advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পাহাড় নদী ও পরিবেশ বাঁচাও

মাহমুদুল হক আনসারী
১৮ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০১৯ ০৯:১৪
advertisement

পাহাড়, নদী ও পরিবেশ ধ্বংসের শেষ সীমায়। দেশে যে পরিমাণ পাহাড় ছিল, এর অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সব পাহাড়ি অঞ্চল এখন উজাড়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম পাহাড়ি সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। বন্দর নগরী চট্টগ্রাম পাহাড়ি সৌন্দর্যের নগর বললে বেশি বলা হবে না। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে এখন একটি পাহাড়ও তার আপন স্বকীয়তায় পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ উপকূল ছাড়া সব এলাকায় কমবেশি উঁচু-নিচু পাহাড়ের অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানে পর্যায়ক্রমে পাহাড়গুলোর স্বকীয়তা ও অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে।

সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন এসব পাহাড় ভূমিদস্যু রাঘববোয়ালদের দখলে। পাহাড়ি এলাকায় চোখ গেলেই দেখা মেলে এসব পাহাড় নানাভাবে কেটেছিঁড়ে এর অস্তিত্ব বিলীন করে ফেলছে। পাহাড়ের পাদদেশে হাজারো মানুষ পরিবার মিলে বসবাস করছে। এসব পাহাড়ে ভূমিদস্যুদের শক্ত কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির পেছনে রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে।

পাহাড়গুলো ছিন্নচ্ছিন্ন করে অহরহ বেচাবিক্রি হচ্ছে। একপক্ষ আরেকপক্ষকে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করছে। সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। পাড়া-মহল্লা তৈরি হচ্ছে। মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় উপাসনালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সরকারি ভূমি দখলের নানা ছলচাতুরি করা হয়। এসব পাহাড় বেদখল একদিনের কোনো কর্মসূচি নয়। যুগ যুগ ধরে এসব পাহাড়ের পেছনে ভূমিদস্যুরা সিন্ডিকেট করে বহালতবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে।

সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত তাদের তদবির ও অবৈধ অর্থের লেনদেন হয়। ফলে পাহাড় উজাড় ও ছিন্নভিন্ন হলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক এবং গঠনমূলক কর্মসূচির অভাবে পাহাড় রক্ষা করা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশাসন পাহাড় রক্ষার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ জনগণ দেখছে না। ফলে দেশে যে পরিমাণ পাহাড় রয়েছে, তা এখন আর পাহাড় হিসেবে দেখা মিলবে না।

চট্টগ্রামসহ সারাদেশের পাহাড়ের এ করুণদশা। পাহাড় কর্তন ও ধ্বংস জাতির জন্য ভয়াবহ একটি বিষয়। পাহাড়ের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক। পাহাড়ে জীববৈচিত্র্য ও পশুপাখির বিচরণ। পাহাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে এগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ে গাছপালা এখন আর দেখা যায় না। এসব গাছও উজাড় করে ধ্বংস করা হচ্ছে। জ্বালানি ও ব্রিকফিল্ডের লাকড়ি হিসেবে এসব পাহাড়ি সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। পাহাড় ও বনজঙ্গল রক্ষায় বন বিভাগ বিশাল একটি সেক্টর। এ বিভাগের সামনেই দিনরাত পাহাড়ি সম্পদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তা দেখেও বাস্তব পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষের নেই।

