advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

৬ দফা ‘মুক্তিসনদ’ও ছিল না, ‘সিআইএর দলিল’ও ছিল না

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
১৬ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯ ০০:১১
advertisement

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির সামনে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ কর্মসূচি উত্থাপন করেছিলেন। এই ছয় দফা নিয়ে তখনই তিনটি মহল থেকে পৃথক পৃথক তিন রকম মতামত উপস্থিত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুসারী জাতীয়তাবাদী ধারার আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ মহল এটিকে বাঙালির ‘মুক্তিসনদ’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। ভাসানী অনুসারী ও চীনপন্থি বলে চিহ্নিত ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) বলেছিল, এটি হলো ‘সিআইএর দলিল’। আর মস্কোপন্থি বলে কথিত গোপন কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) বলেছিল, গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ছয় দফা একটি ‘ন্যায্য দাবি’, তবে তা ‘অসম্পূর্ণ’। এবং সে কারণে একে ‘মুক্তিসনদ’ বলা যায় না। একটি জাতির মুক্তিসনদ হতে হলে তার মধ্যে একদিকে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে পরিত্রাণের এবং অন্যদিকে শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা আবশ্যক।

ষাটের দশকে ছাত্রলীগের ‘হার্ডলাইন’ নেতা সিরাজুল আলম খানের আত্মকথন হিসেবে লেখা সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বইয়ে কিছু ভ্রান্ত তথ্য থাকায়, ৫৩ বছর আগের ছয় দফা নিয়ে সৃষ্ট সেই পুরনো বিতর্কটি সম্প্রতি আবার সামনে এসেছে। সেই বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা পেশ করার পর ছাত্র ইউনিয়ন সেটিকে ‘সিআইএর দলিল’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। এ ‘তথ্যটি’ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বানোয়াট ও সত্যের অপলাপমাত্র। তথ্যটি বিভেদপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের (যেটি মেনন গ্রুপ বা চীনপন্থি বলে পরিচিত ছিল) ক্ষেত্রে অনেকটা সত্য হলেও ছাত্র ইউনিয়নের মূল অংশের (যেটি মতিয়া গ্রুপ বা মস্কোপন্থি বলে সাধারণভাবে পরিচিত ছিল) ক্ষেত্রে ছিল একেবারেই ডাহা মিথ্যা। প্রসঙ্গত বলা দরকার, ১৯৬৫ সালে বিভক্ত হয়ে পড়া ছাত্র ইউনিয়নের দুটি অংশের মধ্যে ছয় দফার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের মূল অংশের (মতিয়া গ্রুপের) দৃঢ় অভিমত ছিল এই যে “ছয় দফা ন্যায্য দাবি, কিন্তু অসম্পূর্ণ বিধায় তা ‘মুক্তিসনদ’ নয়”।

ছয় দফা সম্পর্কে ছাত্র ইউনিয়নের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রামাণ্য নিদর্শন আমি নিজে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ ছয় দফা দাবিতে দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছিল। সে সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, যেহেতু ‘ছয় দফা ন্যায্য দাবি’, তাই কমরেডদের হরতালে ‘জনগণের সঙ্গে থাকতে হবে’। সেই নির্দেশনা মেনে আমি ৭ জুনের হরতাল চলাকালে স্টেডিয়াম গেটে পিকেটিংয়ে নেমেছিলাম। ঘণ্টাখানেক পিকেটিং করার মাথায় কোনো একসময় আমার অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে পুলিশ আমাকে জাপটে ধরে গ্রেপ্তার করে ফেলেছিল। ‘মোবাইল সামারি কোর্টে’ এক মাসের কারাদ- দিয়ে সে রাতেই পুলিশ আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম কারাবাস।

সেদিন ঢাকায় কয়েকশ সাধারণ ‘পাবলিক’ গ্রেপ্তার হয়েছিল। তাদের সঙ্গে আমি, জিল্লুর মোরশেদ মিটু, মোহাম্মদ সিরাজীসহ কয়েকজন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। কিন্তু সেসব গ্রেপ্তারকৃতের মধ্যে যারা ছয় দফাকে ‘মুক্তিসনদ’ বলে আখ্যায়িত করত, সেই ছাত্রলীগের কোনো পরিচিত নেতা বা কর্মী সেদিন ছিল না।

ছয় দফা সম্পর্কে যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে তার পূর্বাপর কিছু ঘটনা এবং তার দাবিগুলো সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ছয় দফা মূলত ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বায়ত্তশাসনের’ দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ছয় দফা পেশ হওয়ার এক যুগ আগেই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় ‘গণতন্ত্রের’ ও ‘স্বায়ত্তশাসনের’ জন্য দাবি উত্থাপিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি খুবই সুনির্দিষ্ট রূপে উত্থাপিত হয়েছিল। তবে এ কথাও সর্বাংশে সত্য যে, ছয় দফা ও ৭ জুনের হরতাল নিঃসন্দেহে ছিল এই দাবি আদায়ের সংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ‘ঐতিহাসিক উল্লম্ফনের’ মতো একটি মাইলফলক।

১৯৫৪ সালে রচিত যুক্তফ্রণ্টের ২১ দফার ১৯ নং দফাটি এ প্রসঙ্গে এখানে পূর্ণভাবে উদ্ধৃত করছিÑ

“...লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও সার্বভৌমিক করা হইবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় (অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসমূহ) পূর্ববঙ্গ সরকারের হাতে আনয়ন করা হইবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণ করতঃ পূর্ব পাকিস্তানকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হইবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্রবাহিনীতে পরিণত করা হইবে।”

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় পূর্ববঙ্গকে ‘স্বায়ত্তশাসন’ প্রদান ও ‘সার্বভৌমিক’(!) করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিষয়গুলো কীভাবে কেন্দ্রীয় (পাকিস্তানি) সরকার ও পূর্ববঙ্গের সরকারের মধ্যে বণ্টন করা হবে, তা সেখানে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছিল। দেশরক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গকে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তান-নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান করা যায়, এই প্রস্তাবনায় সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট পথনির্দেশও প্রদান করা হয়েছিল। বস্তুত ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে যে কাঠামোগত রূপরেখা বর্ণিত হয়েছিল সেই ধারাতেই, তার মাঝে অন্তর্ভুক্ত দাবিগুলোকে আরও স্পষ্ট ও ‘ধারালো’ভাবে লিপিবদ্ধ করে, ১২ বছর পর আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচি রচিত হয়েছিল।

এ ক্ষেত্রে ইতিহাসের অন্য আরেকটি কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। কথাটি হলো, এ দেশের কমিউনিস্ট পার্টি আরও আগে, ১৯৪৭ সালের পার্টিশনের পর পরই, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়-লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ বলে সেøাগান তুলেছিল। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্বকে প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যায়িত করে পাকিস্তানকে একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র হিসেবে সে মূল্যায়ন করেছিল। এই ‘কৃত্রিমতা’ চিরস্থায়ী হবে না বলেও সে বিশ্লেষণ করেছিল। পাকিস্তানি শাসকদের ‘শক্তিশালী কেন্দ্রের’ তত্ত্বের সে বিরোধিতা করেছিল। কমিউনিস্টদের সেসব তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এ কথা যদি কেউ দাবি করেন যে, কমিউনিস্টরাই বাঙালির স্বাধিকারের দাবিতে সর্বপ্রথম সোচ্চার হয়েছিল, তা হলে তার সে কথা মোটেও ফেলে দেওয়া যায় না।

১৯৬৬ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছয় দফা উত্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাঙালির মননে বিদ্যুৎসম চমক সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, ছয় দফাই ছিল বাঙালির ‘মুক্তিসনদ’। বাঙালির ‘মুক্তিসনদ’ রচিত হয়েছিল আরও পরে, মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। বলা যায় যে, সেই ‘মুক্তিসনদ’ নির্মাণের পথ তৈরি করার ক্ষেত্রে ছয় দফার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অবদান।

আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচিতে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় প্রদত্ত স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখাকে কিছু ক্ষেত্রে আরেকটু স্পষ্ট ও ‘ধারালো’ করা হয়েছিল। বিশেষত মুদ্রা সম্পর্কে দুটি বিকল্প প্রস্তাবনা এবং কর আদায়ের ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা ও বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কে অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, বিধায় ছয় দফার তৎবিষয়ক দুই ও তিন নম্বর দফা দুটি এখানে উদ্ধৃত করছিÑ দুই. ফেডারেশন সরকারের এখতিয়ারে কেবলমাত্র দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রীয় ব্যাপার এই দুটি বিষয় থাকিবে। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় স্টেটসমূহের (বর্তমান ব্যবস্থায় যাকে প্রদেশ বলা হয়) হাতে থাকিবে। তিন. [এই দফায় মুদ্রা সম্পর্কে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর যে কোনো একটি গ্রহণের প্রস্তাব রাখা হয়]

(ক). পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুইটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিয়োগযোগ্য মুদ্রার প্রচলন করিতে হইবে। এই ব্যবস্থা অনুসারে কারেন্সি কেন্দ্রের হাতে থাকিবে না, আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকিবে। দুই অঞ্চলের জন্য দুইটি স্বতন্ত্র ‘স্টেট’ ব্যাংক থাকিবে। (খ). দুই অঞ্চলের জন্য একই কারেন্সি থাকিবে। এ ব্যবস্থায় মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকিবে। কিন্তু এ অবস্থায় শাসনতন্ত্রে এমন সুনির্দিষ্ট বিধান থাকিতে হইবে, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হইতে না পারে। এই বিধানে পাকিস্তানের একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে। দুই অঞ্চলে দুইটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকিবে।

ছয় দফায় ছিল প্রধানত দুটি ইস্যুÑ ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বায়ত্তশাসন’। ২১ দফায় এ দুটি ইস্যু ছাড়াও ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানাবিধ ইস্যু। সেসবের মধ্যে ছিলÑ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, বর্ধমান হাউসকে (যেটি এখন বাংলা একাডেমি ভবন এবং সে সময় যেটি ছিল প্রাদেশিক সরকারপ্রধানের বাসভবন) বাংলা ভাষার গবেষণাগারে রূপান্তরিত করা, শহীদ মিনার নির্মাণ, শহীদ দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস করা, দুর্নীতি রোধ করা, কালা-কানুনসমূহ বাতিল করা, বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা, আইন পরিষদের ব্যয় হ্রাস করা, জমিদারি প্রথার বিলোপ করা, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করা, কৃষিতে সমবায় চালু করা, কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নয়ন করা, বন্যা ও দুর্ভিক্ষ রোধের ব্যবস্থা করা, শিল্প ও কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়া, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। কিন্তু ছয় দফায় এসব বিষয় ছিল না। শুধু এই একটি যুক্তিতেই বলা যেতে পারে, ছয় দফায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ন্যায্য দাবি সন্বিবেশিত থাকা সত্ত্বেও তা সর্বাঙ্গীণ ও পরিপূর্ণ একটি আর্থসামাজিক কর্মসূচিভিত্তিক দাবিনামা ছিল না। সে কারণে এটিকে “গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে ‘ন্যায্য দাবি’ কিন্তু ‘মুক্তিসনদ’ নয়”Ñ এভাবে আখ্যায়িত করাই ছিল যুক্তিসঙ্গত ও যথার্থ।

এদিকে অন্য মহলটির কা- দেখুন! কোনো একটি দাবিনামা ‘মুক্তিসনদ’ না হলেই যে সেটিকে ‘সিআইএর দলিল’ বলে আখ্যায়িত করতে হবে, তার মোটেও কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর কোনো ন্যায্য দাবির দলিলকে যদি ‘সিআইএর দলিল’ বলে বলা হয়, তা হলে তার দ্বারা কি সিআইএর প্রশংসাই করা হয় না? বস্তুত অসংখ্য ছোট-বড় ন্যায্য দাবিতে সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ‘মুক্তিসংগ্রাম’ পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। এভাবে বিষয়টি বিবেচনা না করে একটি ন্যায়সঙ্গত দাবিকে ‘সিআইএর দলিল’ বলে চিহ্নিত করাটি জনগণের শত্রু-শক্তিকেই সাহায্য করে এবং ন্যায়সঙ্গত গণসংগ্রামের পিঠে ছুরিকাঘাত করে। এ কথা আজ অজানা নয়, আইয়ুব সরকারের প্ররোচনাতেই ছয় দফার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। সে উদ্দেশ্যেই তিনজন জাদরেল চীনপন্থি নেতার বিরুদ্ধে হুলিয়া প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। এই তিনজনের পাশাপাশি একজন মস্কোপন্থি ন্যাপ নেতার হুলিয়াও ‘ভুলক্রমে’ তুলে নেওয়া হয়েছিল।

