advertisement
International Standard University
advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সসীম সামর্থ্যরে অসীম প্রত্যাশার প্রত্যয়

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
১৬ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০১৯ ১৭:৩১
advertisement

সরকারের ধারাবাহিকতায় সরকারের উন্নয়ন আকাক্সক্ষাও একই থাকা স্বাভাবিক। এজন্য নতুন বাজেটে অধিকতর অভিনবত্ব অপ্রত্যাশিত থাকতেই পারে। তবে বাস্তবায়নের সসীম সামর্থ্যকে বাড়ানোর পথ না বাতলিয়ে বা সে পথে যথাযথ না যাওয়ার উদ্যোগ অবর্তমানে অসীম প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি আশাভঙ্গের কারণ যাতে না হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকার অবশ্যই অবকাশ থেকে যাবে। নতুন বাজেটে অর্থনীতির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। এটি এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে উন্নীত করতে হলে রাজস্ব আয়-ব্যয় খাতে ব্যাপক হারে সংস্কার করতে হবে। নতুন ভ্যাট আইনের সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন ব্যাংক খাতের সংস্কার। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ব্যতিরেকে আস্থার পরিবেশ প্রতিষ্ঠাকল্পে কথিত সংস্কার অর্থবহ হবে না। এজন্য বাজেটে দিকনির্দেশনায় অস্পষ্টতা থাকা সমীচীন নয় কোনোমতেই। এমনিতে অর্থনীতির আকার বাড়ছে। তাই স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে বাজেটের আকারও বাড়বে।

বাড়ছে উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণও। পুরো বাজেটই হচ্ছে এতদিন ধরে চলা কাঠামোর মধ্যেই। এতে বাজেট বাস্তবায়নের সব দুর্বলতা যেমন থাকছে, তেমনি থাকছে ঘাটতি অর্থায়নের বিপজ্জনক দিকগুলো। ফলে সুদ পরিশোধ ব্যয় নতুন বাজেটেও বড় মাথাব্যথা হয়েই আছে। থাকবে এবং বাড়বে বর্তমানে যে কঠিন শর্তেও ঋণ নেওয়া হচ্ছে তার পরিশোধের সময় সমুপস্থিত হলে। যে আশঙ্কা দিন দিন প্রবল হচ্ছেÑ তা প্রশমিত হতে পারে এখনো, যদি কঠোর সংস্কারের পথে যাওয়া যায়।

তাত্ত্বিকভাবে একটি বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সম্পদের পুনর্বণ্টন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। এই লক্ষ্য পূরণে প্রতি অর্থবছরে বাজেটের আয়তন বাড়ছে। কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আবার সম্পদের পুনর্বণ্টন সঠিকভাবে না হওয়ায় দেশে আয়বৈষম্য এখন সবচেয়ে বেশি। আর প্রবৃদ্ধি হলেও সেই হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় এটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে আয় ও কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না।