পাহাড় ও বনজসম্পদ উজাড়ের ফলে পরিবেশ এবং মানবজীবন এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। এসব পাহাড়-পর্বত, গাছপালা পরিবেশের জন্য না থাকলে কী পরিমাণ মানবজীবনে ধ্বংস নেমে আসবে, তা কমবেশি সব সচেতন নাগরিক বোঝেন। বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশের যে বিরূপ কর্মকা- আমরা দেখছি, এ জন্য জনগণই দায়ী। পাহাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে পরিবেশের উগ্রতা, তুফান আর সাইক্লোন সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রতিবছর কোনো না কোনো সময় বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস ও সমতলে ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোন আঘাত হানছে। এসব বৈরী আবহাওয়া দিন দিন বাড়ছে। কারণ পাহাড় ও পরিবেশ সঠিকভাবে রক্ষা না হলে কোনো অবস্থাতেই মানবজীবনের নিরাপদ জীবন আসা করা যায় না। যে পরিমাণ পাহাড় ও জমি প্রতিনিয়ত বাড়িঘর এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। এ কারণে পরিবেশের এমন বিরূপ প্রভাব। বৈরী পরিবেশের মধ্যে যে পরিমাণ বিল্ডিং গড়ে উঠছে, সেখানেও পরিবেশের কথা রয়েছে। একই নিয়মে পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের নদীগুলো দখল করা হচ্ছে।

নদী রক্ষায় রাষ্ট্রীয় অনেক পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চিন্তাধারা থাকলেও এর বাস্তবায়ন দেখছি না। নদী এখন নদীখেকো ভূমিদস্যুদের দখলে। নদীর দখল ও দূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পরিবেশকে নিয়ে গেছে। দেশের ছোট-বড় সব নদী এখন রাঘববোয়ালদের দখলে। নদী কেন্দ্র করে গড়ে তুলছে ব্যবসায়িক কর্মকা-। নদী ঘেঁষে কল-কারখানা গড়ে তুলছে। এসব কারখানার উচ্ছিষ্ট বর্জ্য সাগর ও নদীতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে সাগরের নানা প্রজাতির মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। সাগরের নাব্য হারিয়ে ফেলছে। নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশ ধ্বংস অর্থ দেশ ও জাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এখন কঠোরভাবে পাহাড় ও নদী রক্ষা করার দীপ্ত শপথ নিতে হবে। আমার-আপনার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য পাহাড়-নদীকে তার স্বকীয়তায় বাঁচিয়ে রাখতে হবে। মাদক ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো সফল অভিযান পরিচালনা করে নদী ও পাহাড় রক্ষা করতে হবে। নদী-পাহাড় না বাঁচলে সমাজ এবং রাষ্ট্র বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পরিবেশবাদী সংগঠন থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবেশ অধিদফতর রয়েছে। এর সামনেই পরিবেশ, নদী ও পাহাড় ধ্বংস হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চোখ বুজেই দায়িত্ব পালন করছে।

বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে টেকনাফ-কক্সবাজারের পাহাড়, বনজঙ্গল একপ্রকার উজাড় হয়ে গেছে। তাদের পুনর্বাসন করতে গিয়ে পাহাড়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি আমরা ডেকে এনেছি। এত রোহিঙ্গার পুনর্বাসন করতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ফিরে পেতে এ জাতির পক্ষে আর সম্ভব নাও হতে পারে। এভাবে পাহাড় ও নদী ধ্বংসের মহোৎসব জাতি দেখছে। এ দেখা যেন শেষ হচ্ছে না। এ পরিণতির শেষ কোথায়, তাও বলতে পারছি না। ভয়াবহ এ খেলা থেকে পরিবেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে।

দেশ ও জাতির স্বার্থে আগামী দিনের সুন্দর সমাজ এবং পৃথিবী বিনির্মাণে পাহাড় ও নদী রক্ষা করতে হবে। অবৈধ দখল ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। আপন স্বকীয়তায় নদী ও পাহাড় ফিরিয়ে আনতে হবে। এটি যদি রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষে সম্ভব হয়, তা হলে হয়তো আগামী দিন অথবা আগামী প্রজন্ম সুন্দর বাংলাদেশ ফিরে পেতে পারে। পরিবেশ, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে নিরাপদে বাঁচাতে হলে অবশ্যই নদী ও পাহাড় রক্ষা করতে হবে। এ দায়িত্ব প্রশাসন থেকে সব সচেতন নাগরিকের। আসুন-পাহাড়, নদী ও পরিবেশ রক্ষায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই। য় মাহমুদুল হক আনসারী : প্রাবন্ধিক

advertisement