advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সাইকেলের ডানায় দুরন্ত বালিকারা

চৌধুরী ভাস্কর হোম,মৌলভীবাজার
২৫ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ মে ২০১৯ ০১:৩৪
advertisement

শহরের পিচঢালা পথ। অলি-গলি, বাড়ি-গাড়ি সারি-সারি। ট্রাফিক সিগন্যালের ‘ফাঁদে’ আটকে পড়া বিরক্তিকর সময়। এরই মধ্যে বাইসাইকেল চেপে ফাঁকফোকর দিয়ে সবাইকে পেছনে আচমকা ছুটে যায় এক দূরন্ত বালিকা। এ যেন সাইকেলের ডানা মেলে উড়ে যাওয়া মেঘবালিকা। কখনো দলছুট, আবার কখনোবা ঝাঁকের বলাকা।

চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গলে ইদানীং হরহামেশাই নজরে পড়ে এমন সাইকেলকন্যাদের। খাঁ খাঁ রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টি থেমে নেই তাদের অগ্রযাত্রা। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কিশোরী-তরুণীরা। দিন পাল্টেছে, পাল্টেছে চাহিদার ধরন। পরিবর্তনের এই ক্ষণে নতুন প্রজন্মের কিশোরী-তরুণীরা এখন আর রেশমি চুড়ি কিনে দেওয়ার বায়না ধরে না।

এর বদলে এখন মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগের বায়না ধরে বাবা কিংবা বড়ভাইয়ের কাছে। সাইকেলের আবদার নিয়েও এখন অনেক মেয়ে দাঁড়ায় বাবার সামনে। অথচ কয়েক বছর আগেও নারীদের অনেক সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হতো। পরিবার থেকে বিধিনিষেধ থাকত। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত ছিলেন মা-বাবা।

কিন্তু এ প্রজন্মের দূরন্ত নারীরা সব কুপম-ুকতাকে পেছনে ফেলে শঙ্কা জয় করে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম ও অনগ্রসর এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার জন্য সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) পক্ষ থেকে বাইসাইকেল দেওয়া হচ্ছে। আর সেই মেয়েদের সাইকেলে চড়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে শহর এলাকার মেয়েরাও সাইকেলিংয়ে আগ্রহী করে ওঠে।

শুধু হাতে থাকা স্মার্টফোন ব্যবহারেই পড়ে থাকা নয়, দৈহিক ও মানসিকভাবে ফিট থাকার জন্যই অনেকে সাইকেলিংয়ে বের হয়। নিজের প্রয়োজনীয় কাজটুকু সারতেও মেয়েরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। শ্রীমঙ্গল শহরে প্রায়ই দেখা যায় দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যাম, এর মধ্য দিয়েই সবাইকে পেছনে ফেলে সাইকেলে চেপে ছুটে যাচ্ছে তরুণীরা।

শুধু বাইসাইকেলই নয়, কেউ কেউ বলছেÑ আরেকটু বড় হয়ে স্কুটার বাইক চালানোরও ইচ্ছে তাদের। নারী রাইডাররা বলছেন, মূলত পরিবারের সহযোগিতা থাকায় শ্রীমঙ্গলে এখন শতাধিক নারী সাইকেল চড়ে ঘুরতে পারছেন। নারীদের বাইরে এসে নিজের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও একঘেয়েমী জীবন থেকে বেরিয়ে আসার পথে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় কিছু তরুণ।

পুরুষ রাইডারদের পাশাপাশি নারী রাইডার তৈরি করার ক্ষেত্রে ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপ সাইক্লিস্ট অব শ্রীমঙ্গলের (সিওএস) মডারেটর ও প্রশিক্ষক দীপ চক্রবর্তী তাদের অন্যতম। তিনি বলেন, সাইকেল চালালে যে সুবিধাটা হয়, বাড়ি থেকে বের হয়ে আমাকে আর গাড়ির জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, যানজটে বসে থাকতে হয় না। বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন ছেলেরা একটু বড় হলেই বাইসাইকেল কিনে দেওয়া হতো।

পাড়ার অন্য আরও অনেকে মিলে স্কুল, কলেজে ক্লাস বা প্রাইভেট পড়তে যাওয়া অথবা ঘুরে বেড়ানো সবই চলত বাইসাইকেলে চড়ে। এখন সময়ের পালা বদলে মেয়েরা সাইক্লিংয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। দীপ বলেন, এখন অনেকে অবাক বিস্ময়ে একঝাঁক মেয়ের সাইকেল চালানো দেখেন। এতে সমাজে মেয়েদের প্রতি চলে আসা যে তথাকথিত সামাজিক বাধা ছিল, সেটি কাটিয়ে মেয়েরাও যে ছেলেদের সমকক্ষ এবং একে অপরের পরিপূরক এ মেসেজটুকু সমাজে চলে যাবে। এতে সমাজ হবে আরও মানবিক, উদার ও নারীবান্ধব।

কলেজ শিক্ষার্থী তিথী ভট্টাচার্য্য বলেন, আমার ভাইয়ের সাইকেল ছিল। ওর সাইকেল চালানো দেখে আমার প্রথমে আগ্রহ জেগেছে। তার পর দীপ ভাইয়ার কাছ থেকে আমার সাইকেল চালানো শেখা। এখন আমার খুব ভালো লাগছে যে, আমি সাইকেল চালাতে পারছি। কলেজ শিক্ষার্থী প্রিমিন্দিতা বৈদ্য ঐশি বলেন, ছোটবেলা থেকে সাইকেলিং করার ইচ্ছে ছিল আমার; কিন্তু পরিবার থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি।

আমি নিজে থেকে আসছি। তার পর এখানে এসে আমি গ্রুপে যাদের পেয়েছি, তারা আমাকে সহযোগিতা করেছে। ওদের অনেক ধন্যবাদ। আমি আজকে তাদের জন্য এখন স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারছি। কলেজ শিক্ষার্থী শাহিনুর ইসলাম বলেন, প্রথমে আমার বাবাই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ছোটবেলায় সাইকেল কিনে দিছেন, চালানো শিখাইছেন।

কখনো বলেননি যে তুমি মেয়ে, তুমি সাইকেল চালাতে পারবে না। এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী অর্পিতা দেবনাথ মিতু বলেন, ৪ বছর ধরে নিয়মিত সাইকেল চালাচ্ছি। এটি শারীরিকভাবে উপকারী। ফিটনেস থাকার জন্য ভালো একটি ব্যায়াম। আমি কোচিংয়ে যেতে সাইকেল ব্যবহার করি। আর প্রতি শুক্রবারে মেগা রাইডে যোগ দেই।