advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মোদি কোন ক্রান্তিকালের দূত

আবুল মোমেন
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০৯:০৬
advertisement

ভোটার সংখ্যার হিসাবে ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। এর জনসংখ্যা ১৩০ কোটি আর ভোটারের সংখ্যা ৯০ কোটি। সংখ্যার বিচারে ভারতের পরে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ভোটারের সংখ্যা যথাক্রমে ১৯ কোটি ২০ লাখ ও ২৪ কোটি। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে সংবিধান রচিত ও গৃহীত হয় ১৯৫০ সালে। এর ভিত্তিতে দেশটিতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালে।

দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দলই সরকার গঠন করে থাকে। সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় লোকসভা ও ভোটারের সংখ্যার বিপরীতে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি এবং সরকার নির্বাচিত বিশিষ্টজনরাই সদস্য হন। দেশের উপরাষ্ট্রপতি পদাধিকারবলে রাজ্যসভার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।

নীতিগত ও সাংবিধানিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজ্যসভার সমর্থন প্রয়োজন হয়। তবে সরকার গঠন করার জন্য লোকসভার সদস্যদের ভূমিকাই প্রধান। ভারতের লোকসভার মোট সদস্য সংখ্যা ৫৪৩, তাই সরকার গঠনে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ২৭২ আসনে বিজয়ী হতে হয়। এবার অনুষ্ঠিত হল সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচন। এতে ৫৪২ আসনের জন্য সর্বভারতীয় ও আঞ্চলিক দল মিলিয়ে মোট ১ হাজার আটশ একচল্লিশটির মতো দল ও ৮ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছিলেন।

তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের মধ্যে। এর আগে অর্থাৎ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এনডিএ বিপুল বিজয় অর্জন করে প্রথমবারের মতো কেন্দ্রে সরকার গঠন করেছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি জননেতা হিসেবে তার সমকালীন অন্য নেতাদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। সাধারণ মানুষের মন জয় করার জন্য তার যেমন মন-ভোলানো ভাষণের ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি নির্বাচন ও সরকার পরিচালনার মতো সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার গুণও রয়েছে।

অনেক ভাষ্যকারের মতে, নির্বাচনী ইশতেহারের বক্তব্য ও কর্মসূচিতে ইউপিএ জোট বিজেপির তুলনায় অনেক পরিণতি ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেও জোটের মূল দল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাহুলের নেতৃত্বের খামতিতে তারা প্রচারণায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছিল। যদিও এই নির্বাচনে উভয় জোটের আসন সংখ্যা গতবারের চেয়ে বাড়লেও ফলাফল নিয়ে কংগ্রেস বা তার শরিকদের সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ নেই। কারণ এই ভোটের ফলাফলে বোঝা যাচ্ছে ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি চরম সংকটের দিকে চলেছে।

নরেন্দ্র মোদি বৃহস্পতিবার রাতে নয়াদিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের সামনে কর্মীদের উদ্দেশে যে তাৎক্ষণিক ভাষণ দিয়েছেন তাতে এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে স্পষ্টভাবেই বলেছেন, কোনো দলই ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগান দিয়ে জনগণকে ধোঁকা দিতে পারেনি। সত্যিই বিজেপি এবং তার হিন্দুত্ববাদী দোসরদের গত পাঁচ বছরের এবং নির্বাচনকালীন তিন মাসের প্রচারণা ও তৎপরতার প্রভাবে সৃষ্ট আবহে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষাবলম্বন করে ভোট আদায় প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। রাহুল বা প্রিয়াংকাকেও হিন্দুত্বের প্রতি আস্থা রেখেই কথা বলতে হয়েছিল।

যদি আমরা একটু পেছনে তাকাই তা হলে দেখব যখন অটল বিহারি বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদভানির মতো আরএসএস ঘেঁষা জ্যেষ্ঠ নেতারা বিজেপির হাল ধরেছিলেন তখন ক্ষমতায় গিয়েও তাদের বলতে হয়েছে ভারতবর্ষের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মহান ঐতিহ্যের কথা। তারা মহাত্মা গান্ধী বা জওহরলাল নেহেরুর বিরুদ্ধে কখনো কথা বলেননি। তাদের প্রতি এবং ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মূলধারার প্রতি বরাবর শ্রদ্ধাও প্রদর্শন করে গেছেন। কিন্তু তখন তাদের সরকার ছিল নড়বড়ে, জোটের অন্য শরিকদের ওপর নির্ভরশীল। নরেন্দ্র মোদিই বিজেপিকে সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার লক্ষ্যই ছিল এমন এক নেতৃত্ব সৃষ্টি করা যা বিজেপিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে কংগ্রেসেরই মতো কেন্দ্রে দীর্ঘদিনের মতো ক্ষমতায় রাখতে সক্ষম হবে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর প্রথমবারে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পর্যন্ত ভারতের জাতীয় কংগ্রেস টানা ৩০ বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল। নরেন্দ্র মোদির বিবেচনায় নিশ্চয় বাজপেয়ি-আদভানিরা ছিলেন আপসকামী নেতা। তিনি তাদের সরিয়ে রঙ্গমঞ্চ একাই আলোকিত করার পথ ধরেছিলেন। তার উত্থান ঘটেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের একজন আঞ্চলিক কর্মী হিসেবে। তার মতো বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ জানেন মূলত হিন্দি বলয়ের এ ধর্মভিত্তিক দল নিয়ে ভারতের মতো বহু ভাষা ও সংস্কৃতির এই দেশে, যেখানে আবার হিন্দুধর্মেরও বহু মত-পথ রয়েছে,  কেবল হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে জনতা-জনার্দনকে পক্ষে টানার সময় আসেনি।

