advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কেমন হলো বাজেট

১৬ জুন ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯ ০৯:৩০
advertisement

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট? প্রতিটি খাতের উদ্যোক্তাদের মনেই প্রশ্ন, প্রস্তাবিত এ বাজেট তাদের ব্যবসা সহায়ক হবে তো? নাকি খড়্গ হয়ে দেখা দেবে? দেশের বিভিন্ন খাত-সংশ্লিষ্টরা এ সম্পর্কে তুলে ধরেছেন তাদের মতামত- সুযোগ পেয়েছে সব খাত বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি ও বিজেএমইএর প্রাক্তন সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী এমপি বলেছেন, সরকারের গত দশ বছরের উন্নয়নের ধারাবাকিতা রক্ষায় বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রস্তাবিত বাজেট বৈষম্যহীন, জনকল্যাণ ও ব্যবসায়ীবান্ধব। এখানে সব খাতকেই কম-বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আগে ব্যবসায়ীদের এক্সিট পলিসি ছিল না। এবার প্রথমবারের মতো এক্সিট পলিসি দেওয়া হয়েছে, যা যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

তিনি বলেন, বাজেটে তৈরি পোশাক খাতের সব পণ্য রপ্তানিতে ১ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এটি রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে পোশাক খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে এই প্রণোদনা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার শেয়ারবাজারের প্রতি যতœবান এ জন্য সেখানে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সালাম মুর্শেদী।

তিনি বলেন, এই প্রণোদনা বাজারকে আরও গতিশীল করবে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে অপ্রদর্শিত টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যা দেশ থেকে টাকা পাচারের পথ বন্ধ করবে এবং বিনিয়োগও বাড়বে। যা দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ১০০ কোটি টাকার ফান্ড দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

সালাম মুর্শেদী ক্যাশ ইনসেনটিভ বাড়ানো প্রয়োজন ড. রুবানা হক প্রস্তাবিত বাজেটে ক্যাশ ইনসেনটিভের পরিমাণ খুবই কম। উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার জন্য ক্যাশ ইনসেনটিভ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বর্তমানে পোশাক খাত বড় ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এ সময়ে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকাই কঠিন। তিনি বলেন, এ খাতে অন্তত আরও তিন পারসেন্ট দেওয়া হলে লাভ হতো।

রুবানা জানান, বিজিএমইএ আটটি পণ্যে ‘সেফটি ইকুইপমেন্ট’ চেয়েছিল। এখান থেকে পাঁচটিতে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তবে আরও প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, আমরা এক্সাম্পশন চেয়েছিলাম। ওয়াসা, পানি, বিদ্যুতে শতভাগ এক্সাম্পশন এসেছে, সে জন্য কৃতজ্ঞ। রপ্তানিকারক শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ খাত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এটি খুবই ভালো দিক। শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া হবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার কমিউনিকেশনের জন্য খুব দরকার। আগে কমিউনিকেশন বাজেট ছিল ৫৩ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, সেখানে এবার প্রস্তাব করা হয়েছে ৬১ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। আমরা মনে করি, এটিও আমাদের জন্য ভালো দিক। বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ভ্যাট ও কাস্টম আইনে সাংঘর্ষিক জায়গা যত দ্রুত সম্ভব দূর করার প্রতিশ্রুতি আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ।

আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে স্ক্যানার ব্যবহারের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে রুবানা বলেন, আমাদের পোশাক খাতে স্বচ্ছতা আসুক, আমরা সে নিশ্চয়তা চাই। আমরা মনে করি, অনেক রকম দুর্নাম থেকে আমাদের অব্যাহতি দেবে। ব্যাংক ঋণে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে সরকারের ঘোষণা দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। ব্যাংক ঋণে সুদ বেশি হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগে আসতে চায় না।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে ‘কিছু নেই’ উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করে রুবানা বলেন, “শিশুদের জন্য আলাদা অ্যালোকেশন আছে, কিন্তু নারীদের জন্য দেখিনি। নারী উদ্যোক্তাদের শোরুমের ওপর কোনো ট্যাক্স ধরা হবে না, সেটি অবশ্য আমরা যৎসামান্য মনে করি। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে নানা বিষয়ে উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে ‘ইনোভেশন ইন্ডাস্ট্রি স্কিম’ রাখার প্রস্তাবও করেন বিজিএমইএ সভাপতি।

