advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হিন্দুত্ববাদ কি ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিয়তি

আহমদ রফিক
২৬ মে ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ২৬ মে ২০১৯ ০৯:৩৩
advertisement

সেক্যুলার সংবিধানের ভারত মনে হয় ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কিছুসংখ্যক সেক্যুলার মননের আরোপিত শাসনব্যবস্থা নিয়ে তার রাজনৈতিক পথপরিক্রমা শুরু করেছিল। আরোপিত বলছি এ কারণে যে, ইংরেজের হাত থেকে শাসনক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তপাত ঘটেছিল, এমনকি পরেও ঘটেছে- তা সুস্থ রাজনীতির জন্য স্বাভাবিক ছিল না।

বিভাজিত ভারতবর্ষের দুই ডোমিনিয়ন ভারত ও পাকিস্তান ওই ঐতিহ্য তাদের রাজ্যব্যবস্থা এবং পরিচালনার বাস্তবতা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও নরহত্যা বিরোধিতার প্রতীক গান্ধীকে হত্যার (১৯৪৮) বিষয়টি থেকেই শুরু করা যায়, তা হলে বলতে হয়- স্বাধীন ভারতের যাত্রা শুরু গান্ধী হত্যার মাধ্যমে। এর পর দুই দেশে থেকে থেকে সাম্প্রদায়িক রক্তস্নান বুঝিয়ে দিয়েছে যেমন রাজনীতিকরা, তেমন জনগণ নরহত্যার দূষণ ও পাপ থেকে মুক্ত নয়। মুখে যতই অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলা হোক, ভারতবাসী বা পাকিস্তানবাসী মানুষের বিরাট অংশ মানসিক সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তবু ব্যক্তিগত ও দলগত প্রভাবের কারণে গেরুয়া রাজনীতির সাম্প্রদায়িক প্রকাশ ঘটেছে ধীরে-সুস্থে কংগ্রেসের অপশাসনের প্রতিক্রিয়া ও পরিপ্রেক্ষিতে।

কংগ্রেস রাজনীতির বোধিবৃক্ষে সাম্প্রদায়িক পোকার আক্রমণ বিজেপির উত্থানের বড় কারণ বলে মনে করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতির বিস্তার মানুষকে বিকল্প চিন্তার দিকে ধাবিত করতে সহায়তা করেছে। শুরু থেকে লোকসভায় বিজেপির আসনসংখ্যা বিচার করে দেখলে জনগণের পক্ষ থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট যে, তারা কংগ্রেসকে জনবান্ধব শাসনের জন্য অনেক সময় ও সুযোগ দিয়েছে। কংগ্রেস এর সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। আর পারেনি বলেই বিজেপি ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে এগিয়েছে। হঠাৎ চমকে সবাইকে চমকে দিয়ে লোকসভা জয় করেনি বা করতে পারেনি। ইতোমধ্যে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের হাত ধরে বিশালায়তন ভারতে নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের একাধিক ধারার প্রকাশ ঘটেছে। এর নায়ক বা নায়িকারা মুখে যে যাই বলুন- জনবান্ধব ছিলেন না, ছিলেন আত্মস্বার্থপর। মায়াবতী, জয়ললিতা থেকে চন্দ্রবাবু নাইডু কিংবা লালু প্রসাদ যাদব অথবা নীতিশ কুমার- কেউ সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে সুশীল রাজনীতির উদাহরণ গড়ে তুলে ধরতে পারেননি।

কিছুকাল থেকে ক্ষমতায় আসীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও হিংস্র রাজনীতির ক্যাডারনির্ভরতা নিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়েছেন। ভোটার তরফে ভয়ভীতি, আতঙ্কই বড় হয়েছে। আর কংগ্রেস থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি বড় হয়ে থেকেছে। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের সমস্যা কাকে ছেড়ে কাকে ভোট দেওয়া এবং কেন ভোট দেওয়া। ওই বিবেচনায় মন্দর ভালোটিই গ্রহণযোগ্য। ভোট টানার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় বিবেচ্য, ব্যক্তিগত ক্যারিশমা। এদিকটা পরিবারতন্ত্রী রাজনীতির ভক্ত কংগ্রেস একালে এসে ভেবে দেখেনি। রাহুল গান্ধী সেদিক থেকে মোদির পাশাপাশি ম্লান। ইন্দিরা-পরবর্তী কংগ্রেস রাজনীতি নিয়ে নেতৃত্বের যে বিভাজন ও সেক্যুলারিজম নিয়ে যে ছেলেখেলা (বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা অমান্য করে মি. ক্লিন হিসেবে পরিচিত রাজীব গান্ধীর রামমন্দিরের শিলান্যাস) এবং দুর্নীতি বিজেপির জন্য তুরুপের তাস জুগিয়ে দিয়েছিল।

