advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে হবে ‘মাসিক বান্ধব’?

হাবিব রহমান
২৮ জুন ২০১৯ ২৩:০৪ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯ ২৩:১৯
হাবিব রহমান
advertisement

একটি প্রথম সারির স্কুলের ছাত্রী কামরুন্নাহার অর্পি (দ্মনাম)। প্রতিদিনের মতো স্কুলে গেছে। স্কুলে গিয়েই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ল নবম শ্রেণী পড়ুয়া অর্পি। কারণ তখন তার মাসিক চলছিল। তাই অতিরিক্ত প্যাডসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে স্কুলে যায় সে। কিন্তু তার মাথায় ছিল না, স্কুলের টয়লেট মাসিক বান্ধব নয়। অনেকক্ষণ ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেই টয়লেট যেমনই হোক সেখানেই প্যাড পরিবর্তন করবে সে। প্যাড পরিবর্তন করতে গিয়েই যে ঝামেলায় পড়ে অর্পি সেটি লজ্জায় বলতেও চাইল না সে। অবশেষে কোনো রকমে প্যাড পরিবর্তন করে বাসায় ফেরে অর্পি।

তবে অর্পি শেষ পর্যন্ত প্যাড পরিবর্তন করতে পারলেও রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোরী-তরুণী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সেই সুযোগও পায় না। স্কুলে দীর্ঘ সময় থাকা অবস্থায় যেকোনো প্রায় সব ছাত্রীদেরকে এমন ব্রিবতকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। আবার অনেক স্কুলে ব্যবহার উপযোগী টয়লেটই থাকে না। সেক্ষেত্রে ছাত্রীরা আরও বিপর্যয়ের মুখে থাকেন। এসব কারণে অনেকে মাসিক চলাকালীন সময়ে স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত করে ফেলেন। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এরকম পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত না হয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সচেতনতার ও সঠিক জ্ঞানের অভাবে প্রতি বছর সারা দেশে অনেক কিশোরী সঠিকভাবে লেখাপড়ায় অংশ নিতে পারছে না। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনোলজি রিসার্চ ২০১৩-এর মতে, মাসিক চলাকালে ৩৯% শিক্ষার্থী কমপক্ষে একদিনের জন্য হলেও স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। শুধু অনুপস্থিত থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো সময়টিতে তারা ক্লাসে সঠিকভাবে মনোযোগ রাখতে পারে না। শুধু তাই নয়, ৭২% কিশোরী সর্বশেষ মাসিকে অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থায় পড়েছিলেন।
সিমাভি, টিএনও, বিএনপিএস, ডর্প এবং নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় ঋতু প্রকল্পের মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে রেড অরেঞ্জ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স। কিশোরীদের মাসিক সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সমস্যা বা জটিলতা এড়াতে কী করণীয় হতে পারে?
এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম রেড অরেঞ্জ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন্সের হেড অব প্রোগ্রামস নকীব রাজীব আহমেদ। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘মেয়েদের মাসিক সংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও নির্দেশনা সঠিক সময়ে দিতে হবে। যাতে তারা যেকোনো সমস্যা সেই তথ্য ও নির্দেশনা মোতাবেক সমাধান করতে পারে। এ ছাড়াও মাসিক সময়ে ও মাসিক সংক্রান্ত পর্যাপ্ত সহায়তা স্কুল থেকে শিক্ষকদের সরবরাহ করা এবং মাসিকবান্ধব টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্পির মতো অভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শোনান আরও প্রায় ২০ জন কিশোরী শিক্ষার্থী। তাদের একজন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি টয়লেট থাকলেও তা ব্যবহার অনুপযোগী। শিক্ষকদের আলাদা টয়লেট তালাবন্ধ করে রাখা হয়। কি পরিমাণ সমস্যায় পড়ি তা বলে বোঝাতে পারব না।’ ওই শিক্ষার্থী আমাদের সময়কে এসব কথা বলার সময় তার অন্য বন্ধুরাও মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছিল।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াটার এইডের সহায়তায় আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ২০১৩ সালে দেশের সব জেলা থেকে মোট আড়াই হাজার পরিবারের দুই হাজার ১০৭ জন বয়স্ক নারী ও ৩৭৭ জন কিশোরীর তথ্য নেয়। এ ছাড়া ৭০০ স্কুলের ২ হাজার ৩৩২ জন ছাত্রীর মতামত নেওয়া হয়।

অন্য একটি, জরিপে দেখা গেছে, ছাত্রীদের ৬৮ শতাংশ বলেছে, প্রথমবার মাসিক হওয়ার আগে তারা এ বিষয়ে জানত না। ছাত্রীদের ৮২ শতাংশ মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র এক শতাংশ স্কুলে ব্যবহার করা প্যাড ফেলার ব্যবস্থা আছে। জরিপে ৪০ শতাংশ ছাত্রী বলেছে, মাসিকের কারণে গড়ে মাসে তারা তিনদিন স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ কিশোরীকে এবং ৪৮ শতাংশ বয়স্ক নারীকে মাসিকের সময় ধর্মীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। সমাজে এখনো মাসিকের বিষয়টি লুকিয়ে রাখার বিষয় হয়ে আছে।
মাসিক সময়ে কিংবা অনিয়মিত মাসিক হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, বাড়ি থেকে বের হবার আগে কিংবা সবসময়ই ব্যাগে মাসিকের সময় ব্যবহার করা হয় এরকম প্রয়োজনীয় জিনিসসহ পরিষ্কার কাপড়, তুলা বা প্যাড, হিটিং প্যাডস, আরামদায়ক কাপড়, প্ল্যাস্টিক ব্যাগ, টিস্যু, হ্যান্ড সেনিটিজার ইত্যাদি সাথে রাখতে হবে। তার চেয়েও যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে সব জড়তা ভেঙে সচেতন হওয়ার।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে ২০১৪ অনুযায়ী, গড়ে ১২ বছর বয়সে মেয়েদের প্রথম মাসিক হয়। তাদের মধ্যে মাসিক শুরুর আগে মাত্র ৩৬% মাসিক সম্পর্কে জানে। তাদের মধ্যে ৪৫% শিক্ষার্থী সাধারণত মাসিক সম্পর্কে জানে। সেক্ষেত্রে নারী আত্মীয়রাই সবচেয়ে বড় উৎস জানার ক্ষেত্রে। মাত্র ১০ শতাংশ ডিসপোজাল প্যাড ব্যবহার করে। যেখানে, ৮৬% ব্যবহার করে পুরাতন কাপড়। এদের এক চতুর্থাংশ মাসিক চলাকালে স্কুলে যায় না এবং এক তৃতীয়াংশ মনে করে মাসিক স্কুল ও লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সমস্যা করে।

advertisement