advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অফলাইনে রাইডশেয়ারিংই কাল হয় জিসানের
অফলাইনে রাইডশেয়ারিংই কাল হয় জিসানের

খুনের আগে ইয়াবা সেবন করে ৪ ঘাতক

ইউসুফ সোহেল
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ১৩:৩৮
advertisement

অফলাইনে অপরিচিত কাউকে রাইডশেয়ারিং কাল হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন জিসানের (২৪)। ঈদে ফুর্তি করার টাকা জোগাতে মূলত জিসানের মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ের টার্গেট করে ঘাতকচক্র। ওই মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন বিক্রির টাকায় মাস্তি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেন গাজীপুরের কামারজুরি এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী হাসিবুল হোসেন ওরফে হাসিব, তার স্ত্রী সজনী আক্তার ও হাসিবের দুই বন্ধু। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার হাসিব ও তার স্ত্রী ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিয়েছেন। জানিয়েছেন জিসানকে কীভাবে খুন করা হয়। হত্যাকাণ্ডের আগে খুনিরা মরণনেশা ইয়াবা বড়ি খায়। জিসানকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করে।

পরে কোমরে ইট বেঁধে তার মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেয়। রাজধানী থেকে নিখোঁজের ১২ দিন পর অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার ভোরে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার কামারজুরি এলাকায় হাসিবের ভাড়া বাসার সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকেই জিসানের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে হাসিবের হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয় নিহত জিসানের মোবাইল ফোন ও লাল রঙের ১৫০ সিসির হিরো হোন্ডা।

এ ঘটনায় জিসানের বাবা সাব্বির হোসেন শহীদ গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় গ্রেপ্তার দম্পতি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপহরণের পর হত্যাকাণ্ড শেষে লাশ গুমের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ৪৭। ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি জানিয়েছেন জিসানের বাবা।

এদিকে অভিযুক্ত চারজন ছাড়া ঘটনার নেপথ্যে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা জানতে গতকাল হাসিব ও তার স্ত্রীকে আদালতে পাঠিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চান তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে গতকাল তাদের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ঘাতকদের অন্যতম হাসিবের বাবার নাম মৃত নূরুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর রাজপাড়ায়। গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার কামারজুরি এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন। এই এলাকায়ই তিনি হোটেল ব্যবসা করতেন। নিহত জিসানের বাড়িও গাজীপুরে। ছয় মাস আগে গাজীপুরের গাছা থানাধীন কাথোরা এলাকায় বাড়ি করে বসবাস শুরু করে তার পরিবার।

বাড়ির কাছেই জিসানের বাবা ছোট একটি রেস্টুরেন্ট চালান। ঢাকার মিরপুরের ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জিসান চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক রাইডশেয়ারিং-পাঠাও সার্ভিসে বাইক চালিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতেন। ঢাকার শ্যামলীতে এক বন্ধুর বাসায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসগুলোয় অংশ নিতেন জিসান।

গত ৯ মে জিসান ক্লাস করতে বাইক নিয়ে ঢাকায় আসেন। ১২ মে রাতে গ্রামে ফেরার কথা ছিল। সে দিন (ঘটনার দিন) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শ্যামলীর মোড়ে বাইক নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় পরিকল্পিতভাবে হাসিবের বন্ধু শামীম যেচে ভাব জমায় জিসানের সঙ্গে। শ্যামলীর এই মোড়ে ছিল শামীম ও হাসিবের গ্রামের আরেক বন্ধুও।

কথা প্রসঙ্গে শামীম গাজীপুরের এক বন্ধুর বাসায় ইফতারের দাওয়াতে যাবে বলে জানায়। যেহেতু গ্রামেই যাচ্ছে তাই শামীমের এ প্রস্তাব লুফে নেন জিসান। ৭০০ টাকা চুক্তিতে অফলাইনে গাজীপুরের কামারজুরি এলাকার উদ্দেশে রওনা হয় তারা দুজন। ইফতারের সময় হাসিবদের বাড়ি পৌঁছায় দুজন। ভাড়া মিটিয়ে ইফতার করে যাওয়ার অনুরোধ জানায় হাসিবের স্ত্রী সজনী আক্তারসহ অন্য ৩ খুনি।

তাদের আতিথেয়তায় খুনিদের অনুরোধ ফেলতে পারেননি জিসান। পরে মোটরসাইকেল রেখে ঘাতকদের সঙ্গে ইফতারি করেন। সূত্রটি আরও জানায়, গত ১২ মে ইফতারিতে জুসের সঙ্গে জিসানকে প্রথমে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায় সজনী। রাত ৮টার দিকে গভীর ঘুমে বিছানায় ঢলে পড়েন জিসান। জিসান ঘুমিয়ে পড়লে হাসিবসহ ৩ বন্ধু ইয়াবা সেবন করে। এরপর রাত ৯টার দিকে ঘুমন্ত জিসানের হাত-পা বেঁধে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। কিন্তু লাশ ফেলবে কোথায়? এই নিয়ে খুনিরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়।

পরে হাসিবের বাসার রান্নাঘরের নিচে সেপটিক ট্যাংকে মরদেহ ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। লাশ ফুলে ওঠার পর যদি ভেসে ওঠেÑ তাই একটি বস্তায় ৬টি ইট ভরে তা রশি দিয়ে জিসানের কোমরে বেঁধে নিথর দেহটি ফেলে দেয় সেপটিক ট্যাংকের ভেতর। এর পর ট্যাংকটির মুখে পাথরের স্লাব দিয়ে চারপাশে বালু দিয়ে আটকে দেয় যেন দুর্গন্ধ না ছড়ায়। লাশ গুমের প্রক্রিয়াটি শেষ হতে রাত সোয়া ১২টার মতো বেজে যায়।

এর পর স্বাভাবিকভাবেই যে যার মতো ঘরে গিয়ে ফুর্তিতে মেতে ওঠে। এর আগে (খুনের পর পর) জিসানের মোটরসাইকেল ও অপ্পো মোবাইল ফোন নিজ হোটেলে তুলে রাখে হাসিব। জিসান হত্যাকা-ের তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সুজানুর ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, ১২ মে রাত ১০টার পরও জিসান বাসায় না ফেরা এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় সন্দেহ হয় স্বজনদের।

১৬ মে শেরেবাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন নিহতের বাবা। জিডির সূত্র ধরে ঢাকা মহানগর তেজগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে তিন দিন অভিযান চলে। অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোরে গাছার মধ্য কামারজুরি এলাকায় তার হোটেলের পাশ থেকে হাসিবকে আটক করা হয়।

advertisement