advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সকলের বাঁচার মাঝে থাকবে তুমি বেঁচে

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০১:০৩
advertisement

জীবনের শেষ অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘সকলের বাঁচার মাঝে থাকব আমি বেঁচে।’ বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত কাজী নজরুল ইসলামের এ প্রত্যাশা বৃথা যায়নি। সত্যিই সকলের বাঁচার মাঝে, সকল হৃদয়ে চির অমর হয়ে আছেন আমাদের জাতীয় কবি; প্রেম-দ্রোহের কবি। ‘আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি, আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি’Ñ তার কবিতায় একদিকে যেমন প্রেমের বাণী উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি বিদ্রোহের। তার জন্য ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাটি যে অসঙ্গত হয়নি, সে-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তিনি কেবল বিদ্রোহের জন্যই বিদ্রোহের কথা বলেননি, তার বিদ্রোহ যে কেবল পুরনোকে ভাঙার জন্য নয়, নতুনের সৃষ্টিই ছিল তার মূল লক্ষ্য। আর এ কথার স্পষ্ট অভিব্যক্তি তো তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই আছেÑ ‘আমি উপাড়ি ফেলিব অধীন বিশ্বে অবহেলে নবসৃষ্টির মহানন্দে।’ এ রকম নবসৃষ্টির মহানন্দ বা সৃষ্টিসুখের উল্লাসের বাণীরূপ ধারণ করেই তিনি বিদ্রোহী। আবার বলেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য।’ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রেমময় নজরুলও হিমালয়সম শুভ্র। আজ সেই দ্রোহ ও প্রেমের কবি, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মজয়ন্তী।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার

জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ছোটবেলায় তিনি পিতৃহারা হন। এর পর বাধার দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত পাড়ি দিতে হয় তাকে। তবে বাংলার সাহিত্যাকাশে দোর্দ- প্রতাপে আত্মপ্রকাশ করেন কবি নজরুল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছেনÑ ‘কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

বাংলা সাহিত্যের গতিপথ পাল্টে বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ধারা তৈরি করেন কাজী নজরুল। উন্নত কণ্ঠে

উচ্চারণ করেন সাম্য আর মানবতা। ধ্যান-জ্ঞান, নিঃশ্বাস-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনায় তিনি সম্প্রীতির কবি, অসাম্প্রদায়িক মেরুদ-। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি ও বিদ্রোহ। ধর্মীয় ভেদাভেদের প্রাচীর ভাঙারও ঘোষণা আসে তার কণ্ঠে। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত তিনি। তবে বাংলা কাব্যে নজরুল এক নতুন ধারার জন্ম দেন ইসলামি সংগীত তথা গজল। তিনি প্রায় তিন হাজার গান রচনা ও সুর করেছেন, যা নজরুল সংগীত হিসেবে পরিচিত। তার কিছু গান জীবদ্দশায় গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে গানের মালা, গুলবাগিচা, গীতি শতদল, বুলবুল ইত্যাদি। পরে আরও গান গ্রন্থিত হয়েছে। তবে তিনি প্রায়ই তাৎক্ষণিক লিখতেন। এ কারণে অনুমান করা হয়, প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে বহু গান হারিয়ে গেছে। এ ছাড়া কাজী নজরুল গান রচনাকালে ১৯টি রাগের সৃষ্টি করেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তার রচিত ‘চল চল চল’ বাংলাদেশের রণসংগীত।

মধ্যবয়সে কবি নজরুল পিকস্? ডিজিজে আক্রান্ত হন। এর ফলে আমৃত্যু তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়। ওই বছর ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে সময়ের প্রয়োজনে নজরুল এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। বৈষম্যের দেয়ালে বিভক্ত বিশ্ব সম্প্রদায়ের মুক্তির বার্তা রয়েছে তার সৃষ্টিকর্মে।

এবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছেÑ ‘নজরুল-চেতনায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। সেই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে। আজ বিকাল ৩টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। এ ছাড়াও কবির স্মৃতি বিজড়িত কুমিল্লার দৌলতপুর, মানিকগঞ্জের তেওতা, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তার জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে। এর মধ্যে দৌলতপুরে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবারও দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা হাতে নেওয়া হয়েছে। শুরু হয়েছে ‘নজরুল গ্রামীণ মেলা’। প্রথম দিনের কর্মসূচি হিসেবে আজ সকাল ১০টায় নজরুল মঞ্চে রয়েছেÑ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সংগীত, হামদ-না’ত, গান, গজল, কবিতা আবৃত্তি ও ‘নজরুল চেতনায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ রচনা প্রতিযোগিতা। আগামীকালের আয়োজনে রয়েছে ‘দৌলতপুরে নজরুল’ শীর্ষক আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আজিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন উপজেলা চেয়ারম্যান আহসানুল আলম সরকার কিশোর। স্বাগত বক্তব্য দেবেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিতু মরিয়ম।

অপরদিকে নজরুলের জন্মজয়ন্তী ঘিরে রাজধানীতে বাংলা একাডেমি, ছায়ানট, চ্যানেল আই, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।