advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ভালো নেই কৃষক

আব্দুল হাই রঞ্জু
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০৯:০৩
advertisement

কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর কৃষকই কৃষি অর্থনীতির মূল কারিগর। যাদের মেধা-শ্রমে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কৃষককুল ভালো নেই। যারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে-ঘাটে ফসল ফলান। যাদের শ্রমে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।

উল্টো ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ, মহাজনি ঋণ ও ধারদেনা করে চাষাবাদ করলেও কষন ও ফলন বিপর্যয়, কখনো ন্যায্যমূল্যের অভাবে ওদের কপাল পোড়ে। মনে হয়, এটাই যেন এ দেশের কৃষকের নিয়তি! এর কি কোনো পরিবর্তন হবে না? কী জবাব দেবেন শাসকগোষ্ঠী? একটু বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের কষ্টের শেষ থাকে না। অনেক সময় ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হয়। আর ফলন ভালো না হলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তারা। যেন উভয় সংকট।

অনেকটা শাখের করাতের মতোই মুখোমুখি হতে হয় তাদের। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্যের জোগানদাতা তারাই। কিন্তু ফসলে উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ধানের ক্ষেতে আগুন লাগান তারা। কী পরিমাণ কষ্টে পড়লে ধানক্ষেতে আগুন ধরানোর মতো সর্বনাশী ঘটনা ঘটতে পারে, যা শাসকগোষ্ঠীকে ভেবে দেখা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আগাম বন্যা, সিডর, আইলা, ফণীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করে এ দেশের চাষিরা ধান চাষাবাদ করেন। শত প্রতিকূলতার মুখে চাষাবাদ শেষে ধান পাকলে ধুম পড়ে যায় ফসল কাটার। এখন পুরোদমে চলছে ধান কাটা-মাড়াই। অবশ্য দেশের হাওরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে অনেক আগেই বোরো ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফণীর আগ্রাসনে অনেক কৃষকেরই ক্ষতি হয়েছে। এ বছর বোরো চাষাবাদে ধানচাষিদের বিশেষ সতর্কতার কারণে পাকা ধানের ক্ষতি হলেও তার পরিমাণ তুলনামূলক অনেক কম।

২০১৭ সালের আগাম অতিবৃষ্টি এবং উজানের পানির ঢলে হাওর অঞ্চলখ্যাত কয়েকটি জেলার আধা-পাকা পুরো ধানই পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এবারের চিত্র ভিন্ন। হাওরের পাকা ধান ফণীর আক্রমণের আগেই কাটা হয়েছিল।

যদিও বাড়তি বৃষ্টির কারণে ভারত থেকে নেমে আসা পানি হাওরের কোনো কোনো অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে প্রবেশ করেছে। কিন্তু আগাম ধান কেটে নেওয়ায় ২০১৭ সালের মতো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। মূলত কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে সরকার ধান-চাল সংগ্রহ করে। সে ধারাবাহিকতায় এ বছরও সরকার ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল, দেড় লাখ টন আতপ চাল ও দেড় লাখ টন ধান অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করবে।

সরকারের ঘোষণামতে, ১ মে থেকে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু কাগজ-কলমে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলেও বাস্তবে সংগ্রহ কার্যক্রমের গতি খুবই মন্থর। কারণ আমাদের দেশে ধান-চালের বরাদ্দ ঘোষণা করার পর নিয়মনীতি পালন করতেই বেশ কদিন চলে যায়। ফলে কৃষক ধান কেটে উপযুক্ত ক্রেতার অভাবে নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। যে কারণে কৃষকের ধানের উপযুক্ত মূল্য অনেক সময়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আর যে সামান্য পরিমাণ ধান খাদ্য বিভাগ সংগ্রহ করবে তার অবস্থা আরও খারাপ।

মূলত ধান সংগ্রহের পরিমাণ কম হওয়ায় ‘আগে আসলে আগে বিক্রি’ এই নিয়মে ধান কেনা সম্ভব হয় না। ফলে ধান সংগ্রহের জন্য কৃষি বিভাগের কাছে প্রকৃত কৃষকের তালিকা প্রণয়ন ও কী পরিমাণ ধান কোন কৃষক বিক্রি করতে পারবেন, সে কার্যক্রম চালু করতে অন্তত আরও মাসাধিক কাল অপেক্ষা করতে হবে। শেষে তালিকা প্রকাশ হবে, দেখা যাবে একজন কৃষক তিন বস্তা থেকে সর্বোচ্চ ২০-২৫ বস্তার বেশি ধান বিক্রির সুযোগ পান না। সাধারণত সামান্য পরিমাণ ধান কৃষক খাদ্য বিভাগে বিক্রি করতে আগ্রহ দেখান না।