সেক্যুলারিজম শব্দটিই ভোটারদের কাছে অর্থহীন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রশ্নটি কী এমন দাঁড়ায় না যে, সাম্প্রদায়িকতাকেই যদি মান্য করতে হয়- তা হলে কংগ্রেসকে কেন, নতুন আবির্ভূত রাজনৈতিক শক্তি বিজেপিকেই ভোট দিই না কেন। সহনশীল হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়িকে তবু ঐক্যজোট করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছিল। ক্রমেই বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি। পরবর্তীকালে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নম্র ব্যক্তিত্বের মনমোহন সিংয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না উগ্র বিজেপিকে সামলে দেওয়া। ওই উগ্রতার প্রতীক নরেন্দ্র মোদি।

দুই. এ ক্ষেত্রে আমি একটি প্রশ্ন বরাবর ভারতীয় ভোটারদের সামনে তুলে ধরি। আর তা হলো গুজরাট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নেপথ্য নায়ক নরেন্দ্র মোদিকে যখন তারা ভোট দিয়ে জেতান, তখন কি ওই ভয়াবহ গুজরাট নরহত্যার বীভৎস ছবি তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে না? এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষায়। কিন্তু উন্নয়ন সব কিছু ঢেকে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন নরহত্যার পাপ চাপা দিয়েছে। তা যদি শুধু গুজরাটবাসীর চেতনার জন্য সত্য হতো, তা হলেও এক কথা। তবে তা দেখা গেল ২০১৪ সালে সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে, লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে। কথিত মোদিঝড়ে সব দল ভেসে গেল। ওই ঝড়ের শুদ্ধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। নিরঙ্কুশ জয়ের নায়ক বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। শুরুতে কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত, ইতিউতি ভিন্নমত ওই ঝড়ে উড়ে গেল। নরেন্দ্র মোদি তখন জাতীয় বীর, অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে। অনেক প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের অনেক স্বপ্ন, বেকার যুবকদের জন্য সোনালি প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি নিয়ে তার রাজাসনে বসা। অনেকটাই সবাইকে চমকে দিয়ে দিল্লির রাজসিংহাসন জয় নরেন্দ্র মোদির।

তিন. সব পত্রিকায় ‘এক রা’- মোদিঝড়। ঝড়টা কী? সেটি একদিকে উন্নয়ন, অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদ। উন্নয়ন কতটা হিসাব করতে গেলে রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর নির্মাণ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সাধারণ বিষয় বাদ দিলে যুবকদের কর্মসংস্থান, কৃষকদের অবস্থার পরির্তনের মতো একাধিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি মোদি। এমনকি ব্যাংক নোট বাতিল নিয়ে দীর্ঘদিন চলেছে মোদিবিরোধী প্রতিবাদ। ইতিবাচক দিক হলো ধনী আরও ধনী হয়েছেন, বৃহৎ ব্যবসায়ী বৃহত্তর ব্যবসায়ীতে পরিণত।

নির্বাচনের কিছুদিন আগে জনা দুই খ্যাতিমান বিশ্লেষকের কলামে মোদিবিরোধী নেতিবাচক দিকগুলোর প্রাধান্য দেখেছি। একই সঙ্গে কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনে বিজেপির বিপর্যয়, সব মিলিয়ে ভাষ্য, এবারের নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পক্ষে মতামত প্রকাশ, মোদি বিচলিত এমন কথাও প্রকাশ পেয়েছিল। সম্ভবত ওইসব রুখতে মোদি নির্বাচনী সেøাগানে শুধু উন্নয়নের কথাই নয়, হিন্দুত্বাবাদী ভাষাও ব্যবহার করেছেন। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টি ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়টি ভারতবাসীর জন্য বরাবরই স্পর্শকাতর। এর ওপর কাশ্মীর ইস্যু।

