advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পে স্থবিরতা

লুৎফর রহমান কাকন
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০৮:৪৩
advertisement

সরকারের নির্মাণাধীন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রই নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদনে আসতে পারছে না। দফায়-দফায় সময় বাড়িয়েও উৎপাদনের জন্য তৈরি হচ্ছে না এগুলো। বিদ্যুৎ বিভাগ বৈঠক করে নির্দেশনা জারি করলেও কার্যত অগ্রগতি নেই। কোনো কোনো প্রকল্প গত সাত বছরেও আলোর মুখ দেখেনি।

ফলে সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা হোঁচট খাচ্ছে। এ অবস্থায় তেলভিত্তিক ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর ভরসা রাখতে হচ্ছে সরকারকে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারের নির্মাণাধীন বৃহৎ আইপিপি বা বৃহৎ ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশ কয়েকটি কয়েক বছর আগে নির্মাণ শুরু করলেও এখনো উৎপাদনে আসতে পারেনি একটিও।

অনেকগুলোর দুই-তিন বছর আগে চুক্তি হলেও কাজই শুরু করতে পারেনি কোনো কোনোটি। সরকারের ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি। এটি স্থাপনে চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১২ সালের ২৮ মে। গত সাত বছরেও প্রকল্পটি উৎপাদনে আসতে পারেনি। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের সিঙ্গেল সাইকেল বিদ্যুৎ ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোরর।

কম্বাইন্ড সাইকেল ইউনিটের উৎপাদনে আসার কথা গত বছরের ৩০ জুন। কিন্তু এখনো প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হয়নি। জানা গেছে, প্রকল্পটির কাগজ-কলমে অগ্রগতি ৭৯ শতাংশ। আর ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৯২ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কবে নাগাদ উৎপাদনে আসবে তার নিশ্চয়তা নেই। ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স মেঘনাঘাটে ৭১৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহ দেখায়।

পরে সরকার তাদের আবেদন বিবেচনায় নেয়। ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই এলওআই ইস্যু করা হয়। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে প্রকল্পটি প্রক্রিয়াধীন। ব্যক্তিমালিকানাধীন বড় আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড আনোয়ারা পাওয়ার লিমিটেডের ৩০০ মেগাওয়াট এইচএফও বা ফার্নেস ওয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা ছিল চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল। কিন্তু এখনো আসেনি। জানা গেছে, প্রকল্পটির চলতি মে পর্যন্ত আর্থিক এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ শতাংশ। উৎপাদনে আসতে আরও সময় লাগবে। এ ছাড়া গ্যাস এবং তরল জ্বালানিভিত্তিক ভোলা ২২০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট চুক্তি হয়।

চলতি বছরের ২৮ ডিসেম্বর বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে এটির নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে আসা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। চলতি মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক ৬২ দশমিক ৮ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ প্রকল্প গ্যাস ও জ্বালানি তেলনির্ভর। দেশে এমনিতেই গ্যাসের সংকট। ফলে প্রকল্পটি যথাসময়ে উৎপাদনে নিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া রয়েছে ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিবিয়ানা-৩ বিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর চুক্তি হলে পরে সংশোধিত চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৫ সালের ৩০ জুন। সিঙ্গেল সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার কথা ছিল গত বছরের ৯ জুলাই। কম্বাইন্ড সাইকেলের উৎপাদনে আসার কথা চলতি বছরের ৬ মার্চ। কিন্তু কোনোটিই আসতে পারেনি। জাপানের মারুবিনি করপোরেশন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে টার্ন কী ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে।

বিবিয়ানা দক্ষিণ ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে সরকার এক দফা চুক্তির পর সংশোধিত চুক্তি করে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি। ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে যৌথভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করছে স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি এবং লারসন অ্যান্ড টারবো লিমিটেড। সিঙ্গেল সাইকেলের চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর এবং কম্বাইন্ড সাইকেলের উৎপাদনে আসার কথা আগামী বছরের ২৯ জুলাই।

প্রকল্পটির এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৫৩ এবং ভৌত অগ্রগতি ৬৪ শতাংশ। ৪১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিট। সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি। প্রকল্পটির সিঙ্গেল সাইকেল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আর কম্বাইন্ড সাইকেলের উৎপাদনে আসার কথা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে। প্রকল্পটির সর্বশেষ হিসাবে ভৌত অগ্রগতি ৯২ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৭১ শতাংশ।

৪০৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চতুর্থ ইউনিটি রিপিয়ারিং করতে চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ৬ জুন। গত বছরের এপ্রিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সিঙ্গেল সাইকেল আর চলতি বছরের অক্টোবরে কম্বাইন্ড সাইকেল ইউনিটটি উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। জানা গেছে, বর্তমান সময় পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৬৯ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮২ শতাংশ।

খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট দ্বৈত জ্বালানির কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে চুক্তি হয় ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর। ৫৪০ দিন পর সিঙ্গেল সাইকেল এবং ৯০০ দিন পর কম্বাইন্ড সাইকেলের উৎপাদনে আসার কথা। কিন্তু এর আর্থিক ও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। সিরাজগঞ্জ ৪১৪ মেগাওয়াট দ্বৈত জ্বালানির কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে আসার কথা চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল।

এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৯৩ শতাংশ। মিরসরাই ১৫০ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি কার্যকর হয় গত বছরের ৬ জুন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে উৎপাদনে আসার কথা; কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশ। আশুগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র (পূর্ব) স্থাপনে চুক্তি স্বাক্ষর হয় গত বছরের ২০ মার্চ। ২০২১ সালের ২৯ জুন পুরোদমে উৎপাদনে আসবে। বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র দুই শতাংশ।