বলতে গেলে সাধারণ কৃষকরা বেশিরভাগ সময়ই সরকারি দরে খাদ্য বিভাগে ধান বিক্রি করতে পারেন না। একসময় মধ্যস্বত্বভোগীদের খপ্পরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। যেমন এ বছর ৫০ হাজার টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হলেও এখনো গম সংগ্রহ শুরু করতে পারেনি। সরকারের দাবি, ধান সংগ্রহ করতে প্রচুর পরিমাণ স্থানের প্রয়োজন হয়, সে পরিমাণ খাদ্যগুদাম না থাকায় সরকারের ইচ্ছা থাকার পরও খাদ্য বিভাগ ধান সংগ্রহ করতে পারে না। যদিও মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১০ বছরে প্রায় আট-নয় লাখ টন খাদ্য সংরক্ষণ উপযোগী খাদ্যগুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। এর পরও যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ক্ষেত্রে সরকারের উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ স্থান সংকুলানের অজুহাতে বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে কিছু সুপারিশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য তুলে ধরলাম।

১. বোরো ও আমন সংগ্রহ শুরুর তারিখের এক মাস আগে ধান-চালের বরাদ্দ ঘোষণাপূর্বক মিলারদের অনুকূলে বিভাজন, চুক্তি সম্পাদন শেষ করতে হবে। পাশাপাশি ধান সংগ্রহের জন্য কাজে তালিকা প্রণয়ন ও অনুমোদন করে খাদ্য বিভাগে পাঠাতে হবে। যেন সংগ্রহ শুরুর নির্ধারিত তারিখ থেকেই ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব হয়। তা হলে ধানচাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ২. দেশে বর্তমানে খাদ্য বিভাগের লাইসেন্স নেওয়া ১৪-১৫ হাজার হাসকিং মিল এবং ছয়-সাতশ স্বয়ংক্রিয় চালকল চালু আছে। অভ্যন্তরীণভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমে চুক্তিবদ্ধ প্রতিটি চালকলকে সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ উপযোগী খাদ্যগুদাম হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বর্তমানে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা হয়, তা যৎসামান্যই। ধান কেনার পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রতিটি চুক্তিবদ্ধ মিলারের অনুকূলে পর্যাপ্ত ধানের বরাদ্দ দিয়ে সরকার নির্ধারিত বেশি চাল খাদ্যগুদামে সংগ্রহ করতে হবে। তা হলে বর্তমানে জায়গার সংকটে কৃষকের ধান কেনা যেমন সম্ভব হয় না, সে সংকট তখন অনেকাংশেই কমে আসবে।

৩. উল্লেখ্য, আশির দশকে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে মিলগেট পদ্ধতিতে চাল সংগ্রহ করায় ধানচাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। ওই পদ্ধতির মতো ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ৪. উন্নত পদ্ধতির উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন হওয়ায় এবং কৃষি খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে ধানের উৎপাদন আশির দশকের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু যে হারে ধানের উৎপাদন বেড়েছে, সে হারে সরকারিভাবে কৃষকের ধান সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি। এমনকি ধান সংগ্রহের নিয়মনীতি এখন সংকোচিত হয়েছে। ফলে কৃষক ধান চাষ করে সফলতা এনেছেন সত্য, কিন্তু কৃষকের উৎপাদিত ধারার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ৫. এমতাবস্থায় ধান উৎপাদন, সংরক্ষণ, সংগ্রহ, বিপণনে সময়োচিত সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

যে কর্মপরিকল্পনার ফলে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি, ধান বিক্রির ক্ষেত্রকে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে চালকলগুলোকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিয়ে আধুনিকায়ন করতে হবে। তা হলে একদিকে যেমন কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে চালকল শিল্পের সঙ্গে নিয়োজিত নারী-পুরুষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও টেকসই হবে। অর্থাৎ মান্ধাতা আমলের নীতি-কৌশল পরিবর্তন করে চাল উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ভোক্তার অনুকূলে মানসম্মত পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল বিপণনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদক, মিল মালিকদের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরামর্শ সভা করে নিয়মনীতি নির্ধারণ করা একান্ত জরুরি। তা হলে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি মানসম্মত পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সংগ্রহ করে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তালা অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

আব্দুল হাই রঞ্জু : কলাম লেখক

advertisement