১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবিনামা উত্থাপনের পর দেশে আন্দোলনের নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এদিকে এর পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবীদের ন্যায্য দাবিদাওয়া, আমূল ভূমি সংস্কার, ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানো ইত্যাদি দাবিতে চলতে থাকা সংগ্রামগুলোও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত ছিল। ছয় দফার দাবিগুলোর সঙ্গে এসব আর্থসামাজিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দাবিদাওয়া যুক্ত করে সংগ্রামী ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ১১ দফা উত্থাপিত হয়েছিল। বাস্তবতার শক্তি এমনই যে, শেষ পর্যন্ত যারা ছয় দফাকে ‘মুক্তিসনদ’ বলত তাদের যেমন, ঠিক তেমনই যারা তাকে ‘সিআইএর দলিল’ বলত তাদেরওÑ উভয় পক্ষকেই ছয় দফা সম্পর্কে নিজ নিজ অতিরঞ্জিত অথবা নেতিবাচকÑ এই উভয় ধরনের মূল্যায়নকে পরিত্যাগ করে ১১ দফায় স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। এই ১১ দফাকে ভিত্তি করেই সংগঠিত হয়েছিল ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। ইতিহাস এ কথাই বলে যে, শুধু ছয় দফা দাবিতে জনগণকে গণঅভ্যুত্থানের পথে উদ্বুদ্ধ করা যায়নি। ছয় দফার সঙ্গে আরও র‌্যাডিক্যাল কর্মসূচি যুক্ত করে ১১ দফা রচনা হওয়ার ফলেই ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ও আইয়ুব শাহির পতন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। ‘মুক্তিসনদ’ রচনার দিকে জাতি এভাবেই আরেক ধাপ অগ্রসর হতে পেরেছিল।

আইয়ুব শাহির পতনের পর, গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭০-এর নির্বাচন। সেই নির্বাচনের রায় বানচাল করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর মার্চে সংগঠিত হয়েছিল অভূতপূর্ব গণপ্রতিরোধ ও ‘অসহযোগ আন্দোলন’। গণদাবি ও গণসংগ্রামের সেই উত্থানকে প্রতিফলিত করে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে ছয় দফার গ-ি অতিক্রম করে ডাক দিয়ে বলতে হয়েছিলÑ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে সেই সর্বাত্মক গণপ্রতিরোধ স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র জনযুদ্ধে উত্তোরিত হয়েছিল। সূচিত হয়েছিল বাঙালির সুমহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। সেই সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ছিল মেহনতি মানুষ। চূড়ান্ত ‘মুক্তিসনদ’ রচনার সুযোগ সেদিন এ কারণেও সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারাকে ধারণকারী, তথা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি তথা ‘জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতার’ লক্ষ্য ও নীতিকে অবলম্বন করে রচিত ’৭২-এর সংবিধানকেই সে কারণে জাতির ‘মুক্তিসনদের’ সমতুল্য একটি দলিল বলে আখ্যায়িত করা যায়।

এ দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘বামপন্থি ধারা’ ও ‘জাতীয়তাবাদী ধারা’ সমান্তরালভাবে বিদ্যমান রয়েছে। তাদের উভয়ের অবদানের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় আন্দোলনের এই দুটি মূল ধারার অবদান ও ভূমিকা একই সঙ্গে আলোচিত ও বিবেচিত না হলে ইতিহাসের পাঠ পরিপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না। তা না করে শুধু একটি ধারার দৃষ্টিকোণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইতিহাস রচনার চেষ্টা করাটি হবে ইতিহাসের ‘খ-িত উপস্থাপন’। এবং ভিন্ন আঙ্গিকে হওয়া সত্ত্বেও সেটিও হবে ‘ইতিহাস বিকৃতির’ একটি ঘৃণ্য অপপ্রয়াস।

য় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

advertisement