advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাবাকে নিয়ে কয়েক ছত্র

পিয়াস মজিদ
১৩ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০১৯ ০০:১৬
advertisement

‘বাবা আমাকে /পাতাল থেকে তুলে / পৃথিবী দেখিয়েছিল, / সেই বাবাকে আজ / পাতালে রেখে এসে /ব্যাকরণ-অজ্ঞ আমি বুঝি / সকল অমল / ধবল হয় / কবরের কালো পরিভাষায়।/ পৃথিবীতে তারাদের তহবিল/ খালি হয়ে এলে / সন্তানের বুকের ভেতর/ প্রয়াত পিতার সমাধি জ্বলে।/থেকে থেকে / এই পাষাণপ্রহর / জানায় আমাকে,/ মৃত্যু মূলত মিউজিক / প্রতিটি কফিনে / কিছু সুর লেগে থাকে।’ (মৃত্যু মূলত মিউজিক)

বাবাকে নিয়ে লেখা আমার অকিঞ্চিৎকর এই কবিতা এত বিপুল সমাদর লাভ করবে তা ভাবিনি কখনো। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বাইরে কবিতা লিখতে গিয়ে কত লুকোচুরি খেলেছি বাবার সঙ্গে কিন্তু মা বা অন্যদের মতো বাবা কি অতটা কড়া ছিলেন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার জন্য? তার বুকে কোথাও কি একটু গর্ব ছিল না আমার কবিতা লেখার জন্য? ছিল নিশ্চয়, না হয় কেন কুমিল্লা থেকে মাঝে মাঝে ফোন করে শুক্রবার হলে জিজ্ঞেস করতেন আজ কোথাও আমার লেখা বেরিয়েছি কিনা।

বাবা, আমার সেই বাবা। বৈরী পৃথিবীর বিরুদ্ধ বাতাসে পর্যুদস্ত বাবা বাজারের জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে ঊর্ধ্বমূল্য দেখলে কোনো দামদর না করে উল্টো নিজ থেকেই বলতেন এই ঊর্ধ্বমূল্যটা না দিলে মূল কৃষকের ক্ষতি হয়ে যাবে। বাবা মানে এমন ন্যায্যতার ধারণা। আমার বাবা পরিবারের মানুষের চেয়ে বাইরের মানুষকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। পরিবারের মানুষ তো আছেই আপন হয়ে কিন্তু বহির্পৃথিবীর মানুষের সুখ-দুঃখে শামিল হওয়াকে তিনি সবচেয়ে বড় কর্তব্য ভাবতেন। বাবার কাছে আমার বিরাট শিক্ষাÑ নিজেকে ঘর থেকে পৃথিবীর দিকে ক্রমেই বিস্তৃত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে অনেক বন্ধু মিলে পরিকল্পনা করেছি একা একা জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে থেকে ঈদ করার কিন্তু ঈদের কয়েকদিন আগে যখন আব্বু বাসা থেকে ফোন করে বলত, ‘পিয়াস, কবে আসবা?’ তখন সব পরিকল্পনা উড়ে গিয়ে গন্তব্য নির্ধারণ হতো সোজা ঢাকার সায়েদাবাদ টু কুমিল্লার শাসনগাছা। ঈদের আনন্দ ফিকে হতে শুরু করল যখন আমাদের একমাত্র বোনটি প্রবাসী হলো। তবু ঈদের সকালে আবারও আনন্দ ফিরে আসত আব্বুর ডাকে ‘আর কত ঘুমাবা, ঈদের নামাজের সময় তো পার হয়ে গেল।’ এখন থেকে ঈদে সবই হয় কিন্তু হুট করে আব্বু চলে গেল বলে এই ডাক আর কখনো শোনা যাবে না। ঈদের সকালের এই পারিবারিক আনন্দটুকু জীবন থেকে এভাবেই বিনা নোটিশে চলে যাবে তা কোনোদিন কল্পনায়ও আনিনি।

২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পারিবারিক আবাস ছেড়েছি। ঢাকা থেকে ছুটিতে কুমিল্লা যাওয়ার পথে বিভিন্ন পয়েন্টে বাস পৌঁছতে না পৌঁছতেই বাবা যখন ফোনে জানতে চাইতেনÑ কতদূর এলে, এখন কোথায়?Ñ তখন যেন উত্তর দিতে দিতেও বিরক্তি ধরে যেত কিন্তু যখন শহরে পৌঁছে তাকে ফোন করে জানাতাম ‘এসে গেছি’ তখন তার কণ্ঠে কোনো বিশেষ কৌতূহল দেখতাম না। কারণ হয়তো নিরাপদে ঘরে এসেছিÑ এটা নিঃশব্দ স্বস্তি দিয়েছে তাকে। পৌঁছানোর আগে শুধু ওই উদ্বেগ আর অপেক্ষাটার নাম বাবা। প্রত্যেক সন্তানের জন্য পৃথিবীতে বাবা নামের এমন পবিত্র অপেক্ষা আর উদ্বেগ বসে থাকে কোথাও না কোথাও।

