advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

লেবাননে এ কেমন জীবন বাংলাদেশি নারীদের!

বাবু সাহা,লেবানন
৪ জুন ২০১৯ ১৯:৪৯ | আপডেট: ৫ জুন ২০১৯ ০১:৩৪
লেবাননে ডাস্টবিন থেকে বোতল কুড়াচ্ছেন এক বাংলাদেশি নারী। ছবি : আমাদের সময়

ব্যক্তিগত কাজে সাপ্তাহিক ছুটির (রোববার) দিনে লেবাননের প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা দাওড়াতে গিয়েছিলাম। যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি দৃশ্য। একজন মধ্যবয়সী নারী শ্রমিক প্রখর রোদে রাস্তার পাশে রাখা ডাস্টবিনের ভিতরে কিছু একটা খুঁজছেন। মনে কৌতূহল জাগল, রাস্তার ডাস্টবিনে কী খুঁজছেন ওনি। গাড়ি থেকে নেমে ওই নারীর কাছে গেলাম। দেখে মনে হলো বাংলাদেশি। তাই বাংলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি বাংলাদেশি?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ এরপর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী নাম আপনার?’ বললেন, ‘রানজিদা খাতুন।’

‘তো আপনি এই ডাস্টবিনে কী খুঁজতেছেন?’

‘কিছু না, আমি পেপসি, সেভেন আপের খালি বোতল কুড়াই। আমি টুকাই।’

‘বাড়ি কোথায় আপনার?’

‘সাতক্ষীরায়।’

এরপর জানা গেল বাকিটা...

২০১৪ সালে দালাল ধরে লেবাননে আসেন রানজিদা। তিন সন্তানের এই জননী তার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে লেবাননে এসেছিলেন। ফ্রি ভিসায় লেবাননে এসে প্রথমে কাজ করতে পারলে এখন তিনি টোকাই। অবৈধ হওয়ায় লেবানন সরকারের কড়াকড়িতে পরে আর কাজ পাননি তিনি। বয়স ৩৫ পেরিয়ে যাওয়ায় কেউ আর এখন কাজও দেন না। তাই কোনো উপায় না পেয়ে রাস্তায় রাস্তায় কাগজ-বোতল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।

দাওড়ার রাস্তায় এই কাজ করে মাসে যে টাকা (২০০ বা ২৫০ ডলার) উপার্জন করেন, তা দিয়ে নিজে এবং দেশে কোনোমতে ভরণপোষণ যোগান তিনি।

লেবাননে অবৈধ শ্রমিকদের ধরতে প্রায়শ অভিযান চালায় দেশটির পুলিশ। গ্রেপ্তারের ভয় লাগে না এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, পুলিশের আবার কিসের ভয়, পুলিশ ধরলে ধরব, এখন আর পুলিশের ভয় করি না। আমি কি চুরি করতাছি? গায়ে-গতরে খাটি কাম করি। কাম না করলে খাইব কী, জানান রানজিদা।

লেবাননে রাইজিদার মতো বহু বাংলাদেশি আছেন, যারা ফ্রি ভিসার এসে দেশটিতে কাজ করতেন। কিন্তু তা ছিল প্রায় ৮-১০ বছর আগের কথা। সে সময় এসব নারী শ্রমিকদের লেবাননে বেশ চাহিদা ছিল। মাসে অন্তত ৭০০-৮০০ মার্কিন ডলার উপার্জন করতেন তারা। নারী শ্রমিকরা তখন ঘণ্টায় চার ডলার করে আয় করতেন।

বর্তমানে দেশটিতে বিভিন্ন দেশের নারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কাজ পাওয়া বেশ দুঃসাধ্য। এছাড়া সেসময় ফ্রি ভিসায় গিয়ে যেসব নারী শ্রমিকরা বাসা-বাড়িতে কাজ করছিলেন তারাও এখন আর ভালো নেই। এর বাইরে অতিরিক্ত টাকা উপার্জনের আশায় যারা চুক্তিভিত্তিক কাজ থেকে পালিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ নিয়েছিলেন, তাদের অবস্থাই সবচেয়ে বেশি খারাপ।

এসব নারী শ্রমিকদের অধিকাংশই এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। পালিয়ে অবৈধ হওয়ার ফলে দেশে যেতে পারছেন না তারা। এদিকে দেশে টাকা পাঠাতে না পারায় পরিবারের সঙ্গেও এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দেশটিতে বহু বাংলাদেশি নারী কর্মীদের দেশে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে। অনেকে আবার অভাবের তাড়নায় বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে।

তবে, এত কিছুর পরও দেশটিতে থেমে নেই নারী শ্রমিকের যাওয়া। নারী কর্মীদের জন্য কাজ না থাকলেও প্রতিদিনই দেশটিতে নারী কর্মীরা প্রবেশ করছেন। তবে, তুলনামূলকভাবে সেটি আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কমেছে।

অবৈধ এসব নারী শ্রমিকদের দেশে ফেরাতে এর আগে লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সুবিধা থাকলেও বর্তমানে সে সুযোগ আর নেই। প্রায় এক বছর ধরে অবৈধ কর্মীদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়াটি বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, বৈরুত দূতাবাসের সহযোগিতায় লেবানন সরকারের সাধারণ ক্ষমার আওতায় অনেক নারী শ্রমিকই জরিমানা ছাড়াই দেশে ফিরতে পেরেছে। এসব অবৈধ নারী শ্রমিকরা যাতে আবার দেশে ফিরতে পারে, সেজন্য লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দেশটির সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার চালিয়ে যাচ্ছে।

দূতাবাসের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীর ভিসায় দেশটিতে রয়েছেন। যাদের অধিকাংশই বর্তমানে অবৈধ হয়ে পড়েছেন।