ব্যাংক কমিশন ভালো উদ্যোগ সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাজেটে ব্যাংক কমিশন গঠন নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে উদ্যোগের কথা বলেছেন সেটি ভালো। তবে দেশে কমিশন হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কমিশনে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাংকার বলেন, এ সময়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিলে এ খাতের ওপর চাপ বাড়বে। নগদ টাকার সংকট রয়েছে। এর মধ্যে সরকার যদি ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেই তা হলে প্রভাব পড়বে। এতে সুদহারেও প্রভাব পড়তে পারে।

এবিবি সভাপতি বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ে যে নিয়মকানুন করা হচ্ছে, তা তাৎক্ষণিক কাগজে-কলমে সুফল মিলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থঋণ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে আলাদা বেঞ্চ করতে হবে। প্রয়োজনে খেলাপিদের ছবি প্রকাশ করতে হবে। মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে সরকারি উদ্যোগে মূলধন জোগান দেওয়ার বদলে দু-একটি ব্যাংককে মরে যেতে দিতে হবে। সরকারি ব্যাংকে সরকার নিয়মিত মূলধন জোগান দিচ্ছে। এমনকি বেসরকারি ব্যাংককেও উদ্ধার করা হচ্ছে। এটি ভালো উদাহরণ তৈরি করছে না। এতে অনেকে মনে করতে পারেন, খারাপ করলে অসুবিধা কী, সরকার তো আছেই।

ব্যবসাবান্ধব পুরোপুরি হয়নি মো. হাবিব উল্লাহ ডন প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ বাজেটকে ‘মন্দের ভালো’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসি-য়েশনের (বারভিডা) প্রেসিডেন্ট মো. হাবিব উল্লাহ ডন। তার মতে, এবারের বাজেটকে সরকার ব্যবসাবন্ধব করার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি সফল হয়নি। প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল আমাদের সময়ে তিনি এ কথা বলেন।

হাবিব উল্লাহ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আমরা যেটি পেয়েছি, তা হলো ‘মন্দের ভালো’। আমরা যে প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম, সেগুলোর প্রতিফলন হয়নি। গত বাজেটে যা যা ছিল, এবারও একেবারে হুবহু সেটিই রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছিলাম গাড়ির অবচয় হার পুনর্নির্ধারণ করে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হোক। সেটি করা হয়নি। বর্তমানে আমাদের অবচয় হার রয়েছে ৩৫ শতাংশ। আমরা ৪৫ শতাংশের প্রস্তাব করেছিলাম।

হাবিব উল্লাহ আরও বলেন, গত বাজেটে হাইব্রিড প্রযুক্তির গাড়িকে সামান্য শুল্ক রেয়াত দেওয়া হলেও সেটি হাইব্রিড গাড়ির প্রযুক্তিগত উচ্চমূল্য, সিসি স্ল্যাব ও হাইব্রিড গাড়ির বিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। ফলে চলতি অর্থবছরে হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন হয়নি। বারভিডার প্রেসিডেন্ট জানান, এবার বাজেটে হাইব্রিড গাড়িগুলোর স্ল্যাব ভাঙার কথা ছিল। যেটি ১ হাজার ৮০০ সিসির স্ল্যাব রয়েছে, সেটি ভেঙে এ বাজেটে ২ হাজার ৫০০ সিসি করা হবে বলে আশা করেছিলেন তারা। সেটিও করা হয়নি। তিনি বলেন, সরকার যদি বারভিডার প্রস্তাবনাগুলো আমলে নিত এবং সেগুলোর প্রয়োগ করত, তা হলে ১ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব অর্জন সম্ভব হতো। এখন ৩ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার যে রাজস্ব পেয়েছে সরকার, সেখানে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব পেত। আমরা এ বিষয়ে এনবিআরের কাছে প্রস্তাবনা তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।

বাজেটের আগমুহূর্তে এসব দাবি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, কোনো অসুবিধা হবে না। প্রস্তাবিত বাজেট যদি আপনাদের মনোপুত না হয়, তা হলে আপনারা আবার আমার কাছে আসবেন, আমরা আপনাদের কথা শুনব। এই সরকার ব্যবসাবান্ধব। হাবিবুল্লাহ বলেন, আমরা মনে করি সরকার চেষ্টা করেছে বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব করার। তবে সেটি পুরোপুরি হয়নি। তিনি বলেন, বাজেট পাশ হতে এখনো সময় রয়েছে। আমরা এর মধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে আবার বসব।

আবাসন খাত গতিশীল হবে নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ, স্ট্যাম্প ফি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আবাসন ব্যবসাকে গতিশীল করবে। আবাসন মালিকদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপি গতকাল বিকালে আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন।

শাওন বলেন, আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। পার্শ্ববর্তী দেশের এ খাতের রেজিস্ট্রেশন ফি আমাদের তুলনায় অনেক কম। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছি। এ দেশে ১৪ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন ফি ধরা হয়। এ ফি কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। আমাদের দাবি অনুযায়ী বাজেটে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে স্ট্যাম্প ফি ও রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ফি সাড়ে ৬ থেকে ৮ শতাংশ করা হলে আবাসন খাতের গতিশীলতা বাড়বে। পাশাপাশি অপ্রদর্শিত আয় এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, আবাসন খাতে আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুটো মিলিয়েই। এই বাজেটে আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করা যাবে। কিন্তু বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে কোনো প্রস্তাব আসেনি। আমাদের দাবি, যখন বাজেট পাস হবে তখন বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রেও এ সুযোগের বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নেবে। পুরো আবাসন খাত নিয়ে কাজ করতে হলে অপ্রদর্শিত আয় আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হবে বলে আমরা মনে করি। তিনি আরও বলেন, আমাদের আরও একটি দাবি আবাসন খাতের ক্রেতাদের জন্য স্বল্প সুদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার একটি রিফাইন্যান্সিং ফান্ড গঠনের। সরকার যেহেতু ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য আবাসনের নিশ্চয়তা দিতে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় আনা দরকার সরকারের।

ভ্যাটের চাপে প্লাস্টিক পণ্য জসিম উদ্দিন প্রস্তাবিত বাজেট আগামী ২০২১ সালকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের চেষ্টা রয়েছে এতে। আর কর্মসংস্থানে শিল্প খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেট নিয়ে এমনটাই মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি জসিম উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘মধ্যবিত্তদের নিত্য ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য। আগে তা ভ্যাটমুক্ত ছিল। কিন্তু নতুন বাজেটে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে এর চাপ পড়বে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর। পাশাপাশি এ খাতে কর রেয়াতের বিধানও রাখা হয়নি। এ ছাড়া প্লাস্টিকের খেলনা আমদানির ওপর ৮ ডলার ট্যারিফ ভ্যালু চালুর দাবি ছিল, সেটি করা হয়েছে ৪ ডলার। পাশাপাশি প্লস্টিক পণ্যে করপোরেট ট্যাক্স ৩৭ শতাংশ, অথচ এটি রপ্তানি করা হয়। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকশিল্পে করপোরেট ট্যাক্স মাত্র ১২ শতাংশ।

