advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কর জাল বিস্তারের বাজেট

আবু আলী
১৩ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯ ১০:৫৪

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে জাতীয় সংসদে আজ প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে প্রচলিত ধারার বাইরে। বাজেটে অর্থমন্ত্রী দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন।

শুধু এক বছরের জন্য নয়, সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে, বিশেষ করে ২০৪১ সালকে লক্ষ্য করে বাজেট তৈরি করেছেন অর্থমন্ত্রী। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের বাজেট বক্তৃতা।

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রথম অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে আগামী বাজেট ১২ দশমিক ৬১ এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৮ দশমিক ২২ শতাংশ বড়।

এটি দেশের ৪৮তম, আওয়ামী লীগ সরকারের ২০তম ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রথম বাজেট।
বাজেটের সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর অর্থমন্ত্রী বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন। সেখানে তিনি ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরবেন। করের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে আয় করবেন। আবার মানুষের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করবেন।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার আয়-ব্যয় মেলানোর সময় রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান কবিতার কথাগুলো স্মরণ করতে পারেন- ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে/যাবে না ফিরে।’ কিন্তু কম আয় আর বেশি ব্যয়ের বাজেটে অনেককেই হয়তো খালি হাতে ফিরতে হবে। আর তাই ‘দিবে আর নিবে’র মধ্যে সমন্বয় করাটাই হবে নতুন অর্থবছরের বাজেটে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র জানিয়েছে, এবারের বাজেটে সরকারের গত ১০ বছরের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বাজেটে উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি সমন্বিত রূপরেখা দাঁড় করতে চায় সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সর্বশেষ বছর। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২০৩০, অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর-২০৪১, দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-৪১) এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রস্তুতিকে বিবেচনায় নিয়ে এবারের নীতিকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় একসঙ্গে সব উন্নয়ন এজেন্ডা এবং লক্ষ্য নির্দিষ্ট করার প্রয়াস থাকবে। সব উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে তুলে ধরা হবে বাজেট। অর্থাৎ কোন খাতে ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া দরকার, কোথায় বরাদ্দ কমিয়ে আনতে হবে-তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন এবং কাজের রোডম্যাপ স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেন লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, সেই প্রয়াসও রয়েছে।

জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর নজর সম্পদের পুনর্বণ্টন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির। এ লক্ষ্যপূরণে আগামী অর্থবছরে বাজেটের আয়তন বাড়ছে।

সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার থাকবে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার। আর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। নন-এনবিআর রাজস্ব ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। করবহির্ভূত রাজস্ব ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বাড়ছে করহার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ৫২ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বরাবরের মতো ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। তবে সমস্যা মূলত ঘাটতি অর্থায়নের উৎস নিয়ে। যেমন নতুন বাজেটে ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা।

বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এ ঘাটতি চলতি অর্থবছরের বাজেটে ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এ হিসেবে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে ২০ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকার। চলতি অর্থবছরে রয়েছে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়া হবে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আসন্ন বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ ছাড়া নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতির চাপ ৫ দশমিক ৫ শতাংশে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে নতুন করে ৮০ লাখ মানুষকে করের আওতায় আনার মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন। এ ছাড়া ভ্যাট আইন কার্যকরসহ বেশকিছু নতুন বিষয়ও থাকছে বাজেটে।

ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব আসছে ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্রসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে। ঘোষণা থাকতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির। এ ছাড়া বেকারদের জন্য ঋণ তহবিল, কৃষকের জন্য পরীক্ষামূলক বীমা প্রকল্প এবং প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধার ঘোষণাও তুলে ধরা হবে।

জানা গেছে, ভ্যাটের বিস্তার বাড়িয়ে নতুন আইন বাস্তবায়ন করা হবে। সেখানে ভ্যাটের (মূল্য সংযোজন কর) হার করা হচ্ছে ৫টি। স্পর্শকাতর ও অত্যাবশকীয় পণ্যে ন্যূনতম হার নির্ধারণ করে ভ্যাট আইন সংশোধনের কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ আইনে জনজীবনে প্রভাব ফেলে যেমন- ওষুধ, জ্বালানিপণ্য পেট্রোলিয়াম ও নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম উপকরণ রড, বিভিন্ন জাতের মসলা, কাগজসহ বেশকিছু পণ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় কম হারে ভ্যাট হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে দাম সহনীয় থাকে। এতে সর্বনিম্ন ২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশসহ মোট ভ্যাটের হার হচ্ছে পাঁচটি। তবে ভ্যাটের আদর্শ বা স্ট্যান্ডার্ড রেট ১৫ শতাংশই বহাল থাকবে।

বড় কোনো পরিবর্তন না করে বর্তমান ১৯৯১ সালের আইনের আদলেই নতুন আইনটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোন খাতে কত ভ্যাট বসবে, সেটিও চূড়ান্ত হয়েছে। দুই বছর স্থগিত থাকার পর আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার কথা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন আইনে ভ্যাটের জাল আরও বিস্তৃত হবে। বর্তমানে ১৯৯১ সালের আইনে নির্দিষ্ট খাতে (৩৯টি) প্রযোজ্য হারে ‘উৎসে’ ভ্যাট আদায় করা হয়। নতুন আইনে উৎসে ভ্যাট কর্তনের পরিধি ব্যাপক বাড়ানো হচ্ছে। এখন শুধু আমদানি পর্যায়ে বাণিজ্যিক পণ্যে (কমার্শিয়াল ইমপোর্টার) ‘অগ্রিম’ ভ্যাট (এটিভি) আদায় করা হয়। নতুন আইনে বাণিজ্যিকসহ সব পণ্যে অগ্রিম ভ্যাট দিতে হবে। ফলে ভ্যাটের আওতা ব্যাপক বাড়বে। সূত্র জানায়, নতুন আইনে ২, ৫, সাড়ে ৭, ১০ ও ১৫ শতাংশÑ এই পাঁচটি রেট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।

অন্যদিকে ফের কালো টাকা সাদা করার ঘোষণা আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর দিয়ে শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করে অপ্রদর্শিত অর্থ তথা কালো টাকা সাদা করা যাবে। তবে এ সুযোগ তারাই পাবেন, যারা শুধু উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে বিনিয়োগ করবেন।

আগামী এক বছরের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হবে। মূলত ব্যক্তি তথা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে কয়েক বছর ধরে খরা থাকলেও এবার সরকার আশা করছে, এ সুযোগ দেওয়া হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার কমবে এবং উদ্যোক্তারা স্থানীয় শিল্প স্থাপনে আরও উৎসাহিত হবেন।

জানা গেছে, সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে বয়স্ক ভাতার সম্প্রসারণ করেছেন তিনি। চলতি অর্থবছরে ৪০ লাখ সুবিধাভোগী ছিলেন এ খাতে। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৪৪ লাখে উন্নীত করার ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা করা হচ্ছে।

বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতাভোগীর সংখ্যা ১৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১৭ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। বরাদ্দ ৮৪০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০ কোটিতে উন্নীত করা হচ্ছে। অন্যদিকে আগামী বাজেটে বেকারদের জন্য প্রথমবারের মতো ‘উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করা হচ্ছে। এই তহবিল গঠনের উদ্দেশ্য হলো নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে আগামী বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ থাকছে।

এ ছাড়া তৈরি পোশাকপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেভাবে প্রণোদনা পেয়ে আসছে, আরও কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এদিকে পুঁজিবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ঋণ ব্যবস্থার প্রস্তাব থাকবে।