advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মোদির যেসব চ্যালেঞ্জ

সুমন মজুমদার
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ১১:০৭
advertisement

সমস্ত জল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণিত আর বিরোধী শিবিরকে চুরমার করে দিয়ে দোর্দণ্ড দাপট নিয়েই নির্বাচনী বৈতরণী পার করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনম্যান্ডেট নিয়ে খুব শিগগিরই আবার ভারতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তার দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। তবে এই নিরঙ্কুশ জয় যে সরকারের ওপর অনেক বড় প্রত্যাশার বোঝাও চাপিয়ে দিয়েছে, সেটাও একবাক্যে এখন স্বীকার করছেন মোদিসহ এনডিএ-সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞসহ সবাই বলছেন, গত সরকারের সব সাফল্য-ব্যর্থতা ভুলে আগামী পাঁচ বছরে মোদি সরকারের সামনে রয়েছে বড় বড় সব চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোদি ও বিজেপি মোকাবিলা করে তার ওপরই নির্ভর করবে, ভারতবাসীর প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব কতটুকু মিলবে।

মুম্বাইয়ের কেয়ার রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিস বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে তাৎক্ষণিকভাবে যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে সেগুলোর মধ্যে বেকারত্ব নিরসন, কৃষি ও ব্যাংকিং খাতের পুনরুজ্জীবন প্রধান। ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, দ্বিতীয় মেয়াদে মোদি সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে তা মোটেও সহজ নয়। এর মধ্যে প্রধান ও অন্যতম চ্যালেঞ্জ দেশের স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকায় আবার গতি ফেরানো।

এমনিতেই নোট বাতিলের জের এখনো টানছে ভারতের অর্থনীতি। মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে আশঙ্কাজনক অবস্থায়। ঋণের যথেচ্ছা ছাড়ে ব্যাংকগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। বেকারত্বও বেড়েছে রেকর্ড হারে। ফলে সব মিলে অনেকটাই তথৈবচ অবস্থা অর্থনীতির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার খেলাপি ঋণের প্রভাব পড়েছে ভারতের আর্থিক বাজারে। তাই ঘাটতি কমাতে নিত্যপণ্যের ওপর ভর্তুকি নিয়েও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

আবার পাঁচ বছর আগে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় মোদি বছরে দুই কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। সদ্য শেষ হওয়া লোকসভা নির্বাচনে বিরোধীরা বারবার এ ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এ কর্মসংস্থান নিয়েই ২০১৭-১৮ সালের জন্য এনএসএসওর এক সমীক্ষা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৭-১৮ সালে ভারতে বেকারত্ব ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তাই এবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে মোদিকে। যদিও লক্ষণীয় হলো, লোকসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের ইশতেহারে কর্মসংস্থান নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি বিজেপি; দেয়নি নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি।

কৃষি খাতের পুনরুজ্জীবনও মোদি সরকারের সামনে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত। গত কয়েক বছরে ফসলের ন্যায্য দাম ও পানির সুবিধা না পেয়ে এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে ভারতে প্রচুর কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। দিল্লিতে ভারতীয় পার্লামেন্ট অভিমুখে রোডমার্চ করে বিক্ষোভও করেছেন হাজার হাজার কৃষক। তাদের কথা চিন্তা করেই এবার ইশতেহারে কর্মসূচির কথা বলেছে বিজেপি। এ কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র কৃষকদের অ্যাকাউন্টে ছয় হাজার রুপি জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এখন বিষয়টি কত দূর এগোবে, সেটাই দেখার বিষয়।

দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে বিজেপির জন্য। যদিও এই কট্টর হিন্দু ধর্মীয়বাদকে কাজে লাগিয়েই এবার নির্বাচনে বিজেপি ভোট টেনেছে বলে মনে করছে অনেকে। কারণ মোদির শাসনামলেই অসাম্প্রদায়িক ভারতে গোরক্ষার নামে মুসলিম নির্যাতন ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মোঘল আমল থেকে নামকরণ হওয়া বেশ কয়েকটি শহরের নামও বদলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি দেশটির শিশুশিক্ষা পাঠ্যক্রমেও দেখা যাচ্ছে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মতাদর্শের প্রতিফলন। আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অযোধ্যায় বাবরী মসজিদের স্থলে রামমন্দির প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। কাশ্মীরেও উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে আসছে দিনগুলোতে এসব বিষয়ে মোদি সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে মোদি সরকারকে। কিছুদিন আগেই কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়েছিল ভারতীয় বাহিনী। এর পর পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির যুদ্ধ প্রায় লেগেই গিয়েছিল। শেষমুহূর্তে উভয়পক্ষ শান্ত হলেও হামলা পাল্টাহামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দুই দেশেরই। তবে অপেক্ষাকৃত সহিষ্ণু মনোভাব ও বন্দি ভারতীয় পাইলটকে মুক্তি দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তাই ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে মোদিকে। একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের হুমকিকেও।

এ ছাড়া আসছে দিনগুলোতে জয়বায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলাও ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ভারতের অর্থনীতির আকার যত বড় হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিল্পের বিস্তার। এসব শিল্প-কারখানা থেকে নিঃসরিত কালো ধোঁয়া, গাড়ির ধোঁয়া ও পোড়া ফসল থেকে তৈরি হওয়া বিষাক্ত বাতাস পরিবেশকে মারাত্মক দূষণের মধ্যে ফেলেছে। ইতোমধ্যে দিল্লি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ল্যানসেট বলছে, ২০১৭ সালে বিষাক্ত বাতাসের কারণে ভারতে ১২ লাখ ৪০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে। আবার দূষণের কারণে গঙ্গাসহ অন্যান্য বড় নদীও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ফলে সব বিষয়ে মোদি সরকার কী ব্যবস্থা নেয়, তার দিকেও তাকিয়ে থাকবে বিশ্ব। অবশ্য দিল্লিভিত্তিক ক্লাইমেট ট্রেন্ডেসের পরিচালক আরতি খোসা বলেন, যখন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে, সেখানে ভারতে এমন কোনো ইস্যু আছে বলে বোঝাই যায় না। এসব ছাড়াও মোদি সরকারের সামনে অপেক্ষা করছে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নীতি গ্রহণ, কাশ্মীরকে স্থিতিশীল করা, দুর্নীতি রোধসহ আরও সব চ্যালেঞ্জ।

২৯ মে শপথ
লোকসভা নির্বাচনে বড় জয়ের মধ্য দিয়ে আবারও ভারতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নতুন সরকার গঠনের আগে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। নতুন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২৯ মে শপথ নিতে পারেন নরেন্দ্র মোদি। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোনকে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়, মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে গতকাল মোদি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি মোদি ও মন্ত্রিদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

দিনক্ষণ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, ২৯ মে রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ নিতে পারে মোদির দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির আয়োজনে গতকালই নৈশভোজের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। শপথ গ্রহণের আগের দিন ২৮ মে বারানসিতে যেতে পারেন মোদি। এরপর সেখান থেকে যাবেন নিজ রাজ্য গুজরাটে। এই সফরে তিনি মা হিরাবেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও একদিন গান্ধীনগরে অবস্থান করবেন।

সাত দফায় অনুষ্ঠিত ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা হয় গত বৃহস্পতিবার। ফল অনুযায়ী ৫৪২ আসনের মধ্যে ৩৫২টিতে জয়ী হয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পেয়েছে ৯১টি আসন। এরইমধ্যে পরাজয় স্বীকার করে মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।

advertisement