advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হাজার প্রশ্নভিড়ে প্রশ্ন জাগে মনে

ডা. মেখলা সরকার
৩ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০১৯ ০০:১০
advertisement

ফেনীতে নুসরাতের নৃশংসভাবে পুড়িয়ে মারার বেদনা কাটতে না কাটতেই সম্প্রতি বরগুনায় শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফের নির্মম হত্যা সব শ্রেণির মানুষকে এক রকম স্তম্ভিত করে দেয়। বেশ অনেক দিন ধরেই অপরাধমূলক কার্যক্রমের নিষ্ঠুরতা আর বীভৎসতার চেহারা আমাদের স্বাভাবিক ভাবনার বাইরে এক ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রকাশ্যে সবার সামনে খুন করতে দ্বিধা করছে না খুনিরা।

সামান্য মোটরসাইকেলের জন্য সন্তান খুন করছে বাবাকে, শিক্ষক ধর্ষণ করছে শিক্ষার্থীকে, ধর্মের নামে শিক্ষিত তরুণ কেড়ে নিচ্ছে অন্যের জীবন, পুরো শরীরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারছে সহপাঠীকে। পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে শিশুকে হত্যা করতে দ্বিধা করছি না আমরা। পর পর এ ধরনের ঘটনায় আমরা লজ্জিত, আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ও অবসাদগ্রস্ত হই। হাজার প্রশ্নভিড়ে প্রশ্ন জাগে মনে। এ পৃথিবীতে স্বল্পসময়ের জন্য আসা মানুষের মনের মধ্যে এমন কী কাজ করে- যে কারণে সে দ্বিধা করে না অন্যের জীবন নিতে বা হিংস্র থেকে হিংস্রতর হতে? অপরাধমূলক এ কাজে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখা কী? মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, মানুষ মূলত প্রবৃত্তির দাস। এই প্রবৃত্তি নানাভাবে আমাদের মধ্যে তাড়না তৈরি করে।

তা আমরা নিবৃত্ত করতে চাই। ফ্রয়েডের মতে, প্রবৃত্তি দুই ধরনের হয়- জীবনমুখী প্রবৃত্তি এবং ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি। এই ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ধ্বংসাত্মক কিছু করতে অবচেতন মন থেকে প্রণোদনা দেয়। আমরা যখন কোনো কার্যসম্পাদন করি বা এ প্রবৃত্তিকে নিবৃত্ত করতে চাই, তখন আমাদের সামনে দুটি বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একটি হলো বাস্তবতা এবং আরেকটি আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ। তাই কোনো একটি কারণে আমাদের যদি কারো প্রতি তীব্র আক্রোশ তৈরি হয়- যা থেকে ধ্বংস করার তীব্র তাড়না তৈরি করে, তা হলে ওই ধ্বংসাত্মক কাজ করার আগে আমরা বাস্তবতা দেখব।

যদি দেখি এই ধ্বংসাত্মক কাজ করলে আমার বড় ধরনের শাস্তি হবে বা ক্ষতিকারক হবে, তা হলে ধ্বংস করার তীব্র তাড়না কিংবা নেতিবাচক আবেগ আমরা নিয়ন্ত্রণ করব অথবা অন্য কোনোভাবে- যা আমাকে কম ক্ষতি করে সেভাবে প্রকাশ করব। কিন্তু যদি বুঝি বাস্তবতা আমার নিয়ন্ত্রণে ও ধ্বংসাত্মক কোনো কাজ করেও কোনো না কোনোভাবে সমস্যা থেকে পার পেয়ে যাব, তা হলে মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো ওই প্রবৃত্তির তাড়নাকে তুষ্ট করা। এ ক্ষেত্রে আরেকটি জিনিস আমাদের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা হলো আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ।

