advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিশুর স্বপ্ন আবদ্ধ শ্রমে

১২ জুন ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১২ জুন ২০১৯ ০০:১২
‘কৃষ্ণ’ ১০ বছরের একজন অসাধারণ শান্ত বালক। তার সঙ্গে প্রথম যেদিন আমার দেখা হলো সেদিন সে কারখানা থেকে আধাবেলার ছুটি নিয়ে এসেছিল। কৃষ্ণ একটি বরফকলে কাজ করত। সকাল ৬টা থেকে রাত অবধি সে কাজ করত। আমি দেখেছিলাম ওর হাতের আঙুলগুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ওর একটি স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে পুুলিশ হবে। ‘জামাল’ প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে রাত ১০-১২টা পর্যন্ত কাজ করে। প্রতিদিন সে আয় করে ১০০-১৫০ টাকা। খাওয়ার আর বিশ্রামের তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সঙ্গে ওস্তাদ এবং অন্যদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এই পৃথিবীতে ওর কোথাও কেউ নেই। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় একটি কর্মশালায়, যেখানে আমি পেয়েছিলাম একজন বুদ্ধিদীপ্ত জামালকে। কিন্তু জামাল কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। সে কাজ করে গাড়ির হেলপার হিসেবে। ‘তানিয়া’ নামে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল, ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে। সে নাচতে ভালোবাসে এবং কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজে নিজে নাচ শিখেছে। আমি তার নাচ দেখে মুগ্ধ। খুলনার রূপসা এলাকায় চিংড়ি ডিপোতে সে তার অন্য মেয়েশিশু সহকর্মীদের সঙ্গে রাতে চিংড়ি মাছের মাথা কাটত। বাবা এবং ছোট বোনসহ তানিয়াই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার পরিবারে। সেই তার পরিবার চালায়। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে, যাদের বয়স ৬-১১ বছরের মধ্যে এবং তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিশু শ্রমিক নিরসন নীতিমালা-২০১০ অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে কোনো শিশু কাজ করতে পারবে না। এর বাইরে ৩২ লাখ শিশু বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে, যাদের অনেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ-ি শেষ করতে পারেনি। এই সংখ্যাটি কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে নেওয়া হয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত বিবেচনায় আনা হয়নি, যেমনÑ কৃষিকাজে নিয়োজিত শিশু শ্রমিক এই সংখ্যার মধ্যে নেই। এসব কর্মরত শিশু কখনো কখনো দৈনিক ১০-১৫ ঘণ্টা কাজ করে। কাজের বাইরে হরহামেশাই এই শিশুগুলো বিভিন্ন শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় যা আমরা প্রাই মিডিয়ায় দেখে থাকি। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের কথা নাই বা বলি। বাংলাদেশ সরকার গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে বিবেচনায় ধরে না। যদিও ২০১৫ সালে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু আইন না হওয়া পর্যন্ত নীতিমালাটির তেমন কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এই নীতিমালা অনুসারে ১২ বছরের নিচে কোনো শিশু গৃহকর্মে কাজ করতে পারবে না। পরে অবশ্য শ্রম আইন-২০১৮-তে (সংশোধিত) বয়স ১৪ করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া অত্যাবশ্যকীয় আর সেটি হচ্ছে শিশুর বয়স বিভিন্ন আইনে ভিন্ন ভিন্ন বয়স উল্লেখ করা হয়েছে। যেটি খুবই বিভ্রান্তিকর। যেহেতু শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার শিশুর বয়স ১৮ বছর অনুমোদন করেছে সেজন্য শিশু সম্পর্কিত সব আইনে শিশুর বয়স ১৮ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটি সময়ের দাবি। কৃষ্ণ, জামাল, তানিয়াদের মতো শিশুরা কেন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত হচ্ছে? আমি ১০-১২ বছর ধরে শিশুশ্রম নিরসন সম্পর্কিত বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত থাকার কল্যাণে দেখেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দরিদ্রতার কারণে নিজের সন্তানদের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত করেছেন। তারা মনে করেন শিশুকাল থেকে কোনো একটি হাতের কাজে দিয়ে দিলে বড় হতে হতে সেই শিশুটি ওই কাজে দক্ষ হয়ে উঠবে এবং তার ভবিষ্যতে আয়ের জন্য চিন্তা করতে হবে না। এ ছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছেÑ ১.