advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভারতে গেরুয়া ঝড় : প্রতিবেশী দেশ ও মানুষের চাওয়া

অজয় দাশগুপ্ত
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০৯:০৫
advertisement

গেরুয়া ঝড়ের কবলে ভারত। বিজেপি এবার এমনভাবে জিততে পারে স্বপ্নেও ভাবেনি বিরোধী দল। কিন্তু মোদি ম্যাজিক শেষতক সব ছাপিয়ে নিয়ে গেছে। ভারত একটি বিশাল দেশ। দীর্ঘকালের গণতান্ত্রিক আচরণ আর ভোট ব্যবস্থা সেখানকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে শক্তি। যা এখন সারাবিশ্বে নন্দিত একটি প্রতিষ্ঠান। তারা স্বয়ং রাষ্ট্রপতিকেও ভয় পায় না। পেতে হয় না।

এই গণতন্ত্রের দেশে বিজেপির মতো একটি সাম্প্রদায়িক বলে পরিচিত দলের এমন বিজয় অভাবনীয় হলেও সত্য। লোকসভায় কত আসন, কত মানুষ, কত প্রদেশ, কত রাজ্য। সেসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ খোদ ভারতীয়রাও করতে পারেন না। সেদিকে যাব না। আসুন আমরা লাগোয়া বঙ্গের কথায় আসি। যাদের সঙ্গে ধর্ম আর সামান্য দু-একটা বিষয় বাদে সবকিছু হুবহু মিলে যায় আমাদের। এক রবীন্দ্রনাথ, এক নজরুল আর এক লালনের সংস্কৃতি। কথা ভাষা সব এক। সেখানে এবার বিজেপি মমতার দুর্গ ধসিয়ে দিয়েছে প্রায়।

তিরিশ বছরকাল সে বঙ্গের শাসনে ছিল বামদল। যারা দুনিয়া থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিদায় হওয়ার পরও বেশ জাঁকিয়ে বসেছিল। কিন্তু কেউ ভাবেনি তাদের পতন হবে এমন করুণ। আর তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামের এক মহিলার কাছে ধরাশায়ী হবে তারা। দুঁদে সব নাম। রাশভারী পণ্ডিত টাইপের জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, সোমনাথ চ্যাটার্জি। সেলিম সাহেব, বুদ্ধদেব বাবু সবাই কাত।

মমতা এলেন পাদপ্রদীপের আলোয়। গোড়াতে বোঝা না গেলেও পরে ধরা পড়ল অস্থির আর প্রগলভ এই ভদ্রমহিলা। শেষে এমন হয়ে গেল এখন নাকি তিনি সব পারেন। ছবি আঁকতে জানেন, কবিতা লিখতে জানেন, এমনকি গানও। রাজনীতির ভেতর যে সভ্যতা ভারত তার অংশীদার ছিল বৈকি। কিন্তু এখন তা কতটা আছে আর নেই বলা মুশকিল। এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনে বিজেপি প্রায় অর্ধেক আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। যারা গতবার পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন।

কেন এই পরিবর্তন? মানুষ কি তবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে? না এর আর কিছু কারণ আছে, যা গবেষণা হতে পারে। আমার ধারণা ওপার বাংলায় মমতার এককেন্দ্রিক শাসন আর অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি দেখভালের নামে অতি বাড়াবাড়ি ধরনের নজরে সংখ্যাগুরু মানুষ ভেতরে ভেতরে ভয়ার্ত। আমাদের মনে রাখতে হবে, এখন বাংলাদেশেও এমন অভিযোগ আছে। সংখ্যালঘু তোষণ আর তাদের ভালো রাখা দুটো ভিন্ন বিষয়Ñ মোদ্দা কথা হলো কাউকে আলাদা করে কেয়ারে রাখতে হবে কেন? কোন মানুষ কেয়ারে থাকেন? যারা রুগ্ন বা অসুস্থ। তা হলে তো এই জাতীয় কারবার মনে করিয়ে দেয় সংখ্যালঘু নামের সম্প্রদায় ভালো নেই বা ভালো থাকতে পারে না বলেই আলাদা করে তাদের এভাবে জিইয়ে রাখা হয়। মমতা দিদি এই সমীকরণ বুঝতে পারেননি। বিজেপি বুঝেছে। তাই তারা একচেটিয়া হিন্দু ভোটের আশায় যা করার তাই করে ভোট ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। যার পরিণাম কী হবে, একমাত্র সময় ছাড়া কেউই জানে না।

কলকাতার আলাদা একটা অস্তিত্ব আছে সংস্কৃতিতে। বিপুল বৈভব আর পূর্বাধিকারের এই রাজধানী পদ্মফুলের নামে এমন ধর্ম ধর্ম করে নাড়া খাবে এটা ভাবাও যেত না এক সময়। ভারতের লোকসভার এবারের ফলাফল আপনি যদি সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন বুঝবেন উত্তর ভারত যেখানে সাধুসন্তদের প্রভাব বেশি সেখানে বিজেপি জিতেছে। উল্টোদিকে সাউথে কেরালায় তামিলনাড়তে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাদের। বুঝলাম কেরালায় খ্রিস্টানদের প্রভাব আর সংখ্যা অধিক। কিন্তু তামিলনাড়ু তো হিন্দুপ্রধান। শুধু তাই নয়, আমি ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এদের জীবনে হিন্দুধর্মের প্রভাব খুব বেশি। এমন এমন পরিবার আছে যারা সংস্কারের কারণে অপবিত্র হবে বলে বাড়িতে দেবতার ছবি পর্যন্ত টানায় না।

