advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘হাইকোর্টকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ মে ২০১৯ ০১:২৮
advertisement

মানহীন ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও জব্দে হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের প্রতি আদালত অবমাননার রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। কেন তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু করা হবে না, তা জানাতে চেয়ারম্যানকে আগামী ১৬ জুন সশরীরে আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।

বাকি ৯৩ পণ্যের পরীক্ষার ফলের প্রতিবেদন ১৬ জুনের মধ্যে দাখিল করতে বিএসটিআইর প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ এ আদেশ দেন। ৫২ পণ্য প্রত্যাহার ও জব্দ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতিবিষয়ক শুনানিতে এ আদেশ দেওয়া হয়।

শুনানির সময় আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, ‘পণ্য জব্দ ও প্রত্যাহার করতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আপনারা একটি মসলার প্যাকেটও জব্দ করতে পারেননি। ভদ্রতার একটি সীমা আছে। ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করবেন না। আপনারা চিঠি দিয়েছেন, অনুরোধ করেছেন, কিন্তু পণ্য জব্দ বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেননি।

ইস্কাটনের অফিসের পাশে ১৭ জন (মোট জনবল) ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ মিলে একটি পণ্যও জব্দ করতে পারলেন না? আপনাদের অফিস রাখার দরকার কি? ভয় পাচ্ছেন? বড় বড় ব্যবসায়ী (পণ্য উৎপাদনকারী) কী করে ফেলেন বা কী করবেন। এমনটি হলে চাকরি করার দরকার কী? ঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার কাজ শুরু করে দেন। নতুবা ব্যাংকে গিয়ে কেরানির চাকরি করতে বলেন।

বসে বসে টাকা গুনবেন, টাকার হিসাব রাখবেন।’ আদালত এ-ও বলেছেন, ‘হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন? আমরা এগুলো বুঝি। বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সোজা না বলে বাঁকাভাবে বলছেন।’ গত ১২ মে এক রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট বাজার থেকে ৫২টি পণ্য সরিয়ে নিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।

এই সঙ্গে ওই আদেশ বাস্তবায়ন করে বৃহস্পতিবার আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। গতকাল শুনানির শুরুতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের আইনজীবী মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, পত্রিকায় এসব পণ্যের নাম উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। অনেকে পণ্য প্রত্যাহার করেছে। যারা করেনি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আদালত বলেন, বাজার থেকে কোনো পণ্য অপসারণে অভিযান পরিচালনা করেননি?

আইনজীবী বলেন, আমাদের জনবল কম। মাত্র ১৭ জন। আদালত বলেন, আদেশ দিয়েছিলাম বাজার থেকে পণ্য অপসারণ করতে। কিন্তু আপনারা একটা মসলার প্যাকেটও অপসারণ করতে পারেননি কেন? হাইকোর্ট বলেন, বিএসটিআই কী করেছে সেটা দেখব না। আপনি (নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ) কী করেছেন সেটা বলুন। আদেশ বাস্তবায়ন না করার জন্য আবার কাঠগড়ায় এনে দাঁড় করানোর সংস্কৃতি চালু করতে হবে?

আমাদের টেম্পারামেন্টকে চ্যালেঞ্জ করবেন না। আইনজীবীর উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, আদালতের আদেশের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখাতে পারলেন না। ল’ইয়ারদের চালাকি আমরা বুঝি না? সোজা কথা না বলে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা। এভাবে অজুহাত দেখিয়ে মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানো যাবে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যা করেছে, সেটা আইওয়াশমাত্র। এসিআইয়ের লবণ, প্রাণের হলুদ গুঁড়া ও লাচ্ছা সেমাই নিয়ে হাইকোর্ট বলেন, এই দুটি কোম্পানি দেশের বড় কোম্পানিগুলোর যে তালিকা রয়েছে সেখানে নাম রয়েছে। তাদের যদি হয় এ অবস্থা, তা হলে মানুষ কোথায় যাবে। মানুষকে যে কতরকমভাবে ঠকানো যায়, এসব ঘটনাই তার প্রমাণ।

আদালত বলেন, ভেজাল বা নিম্নমানের পণ্যের মূল কথাই হচ্ছে মানুষ খেতে পারছে না। খেলে ক্যানসার হবে। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নেওয়া পদক্ষেপে প্রশংসা করেছেন আদালত। এই সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এসব পণ্য জব্দ ও ধ্বংস করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ৯৩ পণ্যের রিপোর্ট দিতে হবে বিএসটিআই ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা বাজার থেকে সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে।

এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ফলে ৫২টি পণ্য নিম্নমানের উল্লেখ করে সংস্থাটি। বাকি ৯৩টি পণ্যের বিষয়টি পরীক্ষাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়। রিটকারী আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ৯৩টি পণ্যের বিষয়ে রিপোর্ট দাখিল করা দরকার। পরে হাইকোর্ট ১৬ জুনের মধ্যে ওই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বিএসটিআইয়ের চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন।

আদেশ সংশোধন করেননি আদালত : আদেশ সংশোধনে কোম্পানিগুলোর আবেদনে সাড়া দেননি হাইকোর্ট। এসিআই, প্রাণ, সান চিপস কোম্পানিগুলো হাইকোর্টের আদেশ সংশোধনের জন্য আবেদন জানায়। আদালত ওই আবেদন গ্রহণ করেননি। তবে এসব কোম্পানির নতুন উৎপাদিত পণ্যের ওপর পরীক্ষা করে ১৩ জুনের মধ্যে আদালতে রিপোর্ট দাখিলের জন্য বিএসটিআইকে বলা হয়েছে।

আদালতে কোম্পানির পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এমকে রহমান ও তানজীব উল আলম প্রমুখ শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান। উল্লেখ্য, গত ৩ ও ৪ মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়, বিএসটিআই সম্প্রতি ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি পণ্য ভেজাল ও নিম্নমানের।