advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উনিশ-বিশের বাজেট

৫ জুলাই ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ৬ জুলাই ২০১৯ ০০:১৪
advertisement

বাংলা ভাষায় সংখ্যা নিয়ে বেশকিছু ব্যঙ্গবাক্য আছে, যেমন নয়ছয় করা, যা বায়ান্ন তাই তিপ্পান্ন, নিরানব্বইয়ের ধাক্কা ইত্যাদি। উনিশ-বিশ সে পর্যায়েরই পরিস্থিতি পরিচয়জ্ঞাপক দুটি সংখ্যা শব্দ। রবীন্দ্রনাথ জেনেশুনে যে বিষপান করেছিলেন তা নাকি জীবননাশক বিষ ছিল না, ছিল ‘বিশ’ বা টোয়েন্টি নামের তরল পানীয়।

রবিবাবুর এহেন অভ্যাসসংক্রান্ত আসল তথ্য যেমন মেলে না বাংলাদেশের ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার, প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও প্রত্যয়, বাস্তবায়নে করণীয়, স্মরণীয় অনেক কিছুই এখনো যেন ভাব কল্পনাবিহারি। আর সেই বাজেটের ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তেমনি দেখা যায় বড্ড যেন একদেশদর্শিতার দৃষ্টিভঙ্গি আচ্ছন্ন। সরকারের ধারাবাহিকতায়, বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে প্রণীত বাজেট গতানুগতিক না হয়ে উপায় নেই, ছিল না। নাটকীয় কোনো পরিবর্তন প্রস্তাব করার মতো স্পেস নতুন অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের জন্য ছিল না। যারা বাজেটের নির্মোহ মূল্যায়ন করেন তাদেরও যদি এ বাজেট প্রণয়ন করতে বলা হতো, তারা ব্যতিক্রমী কোনো কিছু উপস্থাপন করতে পারতেন বলে মনে হয় না।

বলা বাহুল্য বাজেটের ভালো-মন্দ প্রভাব-প্রক্রিয়া উভয়ই কমবেশি আছে। তাই বাজেটের সমালোচনা গ্রহণ করা উচিত, অন্ধভাবে নিজেদের ডিফেন্ড করার পথ খুঁজতে গিয়ে অন্যদের প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে তাদের কূট আক্রমণ করে বাজেট পর্যালোচনাকে পাশ কাটানো সবার জন্য ক্ষতিকর। শুধু ভালো দিক কিংবা শুধু মন্দ বা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরাটাও তো গতানুগতিক হয়ে যায়। সাধ আর সাধ্যের সমন্বয় ঘটানোর অনেক প্রয়াস, অর্থনীতিতে বিদ্যমান বশংবদ সমস্যাগুলো স্পর্শ করার, প্রতিবিধান-প্রতিকারের পথ-পন্থা বাতলানোর নির্দেশনা যে বাজেটে আদৌ নেই তা তো নয়।

আবার শুভঙ্করের আশ্রয় নিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা কিংবা কোটারি স্বার্থ উদ্ধারের উপায় উপলক্ষের উপস্থিতি যে এ বাজেটে নেই সে কথাও হলফ করে বলা যাবে না। ভালোকে ভালো বলতেই হবে আর মন্দকে মন্দ তো বটেই। কীভাবে মন্দকে মোকাবিলা করা যাবে তার গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়াটাও সবার দায়িত্ব। বাজেট পর্যালোচনাকে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হতে না দিয়ে এটিকে কীভাবে জাতীয় উন্নয়ন অভিমুখী করা যায় সেদিকে সবারই স্বচ্ছ দৃষ্টি ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা দরকার। জাতীয় অর্থনীতি সবার, কারও কারও নয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক হোক সবার দৃষ্টিভঙ্গি, বিচ্যুতিমূলক নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটকে বড় বাজেট বলা হয়েছে। সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে ইতিহাসের বৃহৎ বাজেট। বাজেট যেহেতু ইনক্রিমেন্টাল বাজেটের আকার (বার্ষিক ১৫-১৭ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধিতে) করা হয় সেহেতু প্রতিবছরই বাজেট ইতিহাসের বড় বাজেট হবেই।

তবে যেহেতু বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না সেহেতু স্বাভাবিক বাজেটকেও অস্বাভাবিক বা বড় বলা বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাজেট বাস্তবায়নের কতগুলো বিষয় আছে। এটা বড় বাজেট নয়, আমাদের দেশে ট্যাক্স জিডিপির যে মাত্রা তা মাত্র ১০ শতাংশ। আমাদের পাশের দেশ ভারতে এটা ২০ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ আমাদের দেশে টাকা আছে কিন্তু সেই টাকা থেকে ট্যাক্স আদায় হয় না। সে কারণে খরচ করা যাচ্ছে না। এ কারণে জিডিপির আকারের দিক থেকে বাজেটকে বড় বলা যায় না। বাজেট বাস্তবায়ন হবে না এ কারণে যে, যদি ট্যাক্স আদায় না হয়, তা হলে বিভিন্ন খাতের যে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে সেটা কীভাবে ব্যয় হবে।

দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। এর সংস্কারের কথা বলা হয়েছে কিন্তু পরিষ্কারভাবে কিছু বলা নেই বা ইঙ্গিত নেই। ব্যাংকিং খাতটিই দেশের অর্থনীতির বড় খাত এবং রেভিনিউ আর্নিংয়ের অন্যতম উৎস। বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও সবার প্রত্যাশা যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা আয়বৈষম্য নিরসনের জন্য বাজেটে বিশেষ কিছু বিষয় থাকবে বা কিছু করা হবে। সেটা করা হয়নি বরং বৈষম্যকে, বৈষম্যের উপায় উপলক্ষকে স্বীকার করে নেওয়ার, স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপ প্রস্তাব করা হয়েছে-যেমন কালোটাকা সাদাকরণের ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়দান এবং কালোটাকা সাদাকরণে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো কড়া (জিরো টলারেন্স গোত্রীয়) ঘোষণা না থাকা।