নিজের কথা রেখে সাহিত্যে চোখ রাখি। দেখি মাকে নিয়ে যত গল্প, কবিতা কিংবা বই; বাবাকে নিয়ে সে তুলনায় খুবই কম বইপত্র রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ইভান তুর্গেনেভের পিতাপুত্র, চাণক্য সেনের পিতা পুত্রকে, পুত্র পিতাকে, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার পিতা রবীন্দ্রনাথ, শওকত আলীর বাবা আপনি যান, হুমায়ুন আজাদের আব্বুকে মনে পড়ে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আমার পিতার মুখ, শেখ হাসিনার শেখ মুজিব আমার পিতা; এমন কিছু অনন্য বই। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন কবি-লেখকের পুত্রকন্যা লিখেছেন কয়েকটি মূল্যবান পিতৃস্মৃতিময় পুস্তক; যেমনÑ দ্বিতীয়-সৈয়দ হক মেঘ ও বাবার কিছু কথা, মৌলি আজাদ হুমায়ুন আজাদ আমার পিতা, জিনান সৈয়দ আমার আব্বু আবদুল মান্নান সৈয়দ। এসব বইপত্র পড়লে দেখতে পাব রবীন্দ্রনাথ থেকে বঙ্গবন্ধুÑ সবাই যেন সন্তানের চোখে নতুনভাবে ধরা দিচ্ছেন। তাই বিশিষ্টজনের প্রথাগত জীবনীর চেয়ে সন্তানের লেখা পিতৃস্মৃতি বা মূল্যায়ন বড় মূল্যবান।

বাবা কতদিন কতদিন দেখি না তোমায়। কিন্তু কোনো বাবা কি থাকতে পারেন সন্তানের দৃষ্টির আড়ালে? সমূহ অন্ধকারে বাবাই তো আমাদের দৃষ্টিপ্রদীপ। বলা হয় বাবার সঙ্গে কন্যার সম্পর্কটি ঐন্দ্রজালিক, যেমন মায়ের সঙ্গে পুত্রের। আমি তো মনে করি বাবার সঙ্গেও পুত্রের সম্পর্কের রসায়নটি অনন্য। আমরা যতই বড় হই বাবার তুলনায় নিজের ক্ষুদ্রতা যেন টের পেতে পারি। যে বাবা সন্তানকে প্রতিপালন করে একটি পর্যায়ে উপনীত করেন, সেই বাবা যখন অসুস্থ হয়ে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হনÑ তখন সেটা মেনে নেওয়া দুঃসাধ্য। অসুস্থ শরীরেও বাবারা তখন চিন্তা করেন তার জন্য সন্তানের কষ্ট হচ্ছে না তো! আমি যতবার হাসপাতালে ঢুকেছি, অসুস্থ বাবার শয্যাপাশে, তখন নির্বাক বাবা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে যেন জিজ্ঞেস করতে চাইতেনÑ তুমি খেয়েছ তো, ঠিক আছো তো, আমার জন্য কষ্ট হচ্ছে না তো? শুধু আমার বাবা নয়, পৃথিবীর সব জাতিগোত্রের বাবাই এমন।

মনে পড়ে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় একবার এক কবিতায় লিখেছিলেন এমনটিÑ ‘জর্জ বুশ কিংবা ওসামা বিন লাদেন বেঁচে থাকতে আমার এত ক্ষতি করতে পারেনি, বাবা তুমি মরে গিয়ে আমার যত ক্ষতি করে গেলে!’

আমি মনে করি, বাবাকে নিয়ে আমাদের ভেতরটার উপলব্ধি যদি এমন হয়ে থাকে তবে বাবা এবং মায়ের জন্য পৃথিবীর সব নিষ্ঠুর বৃদ্ধাশ্রম বন্ধ হোক, প্রতিদিনই হোক বাবা এবং মা দিবস। বাবা-মায়ের চোখের আভায় উজ্জ্বল থাকুক পৃথিবীর প্রতিটি মানবসন্তানের মুখ।

য় পিয়াস মজিদ : কবি ও প্রাবন্ধিক

advertisement