মন্দিরনির্ভর এক সমাজের বাসিন্দা এরা কিন্তু বিজেপিকে আসন দেয়নি। তা হলে কি ধরে নেব রামরাজত্বে বিশ্বাস করে না একদা রাবণের প্রতিবেশীরা? নাকি সাউথ তার স্বতন্ত্র মর্যাদা আর পরিচয়ে বরাবরের মতো উত্তরের চেয়ে আলাদা থাকতে চায়? আমি যখন সাউথে যাই দেখি তারা একেবারে বাধ্য না হলে হিন্দি বলে নাÑ এমনকি অসংখ্য মানুষ হিন্দি জানেও না। এটা তারা গর্ব বলে মনে করে। সমীকরণের আরেক দিকে আছে উত্তরের শাসন প্রভাব। তারাই ভারতকে যুগের পর যুগ শাসন করে আসছে। রাজধানী থেকে বাণিজ্যে অগ্রগামী এরা শাসনভার আর কাউকে দিতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক।

নরেন্দ্র মোদির কথায় আসি। আমার মতে, তিনি তার বাগ্মিতা দিয়েই আসর মাত করেন। সেটা এখন সবাই জানেন। তিনি যে একজন পাকা আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় সেটা আপনি নির্বাচনের কিছুদিন আগের ঘটনাগুলো বিচার করলেই বুঝতে পারবেন। আরব দেশগুলো তাকে নির্বাচনের আগে কত কী উপহার দিল। কেউ দেশের সম্মান, কেউ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তান নিজেকে মুসলিম দেশ বলে বুক ফুলিয়ে পেল দুই মিলিয়ন না বিলিয়ন আর ভারত পেল বিলিয়নের ওপর বিলিয়ন। সৌদি আরবও তার দিকে। এবার দেখুন বাংলাদেশ, সেখানেও মোদির সঙ্গে শাসক দলের গভীর সম্পর্ক।

রাশিয়ার পুতিনও বাদ পড়েননি। তিনিও কিন্তু নির্বাচনের আগে মোদি বন্দনার প্রমাণ দিলেন। আমেরিকা তো এখন এক পায়ে খাড়া। সবার কথা বাদ। খোদ ইমরান খান টুইট করে লিখলেন, মোদি জিতলেই ভালো। কারণ অমীমাংসিত সমস্যা নাকি সহজে সমাধান করা যেতে পারে। তা হলে কিছুদিন আগে যে যুদ্ধ যুদ্ধ আর প্রাণনাশ তার হিসাব দেবে কে? সবমিলিয়ে দেশে যাই হোক বিদেশে সবাই নিশ্চিন্ত যে, মোদির দলই ফিরছে দেশ শাসনে। একটা জনসভার কথা বলব বলে ঠিক করে রেখেছি। যেখানে রাহুল গান্ধী এসেছিলেন প্রিয় রঞ্জন দাস মুন্সীর পতœীর জন্য সভা করতে। প্রিয়বাবু কংগ্রেসের জাঁদরেল নেতা ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর আমলে নামডাক ছিল খুব। সে সভায় রাহুল জনগণকে উত্তেজিত করার জন্য যেভাবে মোদিকে চৌকিদার চোর হ্যায় বলা শুরু করলেন তা দেখতে দেখতে আমার মনে হয়েছিল কংগ্রেস নিজের কফিনে পেরেক ঠুকছে। ঠিক তাই হয়েছে। গালাগালির রাজনীতি আমাদের সমাজের মতো সব দেশে সব সমাজে চলে না। ভারতে শিষ্টাচার না থাকলে পরাজয়ের পর রাহুল কেন সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন? কেন মমতার মতো রাগী মহিলাও বিজয়ীদের অভিনন্দন জানালেন? কেন মোদি সবাইকে নিয়ে ভারত গড়ার কথা বললেন? কারণ তারা দেশ ও জাতির বেলায় এক। ভারতের গণতন্ত্রের এই সৌন্দর্য বা বৈশিষ্ট্য তাদের ভালো রাখলেও এখন প্রশ্ন অনেক। যার ভেতরে মূল কথা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আগুন আগুন খেলা।

বিজেপি যদি তা করতেই থাকে গোমাংস-গোমূত্র ইত্যাদি নিয়ে যদি তাদের জবরদস্তি চলতে থাকে ভারত তার গৌরব হারাতে বাধ্য। আমার ধারণা মোদি আর যাই করুন এসব ফাঁদে পা দেবেন না। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি গভীর বার্তা আছে ফলাফলে। সেটা খুব পরিষ্কার। সবাই সাম্প্রদায়িক আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠলে কোনো দেশের একার দায় নয় অসাম্প্রদায়িক থাকা। ভারতের জনগণ যা বুঝে রায় দিক না কেন, গণতন্ত্র টিকে থাক উপমহাদেশে, শান্তি থাকুক এটাই আমাদের চাওয়া।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক

advertisement