advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উন্নতির ভেতর কান্না

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
১৩ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯ ০০:১৬
advertisement

উন্নতি ঘটছে। উন্নতির মনোহর দৃশ্য ও মোহন বাদ্য যে দেখে না, শোনে না তার দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা খুবই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু ভেতরে কান্নাও আছে। আর ওই যে কৃষক তার পাকা ধানে আগুন দিচ্ছে ওই ধান কৃষকের নীরব অশ্রুতে সিক্ত। হাঁড়ির ওই একটি চালেই বাকি চালের দশাটা জানা যাচ্ছে।

তা তো বোঝা গেল, প্রশ্ন হলো এমনটাই কি চলবে, নাকি বদলাবে। একশ বছর আগের গফুর আর আজকের গফুর এক ব্যক্তি নয়। পৃথিবী বদলেছে, দেশ ভাগ হয়েছে, ভগ্নদেশ স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন হয়েছে মেহনতিদের লড়াইয়ের কারণেই। কিন্তু গত একশ বছরে মেহনতিদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি? হ্যাঁ, রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে, যোগাযোগ উন্নত, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, হাতে হাতে মোবাইল, টেলিভিশনে ভারতীয় সিরিয়াল, এসব আছে। পায়ে জুতো ছিল না, জুতো এসেছে। জামাকাপড়েও উন্নতির চিহ্ন। গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা বিদেশে গেছে; কেবল যে শ্রমিক হিসেবে গেছে তা নয়, গেছে পেশাজীবী হিসেবেও। কিন্তু তবু কৃষক তো তার পাকা ধানে আগুন দিচ্ছে। সোনার বাংলা তা হলে কোথায়? কার জন্য?

না, মেহনতিদের ভাগ্য বদলায়নি। কারণ যতই উন্নতি হয়েছে তত বেড়েছে বৈষম্য। আমাদের উন্নতির ইতিহাস আসলে বৈষম্য বৃদ্ধিরই ইতিহাস। উন্নতির কারণ হচ্ছে মেহনতিদের শ্রম, কিন্তু উন্নতির কঠোর বোঝা চেপে বসেছে ওই মেহনতিদের পিঠের ওপরই। ঘরে তাদের নিত্যদিনের অভাব, অনেকেরই ঘর বলতে কিছু নেই। মেহনতিদের মেয়েরা ধর্ষিত হয়, যেখানে সেখানে। দলবদ্ধ ধর্ষণ চলছে, যেটা আগে কখনো শোনা যায়নি। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না। মানুষ তো সংগ্রাম করেছে, যুগের পর যুগ ধরে। সেই সংগ্রামের ফলেই সব উন্নতি।

ঊনসত্তরে আমাদের এই বাংলাদেশে একটি জনঅভ্যুত্থান ঘটেছিল। কৃষক-শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছিল ওই অভ্যুত্থানের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও চালিকাশক্তি। তার আওয়াজটা ছিল ‘কৃষক-শ্রমিক অস্ত্র ধরো, পূর্ববঙ্গ স্বাধীন করো।’ আওয়াজ কিন্তু আরও একটা ছিল। অভ্যুত্থানের অনুঘটকগুলোর সর্বপ্রথমটি ছিল বামপন্থি ছাত্রনেতা আসাদের প্রাণদান, আর আসাদের আত্মদানের সেই ঘটনার ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজটা বেরিয়ে এসেছিল, ‘আসাদের মন্ত্র জনগণতন্ত্র’। জনগণতন্ত্র অর্থাৎ সমাজতন্ত্র। পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়েছে, কৃষক-শ্রমিকই স্বাধীন করেছে, কিন্তু সমাজতন্ত্র আসেনি। আর আসেনি বলেই মেহনতিদের ভাগ্য বদলায়নি। দেশ একবার স্বাধীন হয়েছিল সাতচল্লিশে, আরেকবার স্বাধীন হয়েছে একাত্তরে; রাষ্ট্র ছোট হয়েছে আয়তনে, কিন্তু তার ভেতরের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রের চালকদের মনোভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রটিকেই মেরামত করে চালানো হচ্ছে, কিন্তু যন্ত্র যেহেতু পুরনো এবং রাষ্ট্রচালকদের মুনাফালিপ্সা যেহেতু লেলিহান তাই ফল দাঁড়িয়েছে মেহনতিদের নির্মম বঞ্চনা, তাদের ওপর দুঃসহ নিপীড়ন। বঞ্চনা ও নিপীড়নের দরুন ক্ষোভের আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি; মাঝে মাঝে সেটা দপ করে দিয়ে দৃশ্যমানও হয়। আশঙ্কা ব্যাপক নৈরাজ্যের।