এটি আমাদের এক রকম সার্বক্ষণিক পাহারা দিয়ে থাকে এবং নির্দেশ দেয় কী উচিত আর কী উচিত নয়। এই ন্যায়-নীতিবোধ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়, তার ছেলেবেলায় যা সে শেখে তার পরিবার বা মা-বাবার কাছ থেকে, সমাজ-সংস্কৃতি থেকে। কাজেই ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি তাড়িত করলে, বাস্তবতা আমাদের অনুকূলে থাকলে ও নৈতিক মূল্যবোধ কারো খুব শক্ত থাকলে সে আর ওই কাজটি করতে পারবে না বা এ ধরনের ভাবনা মাথাতেও আসবে না। তাই খুন, ধর্ষণ ইত্যাদির মতো অপরাধ মানুষ তখনই করে-যখন তার একই সঙ্গে নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল থাকে এবং বাহ্যিক পরিবেশ আপাততভাবে তার অনুকূলে মনে করে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির হিংসাত্মক মনোভাব কোনো কারণে এতটাই প্রকট ও তীব্র থাকে যে, অনেক সময় বাস্তব অবস্থার সামগ্রিক বিবেচনা তার মাথায় সঠিকভাবে কাজ করে না বা ওই মুহূর্তে বিবেচনাশক্তি লোপ পায়। মনস্তত্ত্বের এ ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নৃশংস আচরণ তৈরি হওয়ার পেছনে পরিবারের পরোক্ষ ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এ কথার মানে এই নয় যে, পরিবার সন্তানকে এ ধরনের নেতিবাচক আচরণ করতে সরাসরি উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের মানসিক গঠনের মূল কাঠামো তৈরি হয় ছেলেবেলায়।

আর ওই মানসিক গঠন তৈরিতে তার চারপাশের পরিবেশ, বিশেষত পরিবার বা মা-বাবার প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশি। ছেলেবেলায় আমাদের কোন আচরণ প্রশ্রয় পাচ্ছে বা উৎসাহিত হচ্ছে, অন্যদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আচরণ কেমন ইত্যাদিও আমাদের মানসিক কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এই মানসিক কাঠামো বলতে বুঝি, চারপাশ ও নিজেদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টভঙ্গি, অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচরণ, নানা আবেগমাত্রা ও এর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, নৈতিক অবস্থান, চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা ইত্যাদি। ছেলেবেলা থেকে যদি শিশুর জেদ সব সময় প্রশ্রয় পেয়ে থাকে বা সে যা চায়, তা-ই পায়- তা হলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও তার এ ধরনের মনোভাব থেকে যায় এবং না পাওয়াকে সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। কাজেই বড় হওয়ার পরও তার চাহিদাকে সে ছোটবেলার মতো যে কোনো উপায়ে পাওয়ার চেষ্টা করে।

একই সঙ্গে পরিবার থেকে যদি তার নৈতিক শিক্ষা যথেষ্ট না থাকে অর্থাৎ যে পরিবেশে সে বড় হচ্ছে, সেখানে যদি অনৈতিক কার্যকলাপ সব সময় উৎসাহিত হতে দেখে- তা হলে ভালো-মন্দের বিবেচনা না করে তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য যে কোনো কাজে দ্বিধা করবে না। সম্পর্কে অবিশ্বস্ততা থেকে শুরু করে যে কোনো হয়রানি, অন্যকে আঘাত, এমনকি অন্যকে খুন করার এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এ ছাড়া অতিরিক্ত প্রশ্রয় বা কঠোর শাসন- দুটিই শিশুর মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করে। মনের গভীরে এ হীনম্মন্যতাবোধ আমরা সারাজীবন পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। এই হীনম্মন্যতাবোধ অনেক ক্ষেত্রে অন্যের প্রতি হিংসা, নিজেকে ফাঁপাভাবে বড় প্রমাণ করা, শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমেও পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারের মধ্যে নৃশংসতা, মারামারি, হিংসা ইত্যাদি থাকে, সেসব পরিবারে বড় হওয়া শিশুদের মধ্যে এ ধরনের হিংসাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ছেলেবেলা থেকেই যদি সন্তানের নেতিবাচক আচরণ (অবাধ্যতা, রাগারাগি, মারামারি, অন্যের ক্ষতি ইত্যাদি) পরিবার বা সমাজ থেকে কোনো না কোনোভাবে মনোযোগ পেতে থাকে, তা হলে এ ধরনের আচরণ বাড়তে থাকে এবং তার মধ্যে পরবর্তীকলে অপরাধমূলক আচরণ তৈরি হতে পারে। মূলত ছেলেবেলায় মা-বাবার কাছ থেকে আমাদের যেসব আচরণ গ্রহণযোগ্যতা পায়, তা আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কাঠামোর মধ্যে ঢুকে যায় এবং ওইসব আচরণ আমরা আমাদের আশপাশের মানুষের সঙ্গে বা সমাজজীবনে করে থাকি। আমাদের সমাজ মূলত এখন এক ভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গত এক দশকে প্রযুক্তি, বিশেষত মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার অনেকখানিই পাল্টে ফেলেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন। শিশুরা শৈশব থেকেই পরিচিত হচ্ছে সাইবার ক্রাইম, সাইবার বুলিং বা সহিংস ভিডিও গেমের সঙ্গে। সন্তানের সঙ্গে বুঁদ হয়ে দেখছি নানা টিভি সিরিজ। এসবের প্রধান উপাদান মানুষে মানুষে রেষারেষি বা নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম। তা মনের অজান্তে আমাদের মধ্যে তৈরি করছে মানুষের প্রতি অবিশ্বাস, বিদ্বেষ, হিংসাত্মক মনোভাব ও অশ্রদ্ধা। সহিংস ভিডিও গেম আমাদের অবচেতন মনের গভীরে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়াতে সাহায্য করে বা এসব নেতিবাচক কার্যক্রমের প্রতি এক রকম গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। তা ছাড়া ছেলেবেলায় খেলার মাধ্যমে ক্রমাগত এসব দেখলে এবং মারামারি-কাটাকাটির মধ্যে যে ভয়াবহতা রয়েছে, সেটির গুরুত্ব কমে যায়।