স্কুলের পরিবেশ দারিদ্র্য এবং শিশুবান্ধব না হওয়া। ২. বাবা-মায়ের আদি পেশা পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। ৩. স্থানান্তরিত হওয়া। ৪. বাবা-মায়ের ঋণের বোঝা পরিশোধ করা। ৫. শিশু শ্রমিকদের চাহিদা থাকাÑ শিশুরা কম পারিশ্রমিকে অনেক সময় কাজ করতে পারে। উল্লেখিত কারণে শিশুদের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত দেখা যাচ্ছে। টেকসহ উন্নয়ন অভীষ্টের আট (৮.৭) নম্বর অভীষ্টতে পরিষ্কারভাবে একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে সব দেশ বা রাষ্ট্র সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, যাতে করে ২০২৫ সালের মধ্যে সব দেশ বা রাষ্ট্র সব ধরনের শিশুশ্রম নির্মূল করে ফেলতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যেটি হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে শিশু শ্রমিক নির্মূলের চেষ্টা করা অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম খাত থেকে শিশু শ্রমিক শূন্যে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাংলাদেশ সরকারকে এখনই কিছু বড় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার আর একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেটি হচ্ছে ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসন করা। বছরদুয়েক আগে এক গবেষণায় দেখেছিলাম, ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম শূন্যে নিয়ে আসতে হলে প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকারকে ৩৫৬ কোটি অর্থ বরাদ্দ এবং খরচ করতে হবে। কিন্তু গত দুবছরে জাতীয় বাজেটে শিশুশ্রম নিরসনে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ আমরা দেখিনি। অর্থ বরাদ্দ ছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন লক্ষ্য অর্জন সুদূরপরাহত হতে পারে। শিশুশ্রম নিরসনে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমনÑ গ্রামগুলোতে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা, এ ক্ষেত্রে একটি বাড়ি একটি ব্যবসা উদ্যোগটি নিয়ে সরকার ভাবতে পারে। স্থানীয় সরকারকে আরও শক্তিশালী ও সক্রিয়ভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা স্থানীয় পর্যায়ে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সুপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কলকারখানায় তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষত যেখানে শিশুরা কাজে নিয়োজিত রয়েছে। তদারকির সময় কোনো কারখানায় বা ব্যবসা খাতে শিশু শ্রমিক পাওয়া গেলে তাদের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা বাড়ির হোল্ডিং নম্বর প্রদানকালীন নিশ্চিত করতে পারে যে, সেখানে কোনো শিশুশ্রমিক কাজ করে না বা করবে না। প্রতিটি বাড়িতে একটি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া যেতে পারে এই মর্মে যে, ‘এখানে কোনো শিশুশ্রমিক নেই।’ একটি জাতীয় শিশু উপাত্তভা-ার (ডাটাবেজ) তৈরি করা। সেখান কোন খাতে কতসংখ্যক শিশু কাজ করছে তার সংখ্যা উল্লেখ থাকবে। এই উপাত্তভা-ার শিশুশ্রম নিরসনে পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আরও বেশি সুরক্ষা বেষ্টনী শক্তিশালী করা। উপকূলীয় বাঁধগুলো টেকসইভাবে তৈরি করা। শ্লেটার কাম স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি করা, যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর যেন শিশু বা তার অভিভাবকদের তাদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে অন্য স্থানে চলে না যেতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দারিদ্র্য ও শিশুবান্ধব করতে হবে। শিশু শ্রমিকরা অনেক বছর পর আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জগতে পর্দাপণ করে। তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া অনেক সময় খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। সেজন্য স্কুলের পরিবেশ তাদের জন্য সহজ হওয়া প্রয়োজন। কর্মরত শিশুদের কর্ম থেকে উঠিয়ে নিয়ে তার পরিবারের একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। স্থায়ী আয় নির্ধারিত না করা গেলে শিশুর আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এজন্য ওইসব শিশুর পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। পরিশেষে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসা বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার ব্যক্তিমালিকানা খাতকে সঙ্গে নিতে পারে। কারণ তাদের সরবরাহ খাতে হাজার হাজার শিশু শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। এর পাশাপাশি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিয়ে একটি সমন্বয় সেল গঠন করা খুবই জরুরি। য় সাবিরা নূপুর : উন্নয়নকর্মী