ঊনসত্তরে জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো আওয়াজটাও শোনা গিয়েছিল। আগুন জ্বলেও উঠেছিল। কেবল মশাল মিছিলের নয়, আগুন জ্বেলেছিল গণআদালতে এবং কলকারখানা ও তহশিল অফিস ঘেরাওয়ের মধ্যে। একাত্তরে ভিন্ন ধরনের এক আগুন জ্বালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। তাদের লাগানো আগুনের বিপরীতে ছিল জনগণের প্রতিরোধের আগুন। প্রতিরোধের বহ্নিশিখার তাড়া খেয়েই হানাদাররা পালিয়েছে। কিন্তু প্রতিরোধের সেই আগুন পুরনো ব্যবস্থাটাকে যে পুড়িয়ে ছাড়বে, তা ঘটেনি। সামাজিক বিপ্লব হয়নি। মানুষে মানুষে অর্থাৎ শ্রেণিতে শ্রেণিতে সম্পর্কটা সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। দেখতে দেখতে একশ বছর নয়, দু’শ বছরই পার হয়ে গেল। ইংরেজ শাসন পুরনো সামন্তবাদী সমাজ সম্পর্ককে যে নতুনভাবে শক্ত করে দিয়েছিল, কায়েম করেছিল ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’, সেটা এখন নেই, পুঁজিবাদ এ দেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের চরম শত্রু পুঁজিবাদকে বিদায় করা চাই, তার অন্তর্গত ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা চাই সামাজিক মালিকানাকে। সেটা সম্ভব হবে না সামাজিক বিপ্লব ছাড়া।

এ যে কেবল বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা তা নয়, চাহিদা সে সারাবিশ্বের পীড়িত মানুষের। সব দেশেই মানুষ এখন লড়াই করছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। এ এক নতুন আন্তর্জাতিকতা। এর শক্তি নিহিত রয়েছে মেহনতি মানুষের বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে সেই আগুনে। এই বিপ্লবী আন্তর্জাতিকতায় অংশ নেবে সমাজের সব সচেতন ও হৃদয়বান মানুষ। ধরিত্রী আজ বিপন্ন। নিপীড়নের মুখে পড়ে প্রকৃতিও বিরূপ হয়ে উঠেছে। সেও প্রতিবাদ করছে। পুঁজিবাদকে হটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা না ঘটলে মানুষ, প্রকৃতি এবং প্রাণিজগৎ সবারই বিপদ বাড়বে। সে বিপদ কোনো সামান্য বিপদ নয়।

সামাজিক বিপ্লবের প্রধান শত্রু পুঁজির মালিকরা, সঙ্গে আছে তাদের দালাল-ফড়িয়ারা, যাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরাও পড়ে, পড়ে সাংবাদিকরাও। কথিত বুদ্ধিজীবীদের তুলনায় সাংবাদিকদের শক্তি এখন অনেক বেশি। এক অর্থে এই যুগ মিডিয়ারই যুগ। মিডিয়া পারে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য করে দিতে; যেমন পারে সত্যকে জলজ্যান্ত করে তুলতেও। মিডিয়ার মালিকরা সবাই পুঁজিওয়ালা। কিন্তু সাংবাদিকরা আছেন, মালিক না হলেও তারা পারেন মিডিয়াকে প্রভাবিত করতে। সে জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং ঐক্যবদ্ধভাবে বিবেকের অনুশীলন করা। দলবদ্ধ তৎপরতায় নুসরত জাহানকে আগুনে পুড়িয়ে মারা এবং অসহায় কৃষকের পাকা ধানে নিজের হাতে আগুন দেওয়ার ঘটনা তো চাপা পড়েই থাকত, সাংবাদিকরা না থাকলে। মিডিয়ার কর্মীরাও মেহনতিই, তাদেরও আসতে হবে মেহনতিদের কাতারে, ব্যক্তিমালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজ বিপ্লবের আন্দোলনে।

