advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জ্যৈষ্ঠের মেঘলা দিনে নজরুল বন্দনা

সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
২৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মে ২০১৯ ০৮:৪৮
advertisement

বাংলা ও বাঙালির অস্তিত্বে মিশে আছে যে কবি তার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবি। সাম্য, প্রেম, মানবতা ও দ্রোহের কবি। কবিতায় ও গানে তিনি বলে গেছেন মানুষ ও মানবতার কথা। জাতি ও ধর্মের ওপর মানবতাকে ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে তিনি স্থান দিয়েছেন দ্বিধাহীন চিত্তে। আগামী চেতনার পথে।

গতকাল ছিল এ মহান কবির ১২০তম জন্মজয়ন্তী। জ্যৈষ্ঠের মেঘলা আবহাওয়া আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে গতকাল শনিবার বিনম্র শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করেছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। বৃষ্টিস্নাত সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত কবির সমাধিসৌধে ফুলেল শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের নজরুলজয়ন্তী উদ্যাপনের আয়োজন।

পরে কবির স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জেলা এবং রাজধানীতে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। এর মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্র­ণালয় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কবির স্মৃতিধন্য ময়মনসিংহের ত্রিশালে। এ ছাড়াও কুমিল্লার দৌলতপুর, মানিকগঞ্জের তেওতা, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা এবং চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় আয়োজন করা হয় নজরুলজয়ন্তীর অনুষ্ঠান।

কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন : ভোর থেকেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিসৌধ প্রাঙ্গণে জমায়েত হয় সর্বস্তরের মানুষ। প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জমান। এর পর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘কবিতা, গল্পের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম সারাজীবন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সব সময় কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ছিলেন। ধারণ করেছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে।’

বিএনপির পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম বলেন, ‘দেশে অত্যাচার-নিপীড়ন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, এখন প্রতি মুহূর্তেই কাজী নজরুল ইসলামকে মনে পড়ে। তিনি শুধু দেশের কবি নন, সারাবিশ্বের কবি। তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কবি নন।’

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাউসার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পক্ষে সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ ছাড়াও শ্রদ্ধা জানায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, জাসদ, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল একাডেমি, মানিকগঞ্জ সমিতি-ঢাকা, ঢাবি নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোট, বঙ্গবন্ধু কবিতা পরিষদ, ঢাবির বিভিন্ন হলের ছাত্র সংসদ, নজরুলসংগীত শিল্পী সংসদ, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী।

রাষ্ট্রীয় আয়োজন : ‘নজরুল চেতনায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যে নজরুলজয়ন্তীর মূল অনুষ্ঠান চলছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। স্থানীয় নজরুল মঞ্চে তিন দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবির নাম হলো জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির কর্মময় জীবন মাত্র ২৩ বছরের। এ স্বল্প সময়ে কবি নজরুলের সাহিত্য রচনার পাল্লা কী অসাধারণ ভারী। একজন কবি যে কত বৈচিত্র্যের হতে পারে তার নমুনা কবি নজরুল ইসলাম।’

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।

এতে ‘নজরুল চেতনায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ শিরোনামে স্মারক বক্তৃত্বা দেন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবিপৌত্রী খিলখিল কাজী, ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক সুভাষ চন্ত্র মাঝি। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্র­ণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবু হেনা মোস্তফা কামাল। কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয়েও আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন : কবির সমাধি প্রাঙ্গণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাসভা। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীন এবং ঢাবি নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামাল। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ভীষ্মদেব চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আয়োজনে কবিতা আবৃত্তি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামান। অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন সংগীত বিভাগের শিক্ষক ড. মহসিনা আক্তার খানম (লীনা তাপসী), খায়রুল আনাম শাকিলসহ বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

ছায়ানটের নজরুল-বন্দনা : নজরুলজয়ন্তীতে বর্ণিল আয়োজন বসে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে। বেলা ১১টায় রাজধানীর ধানম-ির শঙ্করের ছায়ানট ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে শুরু হয় অনুষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের শিল্পীদের সম্মেলক কণ্ঠে গাওয়া হয় ‘জাগো অমৃত পিয়াসী চিত’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন।

এর পর নজরুল কথনে ছায়ানটের সহসভাপতি খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, ‘জাতীয় জীবনে নজরুলের অবদান অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণার উৎস। তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার রচনাগুলো আমাদের সুন্দর মানবিক জীবনের পথ দেখায়। বাঙালি হয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনাগরিক।

তার সংগীত এতটাই সমৃদ্ধ যে, আমাদের শুদ্ধ সংগীতচর্চায় অনুপ্রাণিত করে।’ এর পর একক পরিবেশনায় সুপ্তিকা মণ্ডল ‘আকাশে ভোরের তারা’, মনীষ সরকার ‘ওগো অন্তর্যামী, ভক্তের তব শোন’, মোহিত খান ‘তুমি যতই দহনা দুখের অনলে’, ঐশ্বর্য সমদ্দার ‘খেলে নন্দের আঙিনায় আনন্দ দুলাল’, লায়েকা বশির ‘অন্তরে তুমি আছো চিরদিন’, তানভীর আহমেদ ‘কাল্মা শাহাদতে আছে খোদার জ্যোতি’, শ্রাবন্তী ধর ‘ভাইয়ের দোরে ভাই কেঁদে যায়’ ও বিটু কুমার শীল গেয়ে শোনান ‘স্বদেশ আমার, জানি না তোমার’। নজরুল রচনা থেকে পাঠ করেন সুমনা বিশ^াস ও জয়ন্ত রায়। সবশেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান।