advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ

আবু আলী
১৬ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯ ০৯:৩১
advertisement

দেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। এর জন্য পুঁজি সংগ্রহের দুটি খাতের (ব্যাংক ও পুঁজিবাজার) বিশৃঙ্খলাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিনিয়োগের এ স্থবিরতা কাটানোর চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অর্থনৈতিক অগ্রগতির এ পর্যায়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে নজর দিয়েছেন। পাশাপাশি আগামী ৩ বছরের মধ্যে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্ইু অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছেন বাজেট বক্তৃতায়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। ওই বৃত্ত ভাঙার স্বপ্ন দেখছেন অর্থমন্ত্রী।

একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে ৩১ শতাংশের ঘরে বন্দি রয়েছে। সেখান থেকেও উন্নীত করার কথা শুনিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে বিনিয়োগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে এ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সরকারি বিনিয়োগ চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। কাক্সিক্ষত পর্যায়ে বিনিয়োগ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কর রেয়াত ও প্রণোদনার পাশাপাশি বিশেষ সুবিধার কথাও বলা হয়েছে।

বিনিয়োগ বাড়াতে কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। এ পাঁচ বছরের মধ্যে শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ করলে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন হারে করছাড় দেওয়া হবে। তবে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি ছাড়া অন্যত্র বিনিয়োগ করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত করছাড় পাবেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়াতে বাড়তি করছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আয়কর অধ্যাদেশে।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। অবশ্য বিনিয়োগের আগেই রিটার্ন দাখিল করে কর পরিশোধ করতে হবে। শুধু বিনিয়োগ করলেই কর অবকাশ সুবিধা পাওয়া যাবে না। এ সুবিধা পেতে হলে সরকার নির্ধারিত শিল্প-কারখানায় বিনিয়োগ করতে হবে।

এর মধ্যে রয়েছে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রেডিয়েন্ট ও রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমেটিক ইটভাটা, অটোমোবাইল, রেজিস্টার, বাইসাইকেল, বয়লার, কম্প্রেসার, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, ফার্নিচার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কীটনাশক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, এলইডি টিভি, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, মোবাইল ফোন, পেট্রো-কেমিক্যালস, ওষুধ, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, টেক্সটাইল মেশিনারি, খেলা ও টায়ার শিল্প। এসব খাতে বিনিয়োগ করলে মিলবে কর অবকাশ সুবিধা।

আগামী ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে অবকাঠামো স্থাপনেও ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এ ক্ষেত্রে প্রথম দুই বছর আয়ের ৯০, তৃতীয় বছর ৮০, চতুর্থ বছর ৭০, পঞ্চম বছর ৬০, ষষ্ঠ বছর ৫০, সপ্তম বছর ৪০, অষ্টম বছরে ৩০, নবম বছরে ২০ এবং দশম বছরে ১০ শতাংশ কর অবকাশ সুবিধা পাওয়া যাবে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এবং দেশি শিল্প সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে তিন কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়া আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কালো টাকাকে সাদা করে মূল ধারায় আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে দেশ থেকে টাকা পাচার না হয়ে বিনিয়োগ হয়। অন্যদিকে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলার কার্যক্রম চলমান। যেখানে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে পিপিপি প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। ব্যবসা সহজীকরণে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ইতোমধ্যে কোম্পানির বিভিন্ন রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো হয়েছে। আর ৫০ হাজার টাকার কম মূলধনি কোম্পানির ক্ষেত্রে করশূন্য করা হয়েছে। বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আদলে ৬৪ জেলায় বিনিয়োগ সেবা তদারকি করা হবে। জেলা পর্যায়েও ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হবে। দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করার লক্ষ্যে ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া পুঁজিবাজারে করমুক্ত লভ্যাংশের সীমা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে। ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অন্য অবকাঠামো উন্নয়নে বাজেটের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকে গতিশীল করবে। এসব অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আরও ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে। মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে যুগোপযোগী বাজেট।