advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সংকটাপন্ন ব্যাংকের জন্য কিছু নেই

হারুন-অর-রশিদ
১৮ জুন ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০১৯ ০৮:৪১
advertisement

দেশের ব্যাংকগুলোয় চলছে নগদ অর্থের সংকট, টানাটানি। ঋণ দেওয়ার মতো অর্থও নেই কোনো কোনো ব্যাংকে। খেলাপি ঋণে জর্জরিত। আয়ের সিংহভাগই খেয়ে ফেলছে এই খেলাপি ঋণ। রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি।

সংকটে পড়া ব্যাংক খাত উদ্ধারে বাজেটে পদক্ষেপ থাকবে এমনটি আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাজেটে তেমন কিছু রাখা হয়নি। কিছু নীতি সংস্কারের উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কবে কীভাবে সংস্কার করা হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই।

বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সংকট বাড়বে ব্যাংক খাতে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমানো, রিজার্ভের ওপর সুদ বৃদ্ধি ব্যাংক খাতকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। ব্যাংকগুলোর প্রধান এবং ভয়াবহ সংকট খেলাপি ঋণ।

আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দেন। ডিসেম্বরের পর আর এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না বলে ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু তার ঘোষণার পর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। মার্চে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করা রয়েছে।

খেলাপি ঋণের কারণে গত ২০১৮ সালে ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত কয়েক মাসে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ছাড়াও প্রায় সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী।

খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ব্যাংক ও ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে নতুন নীতিমালা করা হয়। বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা জারি, খেলাপি নীতিমালা সংশোধন, অবলোপন নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। আরও কিছু নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়েছে, যেগুলো প্রক্রিয়াধীন।

প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। বাজেটে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়। এ কথা বহু আগে থেকেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে ঋণখেলাপি বাছাই করা হবে সেই নির্দেশনা নেই বাজেটে। খেলাপি ঋণ আদায়ের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে উচ্চ আদালতের রিট। রিটের মামলায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

ব্যাংকারদের দাবি ছিল রিট মামলা নিষ্পত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ সম্পর্কিত কোনো উল্লেখই নেই বাজেটে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম উদ্দিন এফসিএ বলেন, ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট চলছে। এর অন্যতম কারণ হলো ঋণ খেলাপিদের কাছে টাকা আটকে থাকা।

বাজেটে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদি দুজন ঋণখেলাপিকেও শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে টাকা ফেরত না দেওয়ার সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঋণ খেলাপিদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখাতে নির্দেশ দিয়েছেন। বাজেটেও সেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন এটি কার্যকর করতে হবে। এতে একদিকে যেমন টাকা আদায় বাড়বে, অন্যদিকে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতেও আগ্রহী হবে।

সাম্প্রতি ব্যাংকের আরেকটি সমস্যা তীব্র তারল্য সংকট। এই তারল্য সংকটের কারণে দেশের পুরো শিল্প ও ব্যবসা খাত উচ্চ চড়া সুদের কারণে ধুঁকছে। ব্যাংক মালিকরা ঋণ সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ এবং আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ (নয়-ছয়) সুদহার কার্যকরের ঘোষণা দেন গত বছরের জুলাই থেকে। শিল্পের জন্য এই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি উল্টো এখন সুদহার বাড়ছে। এই সুদহার বৃদ্ধির জন্য দায়ী তারল্য সংকট।

পুঁজিবাজার বিকশিত না হওয়াই ঋণ সংগ্রহের একমাত্র উৎস ব্যাংক খাত। ব্যাংকগুলো স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিচ্ছে। এতে তারল্যের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। এটি দূর করতে বন্ড মার্কেট, পুঁজিবাজার উন্নত করার দাবি দীর্ঘদিনের। সেই বিষয়েও বাজেটে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অর্থমন্ত্রী ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি ঘাটতি বাজেট দিয়েছেন। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি নিলে তারল্য সংকট আরও প্রকট হবে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, ব্যাংকগুলো তারল্য সংকট থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আমরা বিনিয়োগ করতে ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হলেও তহবিল পাচ্ছি না। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সরকারের উচ্চমাত্রায় ব্যাংক ঋণের প্রাক্কলন বেসরকারি খাতে ঋণের জোগানকে টেনে ধরবে।

বাজেটে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে এটি করা হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবাহ বাড়ছে না বলে নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর তুলনায় সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি থাকায় মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। সঞ্চয়পত্রের সদুহার কমানোর দাবি থাকলে তা করা হয়নি। অন্যদিকে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার করতে বলা হয়েছে। এখন ব্যাংকগুলো ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদ দিয়েও আমানত সংগ্রহ বাড়াতে পারছে না। কিন্তু এ সুদহার ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনলে স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকের টাকা তুলে নিয়ে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্র কিনবেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো মোট ১১ হাজার কোটি টাকার মতো বাড়তি কর গুনতে হবে। কোনো কোনো কোম্পানিকে পরিশোধ করতে হবে শতাধিক কোটি টাকার কর। অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কোম্পানির কোনো আয় বছরে রিটেইনড আর্নিংস, রিজার্ভ ইত্যাদির সমষ্টি যদি পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হয়, তা হলে যতটুকু বেশি হবে তার ওপর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ১৫ শতাংশ কর প্রদানের বিধান প্রস্তাব করছি।’

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান একেএম সাহিদ রেজা বলেন, এটি কার্যকর হলে ব্যাংকের ওপর প্রভাব পড়বে। আমরা প্রত্যাশা করব বাজেট পাস হওয়ার আগে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ব্যাংকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এমন কোনো পদক্ষেপ নিশ্চয় বাজেটে রাখা হবে না।

জানতে চাইলে বাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমানত আসছে কম। অনেকে মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমানত ভাঙিয়ে ফেলছেন। অথচ ঋণ দেওয়ার চাপ রয়েছে। এতে অনেক ব্যাংক হয়তো এসএলআরের অতিরিক্ত বিল ও বন্ড নগদায়ন করে ফেলছে। এ ধরনের প্রবণতায় স্বাভাবিকভাবে সুদহার বাড়ছে। তবে কোনো কোনো ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত টাকা রয়েছে। তারা কলমানিতে বিনিয়োগ করে আয় করতে পারছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ঋণ চাহিদা বাড়লে তারল্য সংকট স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

advertisement