প্লাস্টিক বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাস্টিকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আগে দেশের তৈরি পোশাকসহ অনেক শিল্প-কারখানায় প্লাস্টিকজাতীয় পণ্য আমদানি করতে হতো। আজ বাংলাদেশই এ ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের চাহিদা পূরণের পর বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানিও হচ্ছে। ২০২১ সাল নাগাদ দেশের মোট রপ্তানির পরিমাণ ৬ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। আর এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের প্লাস্টিক খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে হবে। তাই করপোরেট কর কমানো দরকার।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। সেটি মেটানো হবে ব্যাংক ঋণ ও সঞ্চয়পত্র থেকে।’

এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত চাপে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি। নিজস্ব প্রতিবেদক ই-কমার্স ভ্যাটে ছাড় জরুরি সৈয়দ আলমাস কবির বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবির বলেছেন, বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, অবশ্যই তা ইতিবাচক। কিন্তু চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হলেও তা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে কম। প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ বাজেটবিষয়ক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল আমাদের সময়কে তিনি এ কথা বলেন।

আলমাস কবির বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে-প্রথমত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করা। দ্বিতীয়ত অবকাঠামো তৈরি করা। আমি মনে করি, এ দুটি বিষয় মাথায় রেখে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে হবে। কারণ দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখন সম্প্রসারণ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো স্বল্পতার কারণে আমরা দ্রুত এগোতে পারছি না।

তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলোÑ যে প্রজেক্টগুলোয় আমরা অর্থ ব্যয় করছি, সেগুলো যেন যথাযথভাবে মনিটর করা হয়। আরেকটি বিষয় বলতে চাইÑ ডিজিটাল বিপণনের ওপর সাড়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল, সেটি কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ই-কমার্স খাত সম্পূর্ণ ভ্যাটমুক্ত ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ই-কমার্সের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা ই-কমার্স তো বটেই পাশাপাশি রাইড শেয়ারিংয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তিনি বলেন, ভোক্তারা যখন দেখবেন অনলাইনে কিছু কিনলে ভ্যাট দিতে হচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে তারা কেনাকাটার জন্য অনলাইনকে বেছে নেবেন, যা দেশীয় ই-কমার্সের বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, আগামী পাঁচ কিংবা ১০ বছর ই-কমার্স খাতকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা উচিত। আরেকটি বিষয় আমার খারাপ লেগেছে, আমরা এখন অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছি। এ সময় ফাইবার অপটিক ক্যাবলের ওপর শুল্ক বাড়ানোটা ভালো ফল দেবে না। ফলে ইন্টারনেটের দাম বাড়বে। অন্যদিকে সেলফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি ডিজিটাল রূপান্তর বাধাগ্রস্ত করবে বলে মনে করি।

চামড়াশিল্পে সুবিধা পাওয়া যায়নি দেলোয়ার হোসেন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের চামড়াশিল্পকে দেশি শিল্প উল্লেখ করে এর সুরক্ষার কথা বলা হলেও তেমন সুবিধা দেওয়া হয়নি। চামড়াশিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে উন্নয়নের জন্য যা যা দরকার, তা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে করা হবে তা উল্লেখ নেই। এ ছাড়া এখনো কেমিক্যাল পল্লী পুরোপুরি স্থানান্তর হয়নি।

দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, চামড়ার জন্য কোনো আলাদা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়নি। পাদুকাশিল্পের জন্য কিছু শুল্ক মওকুফ করা হলেও তা চামড়াজাত শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নেই। চামড়া ও পাদুকা রক্ষার কথা বলেও হোস প্লাস্টিক, পাইপ, পিভিসি স্ক্রিন, টেক্সটাইল ও অন্য ফেব্রিক্সের ওপর রেগুলেটরি ডিউটি ও সম্পূরক শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়ার জন্য লবণসহ অন্য কাঁচামালের অতিরিক্ত দাম নিয়েও কিছু বলা নেই প্রস্তাবিত বাজেটে।

মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীরা হতাশ হাফিজুর রহমান খান মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে প্রতিবছর এসআরও জারি করা হচ্ছে। গত ৪ বছর ধরে এমনটি হচ্ছে। এটি খুব ভালো দিক। অন্তত ৫ বছর পর পর এসআরও পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এ ভাবে প্রতিবছর এসআরও হলে মোটরসাইকেল শিল্পে বিনিয়োগকারীরা আসবেন না। এতে ব্যবসায়ীরা হতাশ হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সভাপতি ও রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান এম. হাফিজুর রহমান খান।

আইবিএফবি সভাপতি বলেন, বাজেটে ভেন্ডার ডেভেলপমেন্টের (পণ্য বিক্রেতাদের) কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ভেন্ডার ডেভেলপমেন্টের জন্য বছরের পর বছর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাজেটে এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এতে ব্যবসায়ীরা হতাশ হচ্ছেন।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল শিল্প বিকাশে সরকার বরাবর আন্তরিক। তবে এ আন্তরিকতার হাতকে আরও প্রশস্ত করতে হবে। না হলে এ শিল্প বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে না। এ শিল্পে সহায়তা আরও বাড়ানো দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

টেলিযোগাযোগে উচ্চ করে ভয় শাহেদ আলম প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ বাজেটের ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ প্রকল্প হোঁচট খাবে বলে মন্তব্য করেছেন মোবাইল ফোন অপারেটর রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম। তিনি বলেন, বাজেটে মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পসংশ্লিষ্ট খাতে যেসব করারোপ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রস্তাবিত করব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্ব একটি দিক বড় হোঁচট খাবে। গতকাল প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আমাদের সময়কে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত উচ্চ করের বোঝায় জর্জরিত, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। উচ্চ করের বোঝা নিয়ে এ শিল্প সামনে কত দিন টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বারবার তাদের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিদ্যমান কর কাঠামোতেই বাজারে টিকে থাকা চারটি অপারেটরের মধ্যে তিনটিকেই বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা টেনে যেতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, লোকসান গুনলেও এতদিন তিন অপারেটরের বিনিয়োগকারীদের অনেকটা বাধ্য হয়েই দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর দিতে হচ্ছিল। এবারের বাজেটে ন্যূনতম এ করহার বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে, যা আমাদের যারপরনাই হতাশ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে যে মোবাইল অপারেটররা বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, তাদের ওপর এমন করহারের চপেটাঘাত একেবারেই অপ্রত্যাশিত। টিকে থাকার যুদ্ধে হিমশিম খাওয়া মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পের যখন প্রয়োজন সহযোগিতা, ঠিক সেই সময়ে এমন করারোপ আত্মঘাতী।

শাহেদ আলম বলেন, সব ধরনের মোবাইল পরিসেবা গ্রহণে সম্পূরক শুল্কহার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত ডিজিটাল সেবা গ্রহণে আগ্রহী সব গ্রাহককে নিঃসন্দেহে বাড়তি চাপে ফেলবে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের সিমের কর ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার প্রস্তাবনাও নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার খরচ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে। এখন নতুন মোবাইল সংযোগ যারা কিনছেন, তাদের বেশিরভাগই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের ওপর ১০০ টাকার বাড়তি সিম কর ও বাড়তি ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এমন পদক্ষেপ জাতিসংঘ ঘোষিত এবং সরকার অনুমোদিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের পথকে রুদ্ধ করবে।

তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা মোবাইল টেলিযোগাযোগ শিল্পের বিষয়ে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে এবং প্রস্তাবিত করহারগুলো প্রত্যাহার করে নেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে ফাইভ-জি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের, ইন্টারনেট অব থিংক বা আইওটির মতো সেবা প্রদানে আগামীতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এ বিনিয়োগের সংস্থান নিশ্চিত করতে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে টেলিযোগাযোগ খাতের স্থিতিশীল অবস্থা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। নিজস্ব প্রতিবেদক

advertisement