advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সৌদি আরবে আরেক ক্ষুদিরাম

চিররঞ্জন সরকার
১৩ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯ ০০:১৬
advertisement

ক্ষুদিরাম বসুর কথা আমরা জানি। আর দশজন ডানপিটে, বাউ-ুলে ছেলের মতোই যখন বেড়ে উঠছিলেন, তখনই তার মনে লেগেছিল দেশপ্রেম আর বিপ্লবের ছোঁয়া। অল্প বয়সেই বিপ্লবী মতাদর্শে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড তখন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের নানা শাস্তি দিয়ে কুখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। সেই কিংসফোর্ডকে হত্যার মিশন নিয়ে ক্ষুদিরাম বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। তবুও ওই হামলা ভুল নিশানায় আঘাত হেনেছিল, তবুও বিচারে ক্ষুদিরামের ফাঁসির দ- ঘোষণা করা হয়। ১৯০৮ সালে ফাঁসি কার্যকরের সময় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর বয়স ছিল ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন। ওইদিন ১১ আগস্ট গোটা ভারতবর্ষের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। দুঃখ-শোকে চুলা জ্বালানো বন্ধ ছিল বাড়িতে বাড়িতে।

ওই ঘটনার ১১১ বছর পর সৌদি আরবে শিরñেদ হতে চলেছে কিশোর মুর্তাজা কুরেইরিসের। মাত্র ১০ বছর বয়সে করা অপরাধের জন্য এই শাস্তির ব্যবস্থা! এ ঘটনায় সারাবিশ্ব উত্তাল হলেও আশ্চর্যজনকভাবেই শান্ত সৌদি রাজতন্ত্র। ওই রাজতন্ত্র উপড়ে ফেলার ডাক দিয়েছিল আরব কাঁপিয়ে দেওয়া বসন্ত বিপ্লবের অন্যতম মুখ মুর্তাজা কুরেইরিস নামে এই শিশু। তাকে আমরা হয়তো কেউ চিনি না। শিরñেদের আগে তাকে বাঁচাতে সোচ্চার হয়েছে বিশ্ব।

আরবের দুর্নীতিপ্রবণ ও জনবিরোধী শাসকদের বিরুদ্ধে যখন বসন্তের ঢেউ খেলে গিয়েছিল, তখন সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল শিশু মুর্তাজা কুরেইরিস। বন্ধুদের সঙ্গে করে নিরস্ত্র অবস্থায় সাইকেল নিয়ে অহিংস প্রতিবাদে নেমেছিল সে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সুদীর্ঘ নিপীড়ন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তার মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। সবশেষে সরকার বিরোধিতার শাস্তি হিসেবে ওই শিশুর মৃত্যুদ-ের সাজা ঘোষিত হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করার ‘অপরাধ’-এ কোনো শিশুকে এমন দ- প্রদান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে তুলেছে।

২০১০ সালের আরব বসন্তের কথা আমরা সবাই জানি। রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের অবসান চেয়ে রাস্তায় নেমেছিল আরব বিশ্বের লাখো শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ। গণজাগরণের জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল একের পর এক আরব দেশ। নিপীড়ন, বঞ্চনা, বেকারত্ব, দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র আনতে আরব দুনিয়ার সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আরব বসন্তের মশাল জ্বালিয়েছিলেন তিউনিসিয়ার ফেরিওয়ালা বাওয়াজিজি।

বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে আরব ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়া, ইরান, জর্ডান, আলজেরিয়া, মরক্কো, ইরাক, কুয়েত, মৌরিতানিয়া, ওমান, সোমালিয়া, সুদান, এমনকি সৌদি আরবও। আরব বসন্তের ঝড়ে সিংহাসনচ্যুত হন তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদিন বেন আলি, মিসরের হোসনি মোবারক, ইয়েমেনের আলি আবদুল্লাহ সালেহ, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিসহ বিভিন্ন দেশের একনায়ক।

এই গণআন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে সৌদি আরবেও। সৌদি রাজতন্ত্রের অবসান চেয়ে রাস্তায় নামে সৌদির সাধারণ মানুষ। তৎকালীন সৌদি আরবের রাজা ফাহাদ নির্মম দমন পীড়ন চালান তারই দেশের নাগরিকদের ওপর। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলি কুরেইরিস নামে এক ১৭ বছরের কিশোর। ওই বয়সেই নেতৃত্ব দেয় জনগণকে। রাতের অন্ধকারে পোস্টার মারে সৌদি আরবের প্রশাসনিক ভবনগুলোয়। ঘরে বসে পোস্টার লিখতে সাহায্য করে তার ১০ বছর বয়সী ভাই মুর্তাজা।

একদিন মুর্তাজার বড় ভাই আলিকে বিক্ষোভরত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে সৌদি পুলিশ। আলির লাশ দাফন শেষ হতেই ক্ষোভ ও প্রতিবাদে নেমে পড়েছিল ১০ বছরের বালক মুর্তাজা। ৩০ বালকের একটি সাইকেল বাহিনী নিয়ে অংশ নেয় বিক্ষোভে। মুর্তাজার তোলা ‘রাজতন্ত্র নিপাত যাক’ সেøাগানে মুখরিত হয়েছিল এলাকা।

