advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উন্নয়নের সঙ্গে চাই সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবসম্পদ

আবুল মোমেন
১৬ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯ ০৯:৩৩
advertisement

বাজেটের আকার বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নতুন অর্থমন্ত্রীও বজায় রেখেছেন। বর্তমান সরকারের শুরুতে ২০০৯-১০ অর্থবছরে সাবেক অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত লক্ষ-কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। দশ বছর পরে তার শেষ অর্থাৎ ২০১৮-১৯ সালের বাজেটের আকার পৌঁছেছিল ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকায়।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যে আ হ ম মুস্তফা কামাল উপস্থাপন করেছেন ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকার বাজেট। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি- দেশের প্রথম বাজেট, যেটি উপস্থাপন করেছিলেন মুক্তযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ, সেটির আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। আবার আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সর্বশেষ অর্থাৎ ২০০৮-০৯ অর্থবছরের যে বাজেট এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম উপস্থাপন করেছিলেন তার পরিমাণ ছিল ৯৯,৯৬২ কোটি টাকা। লক্ষ-কোটি টাকা ছাড়িয়ে প্রথম বাজেট দিয়েছেন এএমএ মুহিত।

এ যাত্রায় ২০০৯-১০ সালে তার প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। দশ বছর পরে তা ৫ লাখের সীমা ছাড়িয়ে সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এবারও বাজেটে আগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে উন্নয়নমুখী মেগা প্রকল্পের ওপর জোর রয়েছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য আয়কর ও ভ্যাটের জাল বিস্তারের প্রয়াস রয়েছে, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্যে নানা রকম সুবিধা দেওয়া হয়েছে, কৃষক ও অভিবাসী শ্রমজীবীদের জন্য প্রণোদনা থাকছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রদত্ত সহায়তা প্রকল্পগুলোর আওতা ও মাথাপিছু বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশের কিছু বেশি, যা ইউনিসেফ নির্ধারিত হারের অর্ধেক হলেও বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশি। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও এখনো তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

উন্নয়ন বাজেটের আকারও বেড়ে ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই আশাব্যঞ্জক চিত্রের পাশাপাশি উদ্বেগের জায়গাও কম নেই। প্রথমত দেখা যাচ্ছে প্রতি অর্থবছরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর চাপানো কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ বছরও বিপুল ঘাটতি রয়েছে এবং বাস্তবতা হচ্ছে আগামী বছর এ ঘাটতি আরও বাড়বে। ঘোষিত বাজেটেই প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতির উল্লেখ আছে। এ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বিদেশি ঋণ ও অভ্যন্তরীণ উৎস অর্থাৎ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এমনিতেই ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, ফলে সরকার যদি বাড়তি ঋণের জন্য হাত পাতে ব্যাংকে, তা হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে। অথচ সরকারের ঘোষিত নীতি হচ্ছে-বিদেশি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। সবাই জানি, বিনিয়োগ আশানুরূপভাবে না ঘটায় দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। চলতি বাজেটে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর অসুস্থতার কারণে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী অবশ্য কর্মসংস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর অর্থ ঢালাওভাবে চাকরি দেওয়া নয়, কর্মসংস্থান ব্যবসা বা কৃষির মতো খাতেও হতে পারে।

তবু আগামী ১০ বছরের মধ্যে তিন কোটি তরুণের জন্য চাকরি বা মূলধন সরবরাহ করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভাবনার চেয়ে দুর্ভাবনারই কারণ হচ্ছে। অনেকগুলো বিষয়েই সরকারের সদিচ্ছা ব্যক্ত হলেও সেগুলো কীভাবে অর্জিত হবে, তার কোনো পথরেখা দেওয়া হয়নি। সর্বস্তরে শিক্ষার মানোন্নয়ন, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা, সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত বর্জ্য বস্থাপনা, দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নবীন বিনিয়োগকারীর জন্য বিশেষ ছাড় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও পরিকল্পনার দাবি রাখে।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা কীভাবে আনা হবে, তার সদুত্তর কেবল এ সংক্রান্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাবের মধ্যে পাওয়া যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি আরেকটু সবল ও স্বাধীন ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে? এটা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন ভূমিকা ছাড়া আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা ও খাতের দুর্নীতি থামানো কঠিন হবে।

তা ছাড়া মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্তের যে বিরাট অংশটি বেসরকারি খাতে কর্মরত, তারা বাড়তি করের বোঝা কীভাবে সামলাবে তারও কোনো সদুত্তর বাজেটে নেই। কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ করছি, আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, দেশ থেকে অবৈধ পথে বিপুল অর্থ পাচার হচ্ছে, মেগা প্রকল্পগুলোর ঠিকাদারি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট লুটপাট হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া সামগ্রিকভাবে আর্থিক দুর্নীতিও বেড়ে চলেছে। বাজেটে এসব অনাচার বন্ধে কিছু দিক নির্দেশনা থাকবে বলে আশা করেছিলেন অনেকেই।

তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। মনে হয় বর্তমানকালের রীতি অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী মানুষরা এ বাজেট নিয়ে স্বপ্ন বুনতে পারেন, যারা সংসারের ছা-পোষা মানুষ তাদের কিন্তু যথারীতি উদ্বেগ আশঙ্কা নিয়েই জীবননির্বাহ করতে হবে। আর যারা কেবল রাস্তাঘাট, সেতু-ফ্লাইওভার, দালানকোঠার উন্নয়ন নয় মানবসম্পদের উন্নয়ন ও সুস্থ যুক্তিশীল সমাজজীবনের প্রত্যাশা করেন, তাদের বোধহয় ধৈর্য ধরে আরও কিছুকাল সুদিনের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে বাজেট তো আর ধন্বন্তরী দাওয়াই নয়, সরকারও জাদুদণ্ড নিয়ে বসে নেই। বদলের ও উন্নয়নের কাজ মানুষকেই করতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, উদ্যোগী পুরুষ সিংহ (সঙ্গে পড়ুন নারী সিংহীও) কেবল লক্ষ্মীকে পায় না সরস্বতীকেও পায়। অতএব উদ্যোগী বাঙালিকে বুক চিতিয়ে উদ্যোক্তার ভূমিকাই নিতে হবে। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং সরকারকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ও জবাবদিহিতায় বাধ্য করার জন্য এ উদ্যোগ তাঁদের নিতে হবে।

সংসদ অবশেষে সাতজন প্রকৃত বিরোধী সদস্য পেলেও বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা এটি সংশোধন-পরিমার্জনে বাধ্য করতে পারবে বলে মনে হয় না। সংসদকে পাশ কাটিয়ে বাজেট প্রণয়ন এবং সাক্ষীগোপাল বানিয়ে তা পাস করার সংস্কৃতির অবসান হলেই মঙ্গল হয়।

advertisement