কালোটাকা সাদা হওয়ার অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এর আগেও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বেশ কয়েকবার দেওয়া হয়েছিল এবং খাতবিশেষে এখনো অব্যাহত আছে, তেমন কেউ সেই সুযোগ গ্রহণ করে না। এর একটি কারণ বোধহয় এই যে, কালো টাকা নিয়ে বাংলাদেশে চলতে কোনো অসুবিধা হয় না। সরকার তাদের ওপর কোনো অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে না। এ কারণে ১০ শতাংশ সুদ দিয়েও তারা কালো টাকা সাদা করতে চায় না। এদের ওপর চাপ দিতে না পারলে বা কালো টাকা বাজেয়াপ্ত না করলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না। আবার কালো টাকার মালিকরা শুধু ১০ পারসেন্ট কর দিয়ে পার পেয়ে যাবে আর যারা নিয়মিত সাদা টাকার ওপর মোটা হারে (৩৫ পারসেন্ট পর্যন্ত) কর দিয়ে চলেছে তাদের কী হবে।

নৈতিকতার দিকটা অবশ্যই দেখতে হবে। বৈষম্য মাপার পরিমাপক গিনি সহগ বাংলাদেশে বর্তমানে ৪.৯, যা উচ্চ বৈষম্য নির্দেশ করে। এটাকে কমিয়ে আনাই যে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা (শোষণমুক্ত, বৈষম্যবিহীন অর্থনৈতিক মুক্তি) সেটা শুধু উপলব্ধির উপলব্ধিতে আনার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ব্যাংকিং খাতের অসুস্থতা দূর করার জন্য, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আনা, এমনকি সরকারি কোম্পানিগুলোকে এখনো আনা যায়নি, সেখানে আস্থা বাড়ানোর মতো পুষ্টিকর প্রস্তাবনা এখনো প্রত্যাশিত থেকে গেল। নতুন অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভালো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর ইঙ্গিত আছে। বৈষম্যমূলক অর্থনীতিতে যারা অত্যন্ত দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, বৈষম্যের কারণে যারা ভুক্তভোগী, তাদের কষ্ট হয়তো কিছুটা লাঘব হবে।

কিন্তু এসডিজি গোল এ কাউকে পেছনে ফেলা যাবে না, এটা পূরণ হওয়ার পথ কই? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেখছি গতানুগতিকভাবেই বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দে জোর না দিলে মানবসম্পদ উন্নয়নই ব্যাহত হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য যে সামান্য টাকা রাখা হয়েছে, সেটা যেন সুন্দর ও সুচারুভাবে দেখভাল করা হয়। তাদের ঋণ দিয়ে পরিশীলিতভাবে পরিচালিত করা হয়। তা হলে এটি সফল খাত হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং বর্তমান বাজেটের একটি ভালো দিক বা সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। সাব-কন্ট্রাক্ট বা উৎসাহ দেওয়া বৈষম্য কমানোর একটি ভালো উপায়। জাপানে সব সময় বড় কোম্পানিগুলো ছোট ছোট কাজ কন্ট্রাক্ট দিয়ে করিয়ে থাকে। তারা নিজেরা করে না।

বাংলাদেশে বড় কোম্পানিগুলোও মুড়ি ভাজে, ছোট প্রতিষ্ঠান তো ভাজেই। এতে ছোট প্রতিষ্ঠান কিছু করতে পারছে না। এ ধরনের খাতে সাফল্য পেতে হলে সরকারের তরফ থেকে সহায়তা দেওয়া হলে, কিছু ছাড় দিলে এসএমই খাত দাঁড়াতে পারবে। গুরুত্বপূর্ণ কৃষি খাতে সাবসিডি দেওয়া হচ্ছে সারের মাধ্যমে। এটা ক্ষুদ্র কৃষক এবং ধনী কৃষক সবার জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে। কিন্তু কৃষি খাতে যারা দরিদ্র কৃষক, যারা দুই বিঘা, তিন বিঘা ধান চাষ করে, তাদের খুব দুরবস্থা। তারা ধান চাষ করে, ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছে না। এটা এমনিতেই অত্যন্ত দুঃসংবাদ। সেজন্য শুধু কৃষকদের একটা সীমারেখা যদি করা যেত, দুই বিঘা পর্যন্ত যারা জমি চাষ করে, তাদের জন্য কিছু নগদ অনুদান দেওয়া যদি যেত।

বহুল আলোচিত ২০১২ সালের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিশ্রেণি ও করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রেখেই, অনলাইন অটোমোশন ব্যতিরেকেই ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বহু পণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে বলে যে আশঙ্কা, তা তো এখন দেখাই যাচ্ছে। ভ্যাট আইনে টার্নওভার করের সীমাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা একটু স্বস্তি পাবেন।

ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো এ দেশের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেওয়ার যোগ্য। তাদের কাছ থেকে কীভাবে ভ্যাট আদায় করা হবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেও হিসাব রাখা হয় আলাদা খাতায়। অনেকে গ্রাহকদের ভ্যাটের রসিদ দেন না। এতে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি হয়। ভ্যাট ফাঁকি রোধ, আমজনতার দেওয়া ভ্যাট সরকারি কোষাগারে পেছানোর পথ যত মসৃণ করা যাবে তত মঙ্গল। সবাই সেই সুদিনের তরে কান পেতে রইবে।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান