advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আলোচনায় বাংলাদেশ

মাইদুল আলম বাবু,লন্ডন থেকে
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০১:১৯
advertisement

লন্ডনের রৌদ্রোজ্জ¦ল ঝকঝকে আকাশ দেখলে মনে হয়, আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে প্রকৃতি। প্রাণবন্ত শহরটি সেরা শহরের খেতাবটি তো এমনি পায়নি। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার আনন্দ ঢাকায় বসে শেষ কবে মানুষ উপভোগ করেছে কে জানে! ওভালে পৌঁছে মনে হলো না, বিশ্বকাপ আসি আসি করছে। ব্রিটিশরা বরাবরই অতি আবেগ প্রশ্রয় দেন না।

এ দিকে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটজ্বরে আক্রান্ত ক্রীড়াপ্রেমীরা। সেদিক থেকে বিশ্বকাপের শহর একেবারে নিরুত্তাপ। একেবারে সহজ কথায় জমে ওঠেনি এখনো। আগের দিন দশ অধিনায়কের একটি মিডিয়া সেশন ছিল। একটি ছবিতে দেখা গেছে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি কথা বলছেন আর সবাই শুনছেন! হতেও পারে, মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশের জয়যাত্রা এভাবেই সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবেন! মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোনো সংসদ সদস্য আজ অবধি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি।

ক্রিকেটবোদ্ধারা সবসময় বড় আসরের ডার্কহর্সের খোঁজে থাকেন। ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। এ প্রথম আলোচনায় এসেছে টাইগাররা। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হলেও হতে পারে! আকাশ চোপড়া, অনিল কুম্বলে, রমিজ রাজা ছাড়াও অনেক সাবেক ক্রিকেটার বাংলাদেশকে খাটো করে দেখছেন না। বাংলাদেশের অর্জনকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ধরা যাবে না।

তা হলে বাংলাদেশ তো অন্যতম ফেভারিট তাই তো? ২০১৮ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে হেরেছে। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে দলটি। সিনিয়র ও জুনিয়রদের চমৎকার কম্বিনেশন দলে। বাংলাদেশকে এখন আন্ডারডগ ভাবছে না কোনো দলই। বিশ্বকাপের উইকেট স্পোর্টিং হবে না।

ব্যাটিং স্বর্গে নামবে প্রতিযোগীরা। টুর্নামেন্টে ৯টি ম্যাচ। সেমিফাইনালে যেতে হলে ৫টি জিততে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপ শুরু করবে ২ জুন। ওভালে প্রথম প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশ জয়ের ব্যাপারে আশা রাখতেই পারে। শুরুর ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জ্বলে উঠলে ভারত-পাকিস্তান নিয়ে ভাবতে হবে না।

ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে মূল পর্বের ম্যাচ ২ ও ৫ জুলাই। এ বিশ্বকাপের সূচিও বেশ সুবিধাজনক। ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার আকাশ চোপড়া বলেছেন, ‘এশিয়ায় ভারতের পর কোনো দলের যদি বিশ্বকাপে সম্ভাবনা থাকে তা হলে সেটা পাকিস্তান নয় বাংলাদেশের।’ ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে খেলেছে। যেভাবে সেবার টাইগাররা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে সেটা সবার মনে গেঁথে গেছে।

আগের বিশ্বকাপ ২০১৫-তে তো বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে বের করে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ইংল্যান্ডের মাটিতেই কপিল দেবের হাত ধরে ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম বিশ্বকাপ আসে। আগের দুবার ক্যারিবীয়দের রাজত্ব দেখেছে বিশ্ব। টানা দুটি ফাইনাল জেতার পর ক্লাইভ লয়েডের অপরাজেয় দলটি হেরে যায় কপিলের নেতৃত্বে। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তান ছিল ‘কালো ঘোড়া’।

এ টুর্নামেন্ট জেতার প্রশ্নই আসে না। ইমরান খানের ম্যাজিকে বিশ্বকাপ জিতল সেই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে অনেকে ধারণা করছিল শ্রীলংকা শিরোপা নেবে। অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে লাহোরে ফাইনাল জিতেছিল তারা। এর পর শুরু হয় অস্ট্রেলিয়ার শাসন। মাঝে ২০১১ সালে মহেন্দ্র সিং ধোনি ভারতকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপের স্বাদ দেন। কপিল, ইমরান, রানাতুঙ্গা ও ধোনির পর কে? মাশরাফি?