মোদির বডি ল্যাঙ্গুয়েজে যুদ্ধংদেহী ভাব কি ভোটার-জনতার উদ্দীপ্ত করে তাদের মন পাল্টে দিয়েছিল। হিটলারি উগ্রতায় মানুষ বিভ্রান্ত হয়, নেতিবাচক দিকগুলো ভুলে যায়। এটিই কি মোদিঝড়ের নেপথ্য, তাৎপর্য মানুষ কি গত ৫ বছরের মোদি শাসনের চরিত্র ভুলে গিয়েছিল। মনে ছিল না করভারের কথা, কৃষকের আত্মহত্যার কথা, বিমান ক্রয়ে দুর্নীতির কথা, ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের কথা (দিল্লি-মুম্বাইয়ের মতো মহানগরেরও)।

গত নির্বাচনে এবং এ নির্বাচনে জয়ের পর মোদি সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করা অর্থাৎ ঐক্যের কথা বলছেন। ওই ঐক্যের কোনো প্রমাণ কি দিয়েছেন মোদি গত ৫ বছরে। বিশেষভাবে খ্রিস্টান ও মুসলমান তো স্মরণ করতে পারবেন, তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ঘটনাবলি। তবু ঝড় তার পক্ষে, ঝড় তাকে বিরাট বিজয়ের সাফল্য এনে দিয়েছে এর আগের দোদুল্যমানতা থেকে। কিন্তু কেন, কী তার রহস্য। এ বিজয় আমি নেতিবাচক চরিত্রে দেখি।

অর্থাৎ প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে জনমুগ্ধকর স্লোগান তুলতে পারেনি, ভালো রকম বলিষ্ঠ কর্মসূচি দিতে পারেনি। শুধু ‘মোদি হটাও’ স্লোগান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করবে কেন, যদি এর পেছনে যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তবতা না থাকে। সর্বোপরি ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য রাজনীতিতে, এমনকি ভোটে ধর্মীয় স্লোগান জনমনে মুগ্ধতা, যেমন দেখা গেছে ১৯৪৬ সালে, তেমনি ২০১৪ সালে, এবারও তাই ২০১৯ সালে।

অবাক হয়ে ভাবতে হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ নেপাল যেখানে ধর্মীয় হিন্দু রাষ্ট্রীয় চরিত্র থেকে মুক্তির ঠিকানা খুঁজেছে, সেখানে একদা গণতন্ত্রী ভারত তার সেক্যুলার চরিত্র বিসর্জন দিয়ে হিন্দুত্ববাদে নিজেকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করছে। কেউ ভাবছেন দ্বিতীয় নিরঙ্কুশ জয়ের পর মোদি হয়তো বাজপেয়ির পথ তার পথ বলে ভাবতে পারেন। আমার তা মনে হয় না। আর বিদেশনীতির কুটচাতুর্যে সফল মোদির কাছ থেকে দ্বিতীয় দফায় তিস্তাসহ নতুন কিছু আদায় করতে পারবেন ভাবছেন যে বাংলাদেশি, তারা হয়তো ভবিষ্যতে হতাশই হবেন। দেবে আর নেবে মেলাবে-মিলিয়ে কখনো সত্য প্রমাণিত হবে বলে মনে হয় না। তবু আশা করতে দোষ কী।

আর কংগ্রেস। বিপর্যয়ের মুখে তাকে বিচক্ষণ, বলিষ্ঠ ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব খুঁজতে হবে। এ জন্য তাকে গান্ধী পরিবারের বাইরে যেতে হলেও এতে অসুবিধা কোথায়? আঞ্চলিক দলগুলো জাতীয় স্বার্থ, মতাদর্শিক স্বার্থ নিয়ে একাট্টা হতে না পারা পর্যন্ত বলিষ্ঠ বিরোধিতা তৈরি করতে পারবে না। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠেই সেটি সম্ভব। মোদি হটাও তখনই সফল স্লোগান, যখন কেন হটাও-এর সত্যটি জনগণ আশা করতে পারবে। ফাঁকা আওয়াজে কখনো লক্ষ্য অর্জিত হয় না। মোদির নেতিবাদী ভূমিকা কি প্রতিপক্ষ তুলে ধরতে পেরেছে নির্বাচনী প্রচারে। বিশেষ করে মানুষের অপ্রাপ্তির দিকগুলো, নাকি হিন্দুত্ববাদ ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিয়তি? সময় এর জবাব দেবে।

আহমদ রফিক : কবি, ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক