advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

২৩ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

২৫ জুন ২০১৯ ০১:৪৩
আপডেট: ২৫ জুন ২০১৯ ০৮:২৪
advertisement

দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজের সংস্কারকাজ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নড়বড়ে এই ব্রিজটির ব্যাপারে উদাসীন ছিল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া রেললাইনের অনেক জায়গায় পাথর, নাটবোল্ট নেই। রেল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই বরমচালে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন তারা।

কুলাউড়ায় আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে আঞ্চলিক পর্যায়ের শীর্ষ চার কর্মকর্তাকে নিয়ে। আর বিভাগীয় পর্যায়ের কমিটিতে সদস্য সংখ্যা পাঁচজন। দুটি কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবগত আছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নির্দেশ দিয়েছেন আহতদের খোঁজখবর রাখতে, তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনের ষষ্ঠ তলায় সাংবাদিক লাইঞ্জে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

দুর্ঘটনার পর পর হাফিজ মাজিদ নামে স্থানীয় এক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন-‘এটি অ্যাক্সিডেন্ট নয়, রেলওয়ের গাফিলতি আর অবহেলা নামক ধারালো ছুরি দ্বারা হত্যা।’ প্রমাণ হিসেবে তিনি গত ফেব্রুয়ারি মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া লুৎফর রহমান রাজু নামে স্থানীয় এক প্রবাসীর স্ট্যাটাস তুলে ধরেন। তাতে রাজু বরমচাল রেলব্রিজের নড়বড়ে অবস্থাসহ আশপাশের অনেক স্থানে রেললাইনের স্লিপারের ক্লিপ না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে রেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

দুর্ঘটনার পর গতকাল সোমবার ভোরেই দুর্ঘটনাস্থলে পাওয়া গেল হাফিজ মাজিদকে। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকা-সিলেট রেলপথে ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ যেন বড় ধরনের প্রাণনাশের অপেক্ষাই করছিল। রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার বিকাল পর্যন্ত দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় অবস্থান করে পাওয়া গেল এমন বক্তব্য।
দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটিতে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন সিলেটের জৈন্তাপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহেদ আহমদ। তার সামনের বগিটিই ব্রিজ ভেঙে খালে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ট্রেনটির সবকটি আসনই যাত্রীতে পূর্ণ ছিল। এ ছাড়া প্রতিটি বগিতেই ২০-২৫ জন করে স্ট্যান্ডিং (দাঁড়ানো) যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর আমরা ওই সেতুতে গিয়ে দেখেছি, সেতুর ওপরের স্লিপার বাঁকানো, নাটগুলোও খুলে পড়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফারুক নামের এক ব্যক্তি জানান, মানুষের আহাজারিতে আমরা আসলে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। ট্রেনের জানালা দিয়ে বের হয়ে মাটির সঙ্গে চাপা পড়েছিল অনেকের হাত-পা ও মুখ। মাটি কেটে তাদের বের করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই সেতু ও আশপাশের রেল সড়কের দুরবস্থা অনেক আগেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু তারা গা করেননি।

শামীম আহমদ নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, যে বগিটি প্রথম লাইনচ্যুত হয়, সেটি একেবারেই জরাজীর্ণ। এসব বগিই সিলেট-ঢাকা রেলপথে চালানো হচ্ছে। তার বক্তব্যকে সমর্থন করেন দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রী সেলিম আহমদ। তিনি বলেন, বগিটি শুরু থেকেই এদিক-ওদিক করছিল। তাই ওই বগিতে স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রীরা দাঁড়াননি।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে এসেছিলেন পার্শ্ববর্তী গ্রাম নন্দনগরের বাসিন্দা ফারুক মিয়া। তিনি বলেন, এই সেতুর স্লিপার জোড়া লাগানো নাটের বেশিরভাগই অনেক আগে খোয়া গেছে। ট্রেন পার হওয়ার সময় সেতু কেঁপে ওঠে। বিষয়টি রেলওয়ে কর্মকর্তাদের একাধিকবার জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

এসব অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয় বলে দাবি করছেন রেলওয়ের কর্তারা। তারা বলছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সেতুতে ভাঙনের কারণে গত ১৯ জুন থেকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে সরাসরি যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ট্রেনের ওপর চাপ বাড়ে। পাঁচ দিন ধরে বাড়তি যাত্রী নিয়েই সিলেটে যাওয়া-আসা করছে ট্রেন। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটিও ১৭টি বগি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। বসে-দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করেই যাওয়া-আসা করছিলেন যাত্রীরা। এতে যাত্রী সংখ্যা ট্রেনের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। এটি একটি কারণ হতে পারে।

সোমবার সকালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাড়তি যাত্রী, রেলপথের ত্রুটি, নড়বড়ে ব্রিজ, রেল চালনায় অদক্ষতা-সব বিষয়কে নজরে রাখলেও সত্যিকার তদন্ত শেষেই প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

এদিকে সিলেট-আখাউড়া সেকশনের সব সেতুই দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এসব সেতুতে যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে আসছিলেন রেলওয়েসংশ্লিষ্টরাও। সেতুর স্লিপার বাঁকা হয়ে যাওয়া, স্ক্রু খুলে পড়া ও পাথর কমে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এগুলো। এই সেকশনের একাধিক সেতুতে ‘ডেড স্টপ’ জারি করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ‘ডেড স্টপ’ জারি করা সেতুগুলো গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে পার হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে চালকের ওপর।

রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের অনেক সেতুই অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শমসেরনগর-টিলাগাঁও সেকশনের ২০০ নম্বর সেতু, মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫ ও ৭ নম্বর সেতু, সাতগাঁও-শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নম্বর সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯ নম্বর সেতু এবং মনতোলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬ নম্বর সেতু। সেতু সংস্কারের কোনো প্রকল্প না থাকায় এগুলো সংস্কার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন ম্যানেজার সচিব কুমার মালাকার বলেন, এই সেকশনের বেশিরভাগ সেতুই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। এর মধ্যে মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯ নম্বর সেতুতে ‘ডেড স্টপ’ জারি করা হয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুই দুর্ঘটনার কারণ কিনা তা এখনই বলা যাবে না।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান মো. আবদুল জলিল জানান, রেলওয়ের প্রকৌশলী ও কর্মীরা ভেঙে যাওয়া কালভার্ট মেরামত করেছেন। সোমবার রাত ৯টায় রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। রাত ৯টা ২০ মিনিটে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস।

এ দুর্ঘটনায় গতকাল দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানান বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম। তিনি বলেন, আঞ্চলিক শীর্ষ চার সদস্যের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক হলেন রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্বাঞ্চল) মো. মিজানুর রহমান। এই কমিটির অন্য তিন সদস্য হলেন-প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) আ. জলিল, চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) সুজিত কুমার এবং চিফ সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকম অফিসার (পূর্ব) ময়নুল ইসলাম।

বিভাগীয় কর্মকর্তা পর্যায়ের তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ডিটিও (কমলাপুর, ঢাকা) মো. ময়নুল ইসলামকে। পাঁচ সদস্যের এই কমিটির সদস্যরা হলেন-ডিএমই (পূর্ব, চট্টগ্রাম) শাহ সুফী নূর মোহাম্মদ, ডিএমও (কমলাপুর, ঢাকা) আ. আহাদ, ডিএসটিই (কমলাপুর, ঢাকা) আবু হেনা মোস্তফা আলম এবং ডিইএন-২ (ঢাকা) আহসান জাবির।
শ্রীমঙ্গলের স্টেশনমাস্টার জাহাঙ্গীর আলম জানান, আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস রবিবার রাত ১০টায় সিলেট ছেড়ে এসে মাইজগাঁও স্টেশনে থামে। এর পর ভাটেরা ও বরমচাল স্টেশন পার হয়ে ২০০ মিটার যাওয়ার পর পাঁচটি বগি লাইন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি বগি বড়ছড়ার কালভার্ট ভেঙে নিচে ছড়ায় পড়ে যায়। আর দুটি বগি উল্টে পড়ে লাইনের পাশের ক্ষেতের মধ্যে।

দুর্ঘটনার পর পরই ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ শুরু করে। ট্রেন থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান।

এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে চারজনের মৃত্যুর পাশাপাশি শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। নিহতরা হলেন-কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, কাদিপুর ইউনিয়নের গুপ্ত গ্রামের বাসিন্দা আবদুল বারীর স্ত্রী গৃহিণী মনোয়ারা পারভিন (৫০)। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ডবলডর গ্রামের নূর হোসেনের ছেলে কাউসার আহমেদ (২৬)। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে ফাহমিদা ইয়াছমিন ইভা (২০) ও বাগেরহাটের সানজিদা বেগম (২০)। ইভা ও সানজিদা ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন। নিহতদের স্বজনরা লাশ শনাক্ত করেছেন।

এদিকে কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ে গতকাল মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়। সভাশেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, পুরনো ব্রিজগুলো পুনঃস্থাপন (রিপ্লেস) করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেনটিতে অতিরিক্ত যাত্রী (ওভারলোডেড) ছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।