এসবের মধ্যে যে উত্তেজনার মজা আছে, সেটি তার মানস কাঠামোয় জায়গা করে নিতে পারে। তাই শিশু বড় হওয়ার সময় তার শরীর ও মনে যে অফুরন্ত প্রাণশক্তি থাকে, তা অভিভাবক হিসেবে কীভাবে কাজে লাগাব- এর ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে তার ভবিষ্যতের নানা কিছু। হিংসার মনস্তত্ত্বের প্রথমেই বলেছি, নানা ধ্বংসাত্মক কাজ করার আগে বিবেচনা করি, বাস্তবতা আমাদের কতটুকু অনুকূলে আছে। কাজেই কোনো অপরাধ করে শাস্তির বদলে ক্রমাগত নিষ্কৃতি পেতে থাকলে সেটিও তার অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। দেখা গেছে, আইনের ফাঁকফোকর থেকেই যে অপরাধী শুধু ছাড়া পাচ্ছে, তা নয়।

বরং এ ধরনের কাজে পরিবার, সমাজ থেকেও এক রকম ছাড় পাচ্ছে। আমাদের ভোগবাদী সমাজে মানবিক মূল্যবোধের বদলে সশব্দে ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তিকে আমরা সমীহ করতে শিখছি। ফলে আমাদেরই সন্তান, ভাই বা আত্মীয়রা যখন অপকর্ম করে, তার পতিপত্তি দেখায়- তখন লজ্জিত হওয়ার বদলে তার ক্ষমতার দাপট আমাদের পরিতৃপ্তি দেয়। আমরা আমাদের অজান্তে এমন এক খেলায় ঢুকে পড়ছি বা রসদ জোগাচ্ছি- ওই খেলার খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদেরই। ওই খেলায় এক সময় খুন হচ্ছি আমরাই, শিকার হচ্ছে আমাদেরই সন্তানরা।

যে সভ্যতা নিয়ে আমাদের সীমাহীন গর্ব, মানবজীবন নিয়ে আমাদের যত অহমিকা, জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে আমাদের যে গভীর পরিতৃপ্তিবোধ- ওই বোধগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয় নিজের কাছে। আমাদের কি সময় এসেছে ছুটে চলা এ জীবনের রাশটিকে একটু টান দিয়ে থামাতে এবং নিজেদের প্রশ্ন করতে- আসলে কোন পথে যাচ্ছি আমরা? অথবা সভ্যতার অগ্রগতিতে আমরা কি এগোনোর বদলে পিছিয়ে পড়ছি? নাকি প্রযুক্তির নামে, সভ্যতার নামে আমরা আমাদেরই অগোচরে নিজেদের ধ্বংস নিজেরা ডেকে আনছি? আসুন, আমরা একটু থামি। প্রশ্ন করি বারবার। নিজেদের কাছে এ প্রশ্নই আমাদের হয়তো এক সময় সমাধানের পথ দেখাবে।

ডা. মেখলা সরকার : সাইকিয়াট্রিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা

advertisement