advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কত যে লুকানো দীর্ঘশ্বাস

হাসান আল জাভেদ
১২ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুন ২০১৯ ১৪:৪৬

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর পূর্বশর্ত হিসেবে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশ থেকে শিশুশ্রম নিরসন করা। বর্তমান সরকারও চাইছে জাতীয় শিশুশ্রম নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে শিশুশ্রম পুরোপুরি নিরসন করতে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকা, শিশুশ্রমিক নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া এবং জনসচেতনতার অভাবে কার্যত শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়াও রয়েছে শিশু সুরক্ষা আইনের অভাব। ফলে বাসাবাড়ি, কলকারখানা, কৃষিকাজ ইত্যাদি তো বটেই, ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোয়ও চলছে শিশুশ্রম।

এতে উন্নত মানবসম্পদ গড়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে; বিকশিত হতে পারছে না আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম; ঝরে যাচ্ছে তাদের স্বপ্ন। এমনই এক পরিস্থিতিতে আজ ১২ জুন বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য- শিশুশ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপের তথ্যানুযায়ী, দেশে শ্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৩২ লাখ শিশু। এর মধ্যে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশুই যুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। আইএলও-ইউনিসেফের যৌথ উদ্যেগে পরিচালিত গৃহস্থালিতে শিশুশ্রমবিষয়ক এক জাতীয় জরিপে বলা হয়, দেশে ৪ লাখেরও বেশি শিশু গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত, যাদের ৮০ শতাংশই কন্যাশিশু। প্রতিদিন গড়ে ১৫ ঘণ্টা করে কাজ করার পরও এসব শিশু বিভিন্ন রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতনে অনেক শিশুর মৃত্যুর পাশাপাশি যৌন নিপীড়নের ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

দেশের অর্থনীতির দ্রুত উন্নয়ন ঘটলেও শিশুশ্রম নিরসনে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর তালিকায় রয়ে গেছে বাংলাদেশ। শিশু সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা তুলনামূলকভাবে অনেক পরিশ্রমী হয়। স্বল্প মজুরিতে ওদের প্রতিদিন বড় একটা সময় কাজ করানো যায়। অন্যদিকে অভাবের তাড়নায় অনেক পরিবারই তাদের শিশুসন্তানকে শ্রমের পথে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুশ্রম নিরসন এবং শ্রমজীবী শিশুদের স্কুলে পাঠাতে হলে সঙ্গত কারণেই জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

শ্রমজীবী শিশুর পরিবারকে আর্থিক পুনর্বাসন ছাড়া তাদের ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা শাবনাজ জাহেরিন আমাদের সময়কে বলেন, শিশুশ্রম বন্ধে সরকার থেকে যে অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে যে মনিটরিং থাকা দরকার, সেটাও করা হয়নি। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে অনেকবার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কিছুটা মনিটরিং করা হলেও অনানুষ্ঠানিক বা গৃহস্থালির ক্ষেত্র আমলে নেওয়া হচ্ছে না।

এ কারণে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না। ২০১০ সালের শিশুশ্রম নিরসন নীতিতে বলা হয়েছে- স্কুল থেকে অকালে ঝরে পড়া, সস্তায় শিশুশ্রম, আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবারে জন্ম নিয়ন্ত্রণণের অভাব, নদীভাঙনসহ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতিই শিশুশ্রমের পেছনে দায়ী। দেশের মোট ৪২.৯ শতাংশ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাত হিসেবে পরিচিত পরিবহনে ১০ শতাংশ, শিল্প বা দোকান কর্মচারী ২০ শতাংশ, ওয়ার্কশপে ৯ শতাংশ শিশু নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবে অতিপরিচিত গৃহস্থালিতে নিয়োজিত রয়েছে ১৪.৭ শতাংশ শিশু। তবে গৃহস্থালির চেয়েও বেশি নিয়োজিত কৃষিকাজে যে পরিমাণ শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে, তাদের পরিসংখ্যান নেই সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশে কর্মস্থলে ৫৭ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

জাতীয় শিশু শ্রম জরিপ-২০১৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮টি খাতে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অতিঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যারা হোটেল-রেস্তোরাঁ, ট্যানারি, শিপব্রেকিং, পরিবহন, কৃষি, গৃহকর্ম, নির্মাণ, ইটভাঙা, লোহা কাটাসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে বেসরকারি সংস্থা ইসলামিক রিলিফ পরিচালিত এক জরিপের পর জানানো হয়, সেখানে অন্তত ৬০৪টি কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশু শ্রমিক ঝূঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। কর্মস্থলে কোনো শিশু দুর্ঘটনার শিকার হলে ক্ষতিপূরণ পায় বড়জোর ৩০-৫০ হাজার টাকা। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যস্থতায় এর মীমাংসা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী শিশু শ্রমিক পায় না আইনি সহায়তা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতে শিশু শ্রমিক নিয়োগ হ্রাস পেলেও অন্যান্য খাতে তা হয়নি। এ জন্য শিশুশ্রম নীতিমালার বদলে আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর নিশ্চিত করা দরকার। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উপপরিচালক (্অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড জাস্টিস ফর চিলড্রেন) সাবরিনা সুলতানা আমাদের সময়কে বলেন, ২০১০ করা জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতিমালা এ বছরই শেষ হবে। তাই এখনই উপযুক্ত সময় দ্রুত আইন প্রণয়ন। কারণ আইন না হওয়া পর্যন্ত নীতিমালার ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, শুধু আইন করে শিশুদের শ্রমের পথ থেকে ফেরানোই নয়, তাদের পরিবারকেও পুনর্বাসন করতে হবে। অন্যথা এসব দরিদ্র পরিবারের দশা অর্থের সংকটে আরও করুণ হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে এসব পরিবারকে পুনর্বাসনে বিপুল পরিমাণ অর্থ লাগবে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটে এ খাতে অনেক বেশি বরাদ্দ করতে হবে। এবারের জাতীয় বাজেট থেকেই তা করা যেতে পারে।