advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কৃষক না ভোক্তাও না লাভ হয় কার

মো. মাহফুজুর রহমান
২৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মে ২০১৯ ০৯:১২

ধান-চালের উৎপাদক ও ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যপার্থক্য বিশাল। এক হিসাবে দেখা গেছে, এ পার্থক্য গড়ে ২০ থেকে ২২ টাকা। উৎপাদনকারী কৃষক যেখানে চালের দাম পাচ্ছেন ১৮ থেকে ২০ টাকা, সেখানে ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে ৩৪ থেকে ৪০ টাকায়।

ক্ষেত্রবিশেষে দামের এ পার্থক্য আরও বেশি। এ ব্যবধানের সিংহভাগ অর্থ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে। উৎপাদক আর ভোক্তাপর্যায়ে ধান-চালের বিস্তর পার্থক্য ভাবিয়ে তুলছে অর্থনীতিবিদদের।

advertisement

সাধারণ মানুষের কাছে বিআর ২৮ চালের চাহিদা বেশি। রাজধানীর কয়েকটি চালের বাজার ঘুরে ও সরকারি সংস্থার হিসাবে দেখা যায়, খুচরা বাজারে এ চালের কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন দাম ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা। পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২ টাকা। খুচরা বাজারের সঙ্গে পাইকারি বাজারের মূল্যপার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ৫ থেকে ৬ টাকা।

সারাদেশের গড় হিসাবে কৃষকপর্যায়ে বর্তমানে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়। অথচ এক কেজি ভালো মানের চাল কেনার জন্য ভোক্তাকে গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, আর মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। অভিযোগ উঠেছে, চালকল মালিকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা উৎপাদন খরচের অর্ধেক মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চালের দামও নিয়ন্ত্রণ করছেন তারাই। বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে নতুন চাল না আসায় দাম এখনো বেশি। এদিকে গতকাল শনিবার ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিমণ ধান ৩২০-৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। অর্থনীতি সমিতির সভাপতি আবুল বারকাত মনে করেন, উৎপাদন খরচের সঙ্গে শ্রমের মূল্য যোগ করে এবার ধানের দাম প্রতিমণ ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত।

এ মুহূর্তে প্রতিমণ বোরো ধান উৎপাদনে ৬০০ টাকার বেশি খরচের যে হিসাবটি দেওয়া হচ্ছে, তা কৃষকের পারিশ্রমিক বাদ দিয়ে করা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক আমাদের সময়কে জানান, কৃষকের স্বার্থরক্ষায় বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। এখনো মধ্যস্বত্বভোগীদের কুমতলব না বুঝে সহজ-সরল কৃষক আগের মতোই আশায় বুক বেঁধে ধান ফলিয়ে যাচ্ছেন।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তালিকাধারী প্রান্তিক কৃষক ফজল মিয়া। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে গতকাল কথা হয়, আর বৃহস্পতিবার কথা হয় ওই এলাকার কৃষি বিভাগের কর্মীর সঙ্গে। উভয়ের বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। খুচরা বিক্রেতা, পাইকার এবং মিল মালিকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিআর ২৮ ধান কৃষক বিক্রি করছেন সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা মণ।

এক মণ ধানে চাল হয় ২৫ থেকে ২৮ কেজি। সে হিসেবে কেজিপ্রতি চালের দাম হয় ১৭ থেকে ১৮ টাকা। কৃষকরা ১৮ থেকে ২০ টাকা পাচ্ছেন। অথচ বাজারে চাল অর্থাৎ ভোক্তাপর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৪০ টাকা। এখানে পার্থক্য ২০ থেকে ২২ টাকা। ধানের মানভেদে এই মূল্যপার্থক্য আরও বেশি। বাজারে ধান ও চালের দামের এমন তারতম্যকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশ্লেষকরা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক আমাদের সময়কে জানান, কৃষকের স্বার্থরক্ষায় বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছর এক বিঘা জমিতে বোরো চাষ করতে কৃষকের খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। সমপরিমাণ জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে গড়ে ১৫ মণের মতো। জমির ইজারা খরচ এবং ধান ঘরে তোলার জন্য কৃষকের মজুরি যোগ করলে খরচ দাঁড়ায় ২০ হাজারের মতো।

কিন্তু ধান বিক্রি করছেন তার অর্ধেক দামে। প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ এক বিঘা জমিতে বোরো চাষ করে কৃষকের লোকসান ৬ থেকে ১০ হাজার টাকার বেশি। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গতকাল রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ভালো মানের চাল বিক্রি হয় ৫২ থেকে ৫৬ টাকায়।

সবচেয়ে কম দামি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। রাজধানী ঢাকার কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি বাজারে বর্তমানে ৫০ কেজির প্রতিবস্তা আটাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ টাকা, মিনিকেট নতুন চাল ২ হাজার ২০০ টাকা এবং পুরনোটা ২ হাজার ৪০০ টাকায়। স্বর্ণা ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৮০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া গুটি চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতিবস্তা ১ হাজার ৩২০ টাকায়। এদিকে চালের দাম না কমলেও ধানের দাম কমেই চলেছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও বাজারে নতুন ধান বিক্রি হয়েছে স্থানভেদে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ। আর এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন চিকন চালের ধান মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ধানের দাম আরও কম। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দর কমেছে ২৩ থেকে ২৫ শতাংশেরও বেশি।