ইতোমধ্যে সব সংবেদনশীল মানুষকে বুঝে নিতে হবে যে, পাকা ধানে আগুন দেওয়ার ঘটনার তাৎপর্যটি অত্যন্ত গভীর এবং নির্মম এক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার উন্মোচনকারী। বাস্তবতাটার একটি দিক হলো গরিব কৃষক এখন কৃষি-শ্রমিক হয়ে গেছে এবং কৃষিতে সামন্তবাদী শোষণের জায়গাতে পুঁজিবাদী শোষণ এসে গেছে। জমিদার বিদায় হয়েছে, এসেছে মিলমালিক ও ধনী কৃষক। সামাজিক বিপ্লবকে এখন সরাসরি এবং সর্বক্ষেত্রে দাঁড়াতে হবে পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে।

ব্রিটিশ আমলে সামাজিক বিপ্লবে অঙ্গীকারবদ্ধ বামপন্থিরা ভুল করেছেন কৃষকের কাছে না গিয়ে। কৃষকের কাছে বুর্জোয়া রাজনীতিকদের যাওয়ার কথা নয়, তারা যায়ওনি। যাওয়ার কথা ছিল বামপন্থিদেরই। তারা গেলে এ দেশের ইতিহাস ভিন্ন রকমের হতো। হয়তো দেশ ভাগ হতো না, দেশ ভাগ না হলে একাত্তরের যুদ্ধের আবশ্যকতা দেখা দিত না এবং দেশ এগোতো সমাজ বিপ্লবের পথে, যেভাবে চীন গেছিল এগিয়ে।

ধানের ক্ষেতে যে আগুন জ্বলছে সেটা সহজে নিভবে না, নেভানোর সাধ্য কোনো দমকলের নেই। এটি গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ নয় যে, পুলিশ ও গু-বাহিনী দিয়ে পিটিয়ে থামিয়ে দেওয়া যাবে এবং বলা হবে যে, সবটাই বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র। অথবা হুমকি দেওয়া হবে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার। আগুনটা কৃষকের বুকের ভেতর জ্বলছে। আর তার কারণ মজুরি না-পাওয়া নয়; কারণ পুঁজির শোষণে নিষ্পেষিত হওয়া। এতদিন জ্বলছিল ধিকিধিকি, এখন দৃশ্যমান হয়েছে এবং জানিয়ে দিচ্ছে এই খবর যে, আগুন নেভানোর স্থায়ী পথ একটাই, সেটা হলো গরিব কৃষকের বাঁচার ব্যবস্থা করা। সেটা করতে হলে সংস্কারে কুলাবে না, মৌলিক পরিবর্তন দরকার হবে। বস্তুত পুঁজিবাদী বাস্তবতার এমন বড় উন্মোচন আগে কখনো ঘটেনি। শোষণের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের মোকাবিলা করতে না পারলে উন্নতি তো বটেই, দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।

পরিবর্তনের কাজে নেতৃত্ব দেবে বামপন্থিরাই। তাদের কর্তব্য রাজধানীতে বসে বিবৃতি দেওয়া, মানববন্ধন করা ও টক শোতে অংশ নেওয়াতে আটকে থাকলে গফুররা বাঁচবে না, দেশও বাঁচবে না। মেহনতিদের কাছে যাওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে বামপন্থি শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, নারীসহ সব গণসংগঠনকে শক্তিশালী করা ও ছড়িয়ে দেওয়া চাই; এবং মূল সংগঠনের তো অবশ্যই, গণসংগঠনগুলোরও দেশের সর্বত্র, পাড়ায়-মহল্লায় কাজ করা। কাজ শুরু করার জন্য কার্যালয়ও দরকার হবে, যে কার্যালয় যেমন হবে সাংগঠনিক, তেমনি হবে সাংস্কৃতিক। খুবই দরকার মিডিয়াকে ব্যবহার করা এবং নিজেদের বিকল্প মিডিয়া গড়ে তোলা। কেন্দ্রীয়ভাবে তো অবশ্যই, স্থানীয়ভাবেও পত্রিকা চাই। সব কাজের কেন্দ্রে থাকবে মূল ও অভিন্ন লক্ষ্য; সেটি অন্যকিছু নয়, সামাজিক বিপ্লব ভিন্ন।

য় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement