামী প্রজন্মের কাছে একটি ঝগড়ার উপাদান রেখে গেলাম। কেউ হয়তো বলবে, তৎকালীন হয়তো যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ছিল। সকালে নেত্রকোনা গিয়ে বিকালে জোড়াসাঁকো ফেরা যেত। আবার কেউ হয়তো বলবে, রবীন্দ্রনাথের নামে অনেক লেখাই প্রকাশিত হয়েছে। এটিও হয়তো তা-ই হবে। ইতিহাসের ঝগড়া তো এভাবেই জমে ওঠে।’ আবার রবীন্দ্রনাথ বেলঘরিয়ায় থাকা অবস্থায় একটি জানালার নাম দিয়েছিলেন নেত্রকোনা।

‘শ্যামলে’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে পাই, “জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে/ আমের শাখায় আঁখি ধেয়ে যায় সোনার রসের আশে।/লিচু ভরে যায় ফলে, বাদুড়ের সাথে দিনে আর রাতে অতিথির ভাগ চলে।/বেড়ার ওপারে মৈমুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোন, চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি, ‘নেত্রকোনা’।”

১৯৩০ সালে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের পর শৈলজারঞ্জনকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনÑ ‘কল্যাণীয়েষু, তোমাদের নেত্রকোনায় আমার জন্মদিনের উৎসব যেমন পরিপূর্ণ মাত্রায় সম্পন্ন হয়েছে, এমন আর কোথাও হয়নি।... তুমি না থাকলে এই উপকরণ সংগ্রহ করত কে?...’

শৈলজারঞ্জন মজুমদার ১৯৩০-১৯৪১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনায় রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেছিলেন। এ ছাড়া স্বাধীনতার পর তিনবার বাংলাদেশে এসে তৃণমূলে রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষাদানের গুরুত্বের কথা বলেছেন। আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথকে দেবতার মতো মনে করতেন তিনি। আর রবীন্দ্রসংগীত চর্চাকে ভাবতেন প্রার্থনার মতো। রবীন্দ্রসংগীতে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার ব্যক্তি নন। গুণী এই ব্যক্তির প্রয়াণবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

মুহম্মদ আকবর : গণমাধ্যমকর্মী

advertisement