advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে গেরুয়া রাজনীতির বিস্তার

আবুল মোমেন
২৪ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৪ মে ২০১৯ ০১:৩৩
advertisement

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষের জনমত শেষ পর্যন্ত গেরুয়া রঙের পক্ষেই থাকল। কেবল থাকেইনি, তাদের প্রতি সমর্থন গতবারের চেয়ে আরও বেড়েছে। এবার সপ্তদশ নির্বাচনের প্রচারের সময় মনে হয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা হয়েছিল জনমত এবার ঘুরে যেতে পারে। অর্থাৎ রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ইউপিএ ক্ষমতায় আসতে পারে। এ রকম ধারণার একটি কারণ সর্বশেষ তিনটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাফল্য। প্রচারেও মোদি এবং তার জোটের গত পাঁচ বছরের কাজের যথেষ্ট সমালোচনা জনসমর্থন পেয়েছে বলে মনে হচ্ছিল।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে উভয় জোটের সমর্থনের পাল্লা খুব কাছাকাছি বলেই মনে হয়েছিল। ফল ঘোষণার একদিন আগেও এ রকম ধারণা অনেকের মধ্যেই ছিল। তবে সাত দফা ভোটের সর্বশেষ ১৯ মের পর্বটির শেষে বুথফেরত যেসব জরিপ প্রকাশিত হচ্ছিল, তাতে এ ধারণা অনেকটা ফিকে হতে শুরু করে।

শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে গান্ধী-নেহরুর ভারতবর্ষ হিন্দুত্ববাদীদের হাতেই থেকে গেল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৩৩৬ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। সেবার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ৬০টি আসনে বিজয়ী হয়ে বিরোধী দলে অবস্থান নিয়েছিল।

এবারে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরবে এমন প্রত্যাশা সম্ভবত কেউই করেনি। কিন্তু ধারণা ছিল শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে তাদের জোট লোকসভায় সরকারকে শক্ত চ্যালেঞ্জের চাপে রাখবে। এই ফলে ভারতবর্ষের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার নাগরিক সমাজ দারুণভাবে হতাশ হবে। এখন আশঙ্কার বিষয় হলো, নরেন্দ্র মোদি শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারসাম্যের রাজনীতি করবেন নাকি তার মূল সংগঠন আরএসএসের নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নে মনোযোগ দেবেন।

আমরা লক্ষ করি, জনতুষ্টিবাদী এই নেতা তার বহিরঙ্গে দেশের সর্বসম্প্রদায়ের নাগরিকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ভেতরে ভেতরে হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নিয়েছেন। এবারে নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত কংগ্রেস ও বাম সংগঠনগুলো মোদির সামনে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে বলে মনে হয় না।

সপ্তদশ নির্বাচনে বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয়েরই আসনসংখ্যা বেড়েছে; কমেছে বাম সংগঠনগুলোর। এ থেকে বলা যায়, ভারতবর্ষে বাম প্রগতিশীল রাজনীতির চরম দুর্দশার কাল শুরু হলো। আর দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির রমরমা চলবে। এই ধারার কর্মকা- কেবল সংসদ, রাজনীতি বা সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে হয় না।

গেরুয়া বসনধারী সব সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্থা তাদের কর্মকা- বাড়াবে এবং সমাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তা ছাড়া বর্তমান বিশ্বে কেবল ভারতবর্ষই নয়, পৃথিবীর প্রভাবশালী বিভিন্ন উন্নত দেশেও জনতুষ্টিবাদী দক্ষিণপন্থি একক নেতৃত্বের উত্থান ঘটছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার পুতিন, চীনের শি জিনপিং, তুরস্কের এরদোগান এবং ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় একই ধারার রাষ্ট্রনায়কদের উত্থান দেখছে আজকের পৃথিবী। ভারতবর্ষ সেই ধারায় ছিল, এখন তা আরও বেগবান হবে বলেই মনে হয়।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের দিক থেকে বিজেপির তুলনায় কংগ্রেস অনেক বেশি পরিণতি ও দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল। তা ছাড়া বেকারত্ব, কৃষিঋণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এনডিএ সরকারের ব্যাপক সমালোচনা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনগণ কংগ্রেসের বক্তব্য তেমনভাবে বিবেচনায় নেয়নি। এ থেকে হয়তো রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্ভব।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, কংগ্রেস তাদের বক্তব্য ও কর্মসূচি ভোটারদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারেনি। এর মূল কারণ, সংগঠন হিসেবে তাদের দুর্বলতা এবং নেতৃত্বের ঘাটতি। অনেকে এ-ও ভাবছেন, এবারের নির্বাচনে প্রিয়াংকা গান্ধীকে ব্যবহার করার ফলে তাকে নিয়ে যে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ছিল, তাতেও একটু সংকট দেখা দেবে। তা হলে প্রশ্ন উঠবেÑ মোদি রাজত্বের অবসান কার নেতৃত্বে ঘটবে? অদূর ভবিষ্যতে তা কি আদৌ ঘটবে?

অনেকেই নিশ্চয় ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ টানবেন। সেবার বিজেপি লোকসভায় মাত্র দুইটি আসনে জয়ী হয়েছিল। তখন কেউ ভাবতে পারেনি এর ৩০ বছর পরে সেই দল প্রবল শক্তি নিয়ে সরকার গঠন করবে। ফলে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নেই এ কথা হয়তো বলা ঠিক হবে না। রাজনীতিতে শেষ কথা বলা যায় না।

তবে ভারতবর্ষের কেন্দ্রে ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বাংলাদেশকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবেই তাদের গণ্য করতে হবে। এতে ভারতেরও লাভ, বাংলাদেশেরও। অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপি কিংবা রাহুল গান্ধীর চেয়ে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের সুবিধা বৈ অসুবিধা কিছু নেই। নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রতি তার অঙ্গীকারে আন্তরিকতার প্রমাণ রেখেছেন।

বাধা এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিক থেকে, যার একচ্ছত্র রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছে মোদির বিজেপি। এবারের নির্বাচনে মমতা হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, তার রাজ্যে বিজেপির অনুপ্রবেশ ঘটবে না। কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল নেমে এসেছে ২২টিতে। আর বিজেপি শূন্য থেকে পৌঁছেছে ১৯টিতে।

এর খেসারত দিয়ে নিঃস্ব হয়েছে টানা ৩৫ বছর রাজ্যের ক্ষমতার অধীশ্বর হয়ে থাকা সিপিএম। বাংলাদেশকে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকে তাকাতে হবে গভীরভাবে। যদি এই নির্বাচনের ফলে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া বিরোধী দল নিজেদের সংহত করতে না পারে তা হলে মোদির নেতৃত্ব ভবিষ্যতের ভারতকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা বলা মুশকিল।

আর তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ সব সময় রক্ষিত হবে কিনা, সে নিশ্চয়তাইবা কে দেবে? তার নেতৃত্বে মুসলিম জনগণকে টার্গেট করে আসামে জনপঞ্জি তৈরি করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাজ্য থেকে মুসলিম বিতাড়ন কিংবা গো-রক্ষার নামে মুসলিমবিরোধী তৎপরতা কম হয়নি।

এসব ঘটনা উপমহাদেশের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আর বাংলাদেশ তা বিবেচনায় না নিয়ে পারবে না। বিজয়ী নরেন্দ্র মোদিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকভাবেই অভিনন্দন জানাতে হবে এবং তার সঙ্গে একযোগে কাজ করার অভিপ্রায়ও বজায় রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সে দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রাখলে ভালো হয়।

advertisement