advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উপকূলে কাটেনি বাঁধভাঙন আতঙ্ক

মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল,সাতক্ষীরা ও শেখ মনিরুজ্জামান,কয়রা
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০৯:২২
advertisement

আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এ দিনে ঘূর্ণিঝড় আইলা ল-ভ- করে দেয় গোটা উপকূলীয় এলাকা। সেই ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী। উপকূলে এখনো নির্মিত হয়নি টেকসই বেড়িবাঁধ। বাসস্থান, চিকিৎসা, সুপেয় পানি, স্যানিেেটশন ও পুষ্টিহীনতাসহ বিভিন্ন সংকটে আগের মতোই ভোগান্তির মধ্যে দিন কাটছে লাখো লাখো উপকূলবাসীর।

বেড়িবাঁধ ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত পার করছেন তারা। ১০ বছর আগেও সবুজ বনানীতে পরিপূর্ণ ছিল গাবুরা পদ্মপুকুরসহ সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা। এখন চারদিকে গাছপালাহীন ঘের আর ঘের। সবুজের বালাই নেই। নেই পরিবেশগত ভারসাম্য।

গাবুরা এলাকার আব্দুর রহিম জানান, আমাদের এখানে কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই, নেই পানির ব্যবস্থা। বড় নদী পার হয়ে, বড় অসুখ হলে যে নিয়ে যাব, তার উপায় নেই। এখানে কোনো হাসপাতালও নেই, কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই। এই যে গাবুরা ইউনিয়নে ৪০/৪৫ হাজার লোক। এখানে মাত্র ৪টি সরকারি পুকুর আছে। সংস্কারও করে না। ফলে দুর্ভোগে রয়েছি। রাস্তাঘাট খারাপ হওয়ায় বিনা চিকিৎসায় মরতে হয় অনেককেই। সাইক্লোন শেল্টারও প্রয়োজনের তুলনায় কম। গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে দু’লক্ষ লোকের বসবাস। খোলপেটুয়া নদীর ওপর ব্রিজ নির্মিত হলে লোকজন যাতায়াত করতে পারবে। এখানে কোনো উন্নয়ন হয় না শুধু ব্রিজের কারণে।

বেড়িবাঁধের অবস্থাও খারাপ। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ২০০৯ সালে এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ভয়াবহ আইলা। সেই আইলার শিকার এ অঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি। পরবর্তীতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। তবে এখনো পর্যাপ্ত সমস্যা রয়েছে ওই এলাকায়। সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে দেখে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন শুকনো মৌসুমেই ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হবে। আরও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমীক্ষা করা হয়েছে।

এ ছাড়া আইলায় গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, আইলার আঘাতে সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ৭৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হন। গৃহহীন হয়ে পড়েন কয়েক হাজার পরিবার। ধ্বংস হয় বেড়িবাঁধ। আর ভেঙে চুরমার হয়ে যায় স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ দিকে আইলার কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে খুলনার কয়রা উপজেলায় পাউবোর বেড়িবাঁধের ২৭টি পয়েন্ট ভেঙে যায় এবং গোটা উপজেলা লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ক্ষতবিক্ষত এ জনপদে রক্ষা পায়নি মানুষ, গবাদিপশু, গাছপালা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, মৎস্য ঘেরসহ বিপুল সম্পদ। এ উপজেলাতে প্রাণ হারান ৫৭ জন। সহায়-সম্বলহীন মানুষ দিনটিকে স্মরণ করে এখনো ভুগেন আতঙ্কে।

কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম মিজান মাহমুদ বলেন, লবণাক্ততা থেকে উপজেলার মানুষ এখনো রক্ষা পাননি। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে লবণাক্ত জমিতে লবণসহনশীল ফসল উৎপাদন করতে পারছেন তারা। তিনি আরও জানান, আইলার তিন বছর পর ভেঙে যাওয়া ভয়াবহ পবনা বাঁধ, হারেজখালি, পদ্মপুকুর, শিকারিবাড়ি ও পাথরখালি বাঁধ মেরামত হলেও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ।

পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মসিউল আবেদিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রশান্ত পাল বলেন, আইলার পর থেকে এ জনপদের মানুষের খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে খাবার পানির জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, আইলা বিধ্বস্ত কয়রা এলাকার মানুষের ভাগ্যে উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে সার্বিক সহায়তা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, আইলার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ আজও সংস্কার হয়নি। কয়রার মানুষ ত্রাণ চায় না, টেকসই বেড়িবাঁধ চায়।

advertisement