বুকটা কেঁপে উঠতে পারে, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়ও হতে পারে। ক্রিকেট কতটা নির্মম। সেটা দক্ষিণ আফ্রিকা খুব ভালো করেই জানে। গত দেড় বছরের পারফরমেন্সের দিকে তাকালে বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদী হতে হয়। টাইগারদের সাফল্যের পরিসংখ্যান বেশ স্বস্তিদায়ক। বিশ্বকাপের দলগুলোর মধ্যে এ সময়ে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। আগে রয়েছে কেবল ইংল্যান্ড ও ভারত।

দক্ষিণ আফ্রিকার জয় বাংলাদেশের সমান হলেও উইকেট-প্রতি রান কম হওয়ায় তারা পিছিয়ে চতুর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত হিসাবটি। বাংলাদেশ এ সময়ে খেলেছে দুটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আর এশিয়া কাপ। তিনটি টুর্নামেন্টেরই ফাইনালে উঠে শিরোপা জিতেছে একটিতে। মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার অধীনে ২৭ ওয়ানডে জয় ১৭টিতে। হার দশটি।

গত দেড় বছরে দুটি ত্রিদেশীয় সিরিজ আর এশিয়া কাপ ছাড়াও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আর জিম্বাবুয়ে ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলেছে সাকিব-তামিমরা। ৩৫ ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের জয় ২৪টিতে। ৮ হারের পাশাপাশি ফল আসেনি ৩ ম্যাচে। ২ ম্যাচ কম খেলা ভারতের জয়ও ইংল্যান্ড থেকে দুটি কম। ৩৩ ম্যাচে ২২ জয় বিরাট কোহলিদের। হার ৭টি। টাই হয়েছে ২টি ম্যাচ।

গত বৃহস্পতিবার মিট দ্য ক্যাপ্টেন অনুষ্ঠানে উপস্থাপক মাশরাফির কাছে জানতে চান বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের পরিবর্তিত মানসিকতাটা গড়ে উঠল কীভাবে। জানতে চান, যে কোনো দলকে তার দেশ হারাতে পারে, এ বিশ্বাসটা কি গত বিশ্বকাপের পর থেকে হয়েছে? মাশরাফি বললেন, ‘ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যে কোনো দিনে যে কেউ যে কাউকে হারাতে পারে।

বাংলাদেশ চৌকস ছেলেদের নিয়ে গড়া একটি দল। রয়েছে অভিজ্ঞ নবাগতদের অসাধারণ সমন্বয়। ভালো একটা শুরু পেলে তার ফায়দা নিতে জানে বাংলাদেশ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে কোনো দলকে হারানোর। আমরা আত্মবিশ্বাসী।’ বাংলাদেশ নিয়ে আকাশ চোপড়া বেশ আশাবাদী।

তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশের ওপেনার তামিম ইকবাল যথেষ্ট ভালো ব্যাটসম্যান। সাকিব, মুশফিক, সৌম্য ও মাহমুদউল্লাহ টপ অর্ডারের প্রাণ। বিশ্বকাপ জয়ের কথা পরে। আগে ভাবতে হবে তারা নক আউটে যাবে এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার রমিজ রাজা মাশরাফির ভক্ত। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি খুবই ভালো খেলছে। সর্বশেষ আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের মাধ্যমে তারা শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। আমার কাছে মনে হয় তারা সেমিফাইনাল যাবে।

ভারতের সাবেক লেগ স্পিনার, যিনি বল হাতে ছিলেন মায়াবি ঘাতক সেই অনিল কুম্বলেও বাংলাদেশের ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে আমি কখনই ছোট হিসেবে দেখতে চাই না। সম্প্রতি তারা ভালো খেলছে এটাই আমার কাছে বড় মনে হয়েছে। আপাতত বাংলাদেশের চোখ শুরুর ম্যাচটিতে। অনেক লম্বা রেসের বিশ্বকাপ। অপেক্ষা সময়ের।

advertisement