সেদিন থেকেই সৌদি প্রশাসনের দুই চোখের বিষ হয়ে উঠেছিল বালক মুর্তাজা। ওইটুকু বয়সেই সে সঙ্গীদের বোঝাতÑ যতদিন রাজতন্ত্র থাকবে, ততদিন সৌদি আরবের জনসাধারণের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই। তার কথায় অনুপ্রাণিত হতে থাকে সমবয়সীরা। তাদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হতে থাকেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

এই আন্দোলনের ফলে সরকারের রোষানলে পড়ে মুর্তাজা। ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার তিন বছর পর পরিবারের সঙ্গে দেশ ছাড়ার সময় বাহরাইন সীমান্তে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে আটক করা হয় মুর্তাজা কুরেইরিসকে। কোনো লিখিত অভিযোগ ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কোনো আইনি সাহায্যের সুযোগ না দিয়ে তাকে নির্জন কারাবাসে পাঠানো হয়।

কেবল তেলের জোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলেছে সৌদি আরব। বর্তমানে এটি একটি বর্বর, অসভ্য, অমানবিক রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিংহাসন ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, শিয়া-সুন্নিবৈষম্য নিয়ে তেলসম্পদের জোরে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরবের মানবাধিকার পরিস্থিতি যে শোচনীয়, তা কারোরই অজানা নয়। এখানে কোনো লিখিত সংবিধান নেই। আর এর সুযোগে আইনকে যেমন ইচ্ছা ব্যবহারের মাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় গণহারে। মানবতা, নীতি-নৈতিকতাহীন সৌদি অপশাসনের সর্বশেষ উদাহরণ এই শিশুর মৃত্যুদ-ের আদেশ।

মুর্তাজা ছাড়াও ১৮ বছর বয়সের আরও তিন কিশোরকে ২০১২ সালে আটক করা হয়। তাদেরও মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হয়েছে। সাবালকত্বের আগেই সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে তিন কিশোর আলি আল-নিমর, আবদুল্লাহ আল-জহের ও দাউদ আল-মারহুনেরও মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, সৌদি আরব ২০১৮ সালে ১৩৯ ব্যক্তিকে মৃত্যুদ- দিয়েছে। এটা যুক্তিযুক্ত যে, মুর্তাজার মামলাটি শিয়া সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিক মতবিরোধীদের দমন করা সরকারের অভিযানের অংশ। ২০১৫ সালে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলে এই অভিযান শুরু হয়। গত এপ্রিলেও এখানে আবদুল করিম আল-হাওয়াসহ শিয়া দুই ব্যক্তির মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে আবদুল গ্রেফতার হয়েছিল। সৌদিতে একদিনে ৩৭ জনের মৃত্যুদ- কার্যকর করার মধ্যে আবদুলও ছিল একজন। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ব্যক্তির অধিকাংশই শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন।

সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যতবারই গণতন্ত্রকামীদের বিক্ষোভ হয়েছে, ততবারই তাদের ওপর নির্মম কায়দায় বল প্রয়োগ করা হয়েছে। আরব বসন্তের সময়কার ওই বিক্ষোভও ‘সর্বাত্মক অভিযান’-এ দমন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, রাজতন্ত্রের নামে এই দমন-পীড়ন আর কতদিন চলবে?

এর আগে সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনার জন্য খুন করা হয়েছিল সৌদি নাগরিক ও আমেরিকার ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে। ওই হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নিয়েছে সৌদি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। স্বয়ং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই এ বীভৎস ঘটনাটি ঘটেছে বলে বিশ্বের নামকরা সব গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার পরও সৌদি শাসকরা পার পেয়ে গেছেন। লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বটে কিন্তু সৌদি শাসকরা ঠিকই রেহাই পেয়ে যান। অথচ ক্ষমতাসীন সৌদি যুবরাজ সালসান এক সময় অনেক আশা জাগিয়েছিলেন। তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে চমক লাগিয়েছিলেন। সৌদির মতো কট্টরপন্থি দেশে সিনেমার পর্দা উঠেছে। নারীরা আজ গাড়ি চালাচ্ছেন। এসব সংস্কারমূলক কাজ করে বেশ তাক লাগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একে একে তার মুখোশ খসে পড়ে। ইয়েমেনে আগ্রাসন, সমালোচনাকারীদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে মদদ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি আসলে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর জাত ভাই।

সৌদি শাসকদের কাছে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার কোনো দাম নেই। তারা কারো কোনো অনুরোধ-মিনতিরও ধার ধারেন না। তবু চেষ্টা চলছে সর্বস্তরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মা-বোন ও ভাইয়েরা চোখের জল ফেলছেন নতুন এই ‘ক্ষুদিরাম’কে বাঁচাতেÑ যে মাত্র ১০ বছর বয়সে হাতে তুলে নিতে চেয়েছিল গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা। এ বালককে বাঁচানো গোটা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের পরম কর্তব্য। সে চলে গেলে বড় বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে বিশ্বের! মুক্তিকামী প্রতিবাদী মানুষের!

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

advertisement