তার সৌভাগ্য যে, তিনি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুরনো ঘাঁটি গুজরাটের বাসিন্দা। তার প্রথম লক্ষ্য ছিল নিজ রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া। তার জন্য হিন্দুত্ববাদের কার্ড খেলেছেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় প্রকাশ্যে বিতর্কিত ভূমিকা নিতে কোনো দুর্বলতাও দেখাননি। তার পর মেকিয়াভেলিয়ান রাজকুমারের মতো জনমতকে তুষ্ট রাখার কৌশল নিয়ে সুবিধাবাদের রাজনীতি এগিয়ে নিলেন। দলের অভ্যন্তরে তার নিজের বলয় শক্তিশালী করে তুলেছেন। তার মতো নেতা ভালোই জানেন দরিদ্র দেশের মানুষের মন পেতে ধর্মের বিশুদ্ধ প্রয়োগের চেয়েও অর্থনৈতিক ও জাগতিক উন্নয়নের কার্যক্রম অনেক বেশি ফলপ্রসূ হবে।

ফলে রাজনীতিবিদ নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে ধর্মীয় নেতা বা সাধুসন্ন্যাসীদের সঙ্গে যত দেখা গেছে তার চেয়ে বেশি দেখা গেছে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কার্যকর বৈঠকে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত এবং দীর্ঘকাল রাজনীতির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ দেখতে দেখতে ধর্ম ও ব্যবসার সংমিশ্রণের এই ফেরিওয়ালার প্রতি ভারতের আম ভোটারদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। উপমহাদেশের আমশ্রোতার জন্য কার্যকর জাদুকরী বাগ্মিতায় মোদি অত্যন্ত দক্ষ। এবার তার সঙ্গে নানা উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়ন তার প্রতি মানুষের আগ্রহকে আস্থায় পরিণত করেছে। অন্তরে তার হিন্দুত্ববাদী আদর্শ থাকলেও কর্মের মাধ্যমে তিনি ভারতবর্ষের ১৩০ কোটি মানুষের নেতার ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছেন।

এখন ভারতের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে তা অনেকখানি নির্ভর করছে তার ওপর। হিন্দুত্বের আদর্শ বাস্তবায়নের চাপ বাড়াবে আরএসএস। কথা হলো এটা তিনি কি নির্বিবাদে বাস্তবায়ন করতে পারবেন? আবার দ্বিগুণ শক্তিতে বলীয়ান মোদির এ পথে বাদ সাধতে হলে নাগরিক সমাজের মধ্যকার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধধারী সব গোষ্ঠীকে দেশের সব নাগরিকের জন্য সমানাধিকার সৃষ্টির চাপ বজায় রাখতে হবে মোদি সরকারের ওপর। কিন্তু সেই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির চরম অবক্ষয়ের ছবিই ফুটে উঠেছে সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে। তারা দ্রুত গুছিয়ে উঠতে পারবে তেমনটা ভাবা শক্ত।

আর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এমন জোয়ারের স্রোতের মুখে, যখন আবার প্রচ- শক্তিশালী এক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মুখপাত্র সর্বদা সক্রিয়, তখন রাহুল-প্রিয়াংকাই বা কংগ্রেসকে কীভাবে পথ দেখাবে কিংবা বিকল্প শক্তি হিসেবে মোদির সামনে নিজেরা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে তা বলা মুশকিল। কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের চাপ না থাকলে হিন্দুত্ববাদের ঝাণ্ডা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দণ্ড হিসেবে আঁকড়ে ঠিকই পতপত করে উড়তে থাকবে। তখন অনেকেই ভাবতে পারেন, যদি দেশের অর্থনীতির জোর বাড়ে এবং গরিব মানুষ ভালো থাকে তা হলে হিন্দুত্বের পতাকা উড়লে অসুবিধা কী?

রাষ্ট্র, ক্ষমতা, সরকারের সঙ্গে ধর্মের বেশি মাখামাখি চললে স্বয়ং ধর্মের এবং প্রতিফল হিসেবে গণতন্ত্র, উভয়েরই নিজেদের আসল চরিত্র ও ভূমিকায় সংকট দেখা দেয়। তা ছাড়া হিন্দুধর্মের নিজস্ব যে বহুমাত্রিকতা ও বৈচিত্র্য রয়েছে তাকে এক রাজনীতির ছাঁচে দীর্ঘদিন আবদ্ধ রাখাও কি সম্ভব? রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি তখন সর্বক্ষেত্রে আরএসএসের ধর্মীয় নিদানের আধিপত্য ধরে রাখার চাপাচাপি সামলাতে গিয়ে সরকারকে জনতুষ্টিবাদ ও একনায়কত্বের মেলবন্ধনের পথেই হাঁটতে হবে। তাতে গণতন্ত্রের সংকট এবং আখেরে উন্নয়ন ও সমাজ-প্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। সেটা কি ভারতবর্ষের জনগণ মানতে পারবে?

আবুল মোমেন : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

advertisement