মাথাপিছু আয় ১৮০০ ডলারের কাছে পৌঁছলেও দেশের আমজনতার কাছে তা সুদূরপরাহতের পর্যায়ে রয়েছে। কারও কারও অধিক আয় অধিকাংশের সংসারে মূল্যস্ফীতির বোঝা চাপার উপায় ও উপলক্ষ এ সহজ সমীকরণটি উপলব্ধিতে আসবে না কেন? আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার আশপাশে। বাজেটের প্রস্তাবিত এ আকার সামান্য বাড়তে পারে, কমও হতে পারে। শেষ মুহূর্তের কাটাছেঁড়ার সময় তা চূড়ান্ত হবে। এই ব্যয়ের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার। আর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আদায় করতে হবে সোয়া ৩ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার। কিন্তু বাজেট ব্যয় শেষ পর্যন্ত কমবে। কিন্তু তার চেয়ে বেশি কমবে বাজেটের আয়। গত মার্চ পর্যন্ত সময়ে রাজস্ব আয়ে ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অর্থবছর শেষে সংশোধন হবে আরেক দফা। নতুন বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। বরাবরের মতো ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকবে। তবে সমস্যা মূলত ঘাটতি অর্থায়নের উৎস নিয়ে। যেমন নতুন বাজেটে ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ৬৮ হাজার কোটির কিছু বেশি, আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। উৎস বৈদেশিক হলে তা অর্থনীতির জন্য ভালো। এতে খরচ কম। বিপদ অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যেই। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বেশি অর্থ নিলে বেসরকারি খাত বঞ্চিত হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আর সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে অর্থ নিলে বিপদের মাত্রা আরও বেশি। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঘাটতি অর্থায়নের লক্ষ্য ছিল ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। অথচ মাত্র ৯ মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বেশি। বিকল্প ও নিরাপদ জায়গা না থাকায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ সঞ্চয়পত্রে বেশি। এর ফলে ব্যাংকের সুদহার যেমন কমছে না, তেমনি বাড়ছে বাজেটের সুদ পরিশোধ ব্যয়। ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে ব্যাংকের সুদহার কমাতে হবে, এর সঙ্গে সামঞ্জস্যের স্বার্থে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার। এই দুইয়ের সমন্বয় করার সাধ্য সম্ভবত এখন কারও নেই। এই উভয় সংকটের কারণেই এখন বাজেটের মোট ব্যয়ের ১৮ শতাংশই হচ্ছে সুদ পরিশোধ খাতে। আগামী বাজেটগুলোতে এটি হু-হু করে আরও বাড়বে। বিগত নিকট অর্থবছরগুলোয় ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত না করে বড় আকারের বাজেট করা হয়। উদারহস্তে অর্থ ব্যয় হয়েছে। বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় শেষ পর্যন্ত কোথায় থামবে, তাও অজানা। প্রায় সব ধরনের সংস্কার থেকে দূরে থেকে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে ছোট ছোট সমস্যা জমতে জমতে এখন বিস্ফোরণের পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যাংকিং খাত এর বড় উদাহরণ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি তথ্য-উপাত্তের বেশ অসঙ্গতি আছে। প্রথমত, বলা হচ্ছে উৎপাদন খাতের পারফরম্যান্সের কারণে এবার বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি হলে তো কর আহরণ বেশি হওয়ার কথা। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সামগ্রিক অর্থনীতি আরও চাঙ্গা থাকার থাকা। ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির কথা নয়। অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে ঋণখেলাপিরা কেন টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না? তৃতীয়ত, ব্যবসা হলো প্রবৃদ্ধির উৎস। ব্যবসা বাড়লে ব্যাংকের আয় বৃদ্ধির কথা। কিন্তু ব্যাংকের আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পরিসংখ্যানের মান নিয়ে সন্দেহ এ দেশে নতুন নয়। নাজুক ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নতুন অর্থমন্ত্রী উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। কৃষকরা দর পাচ্ছেন না এটিও নতুন কিছু নয়। তবে এটি এখন মহাবিপদ হয়ে এসেছে। ঋণখেলাপিদের বিশেষ ছাড় দিয়ে এরই মধ্যে যে ঋণখেলাপিবান্ধব পরিবেশ সৃজিত হচ্ছে এর মধ্যে বাজেটে ঘোষিত উচ্চকণ্ঠ হুশিয়ারি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় যাতে দানা বাঁধতে পারে সে ব্যাপারে সচেতন থাকার কোনো বিকল্প দেখি না। এ অবস্থায় দর না পাওয়া কৃষকদের কৃষিকাজে ধরে রাখা, ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজারের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটানো, ব্যবসায়ীদের ছাড় দিয়েও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, আয়বৈষম্য কমানো-করণীয় কাজের তালিকা অনেক লম্বা। প্রথম বাজেটে এর প্রতিফলন ততটা তেমন নেই। সময়ের অবসরে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সংস্কার করা এবং আয়ের পথ বৃদ্ধিই হবে অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে একটি সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমেই দরকার ব্যাংক খাতে বড় সংস্কার। এই খাতটিতে সুশাসনের বড় ধরনের অভাব আছে। সম্প্রতি যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা এই খাতকে সুশাসনের ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। যেমনÑ একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পর্ষদে দুজনের পরিবর্তে চারজন রাখার বিধান। আবার একই পরিবারের সদস্যরা ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর পর্যন্ত পর্ষদের সদস্য থাকতে পারবেন। এগুলো ব্যাংক খাতের সুশাসনের ক্ষেত্রে সমস্যা কমাবে না, বরং বাড়বে বলে অনেকের আশঙ্কা সত্য না হোক এটা সবার প্রত্যাশা। বলা বাহুল্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা পরিচয়ের সূত্র ধরে ঋণ দেওয়া এবং ঋণ আদায়ে নমনীয় ভাব দেখানো বন্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিতভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে বাজেটে একটি ইঙ্গিতমূলক দিকনির্দেশনা আছে। তবে পরিস্থিতির জটিলতার মাত্রা অনুযায়ী তা বড়জোর কুইনাইন প্রকৃতির অ্যান্টিবায়োটিক নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো বেশ শ্লথগতিতে আছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশকিছু সমস্যা আছে। যেমন জমিপ্রাপ্তিতে অসুবিধা, জ্বালানি সংকট, সড়ক-রেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামোর সমস্যা। অবকাঠামোর সমস্যা সমাধানে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো দ্রুত মানসম্পন্নভাবে শেষ করতে হবে। অবশ্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদেশ থেকে এলএনজি আনা হচ্ছে। তবে সরবরাহ পর্যায়ে জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জমির সংকট দূর করতে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত চালু করা দরকার। বিনিয়োগ চাঙ্গা রাখতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সহজ করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনে আমরা ১৭৬ নম্বরে আছি। এর মানে, ১৭৫টি প্রতিযোগী দেশ এখনো বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে। ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া ও ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। য় ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

advertisement