advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

নয়ন বন্ড উৎপাদনকারীদের মুখোশ খুলুন

ড. জোবাইদা নাসরীন
৬ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০১৯ ১৬:০২
advertisement

বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডে তব্দা হওয়া জনগণ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের আলোচনা এখনো শেষে হয়নি, বরং প্রতিদিনই এই আলোচনা একটু একটু করে ডালপালা ছড়াচ্ছে। এই ডালপালার সর্বশেষ সংযোজন হলো রিফাত হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সাব্বির আহমেদ ওরেফ ‘নয়ন বন্ড’ পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

অন্যান্য বন্দুকযুদ্ধের মতো এ ঘটনারও যে বয়ান পত্রিকায় ছাপা হয়, তা থেকে জানা যায় যে, গত মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে বরগুনার পুরাকাঠা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা হয়। এ ঘটনায় নয়ন বন্ড নিহত হন। এ ছাড়া এ ঘটনায় এএসপিসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ রকম একজন দুর্ধর্ষ অপরাধীকে জীবিত ধরে বিচার করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। বরং পুলিশ তাকে মৃত উদ্ধার করেছে। সাম্প্রতিক সাড়া জাগানো হত্যাকাণ্ডের স্থান বরগুনা। শহরটা খুব বেশি বড় নয়। এক রাস্তার শহর। শহরটির এক রাস্তার এপাশ-ওপাশ ফিরে থাকা এক নজরে দেখা যায়।

তবে ছোট শহর হলেও অন্যান্য শহরের মতো এখানেও থানা, পুলিশ, আদালত, ডিসি, এসপি, ম্যাজিস্ট্রেট, সিসিটিভিসহ সবই আছে। হত্যাকাণ্ডটির মেয়াদ ছিল প্রায় এক ঘণ্টা। অর্থাৎ ঘাতকদের হাতে চাপাতি ঘুরেছে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। কিন্তু সেই শহরের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসকরা কিছুই জানতে পারেননি। কোথায় ছিলেন তারা? তাদের কেউই কিছুই জানায়নি? তাদের এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে হলো ফেসবুকের মাধ্যমে? এই রকম হয় না, এমন হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু কোথায় যেন কী হচ্ছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমরা অপরাধকে আশকারা দিচ্ছি, চাপাতিসহই খুনিদের কাঁধে রাখছি। মনে হচ্ছে, আমরা সামনে থাকা কোনো প্রতিযোগিতার জন্য খুনিদের চাপাতি চর্চার সুযোগ দিচ্ছি।

অপরাধীদের জন্য দেশটাকে এই অভয়ারণ্য করে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত অবদানই বেশি। কেউই আমরা আমাদের দায়িত্ব ও করণীয় ঠিকমতো পালন করছি না। শুধু দায়টুকু স্বীকার করেই ঘটনা থেকে লাফিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করি। এলাকার সংসদ সদস্য, ওয়ার্ড কমিশনার, রাজনৈতিক দলের নেতা, সিভিল সোসাইটির মানুষরা সবাই নানাভাবে এই অপরাধপ্রবণতাকে উসকে দিচ্ছি, অপরাধে ইন্ধন জোগাচ্ছি। থানা-পুলিশ সবাই অপরাধীদের সম্পর্কে জানে। তাদের নামে অনেক ধরনের মামলাও রয়েছে। তবে কেন তারা কারাগারের বাইরে ছিল? কী ক্ষমতাবলে তারা একের পর এক ঘটনা ঘটাত।

এলাকার মন্ত্রী, সংসদ সদস্য সবাই তাদের চেনেন। এই চেনাজানার শক্ত যোগসূত্রটি কোথায়? আসলে এই যোগসূত্রটিই হলো ক্ষমতার বলয়, যেখানে প্রত্যেকেই একে অন্যের কর্মকাণ্ডের সাক্ষী, পৃষ্ঠপোষক কিংবা ইনিয়ে-বিনিয়ে সমর্থক। তাদের প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কাছে ভীষণভাবে প্রয়োজনীয়। তাই তাদের বেশিদিন হাজতের ভেতরে থাকা হয় না, তারা বেরিয়ে যায়, অপরাধ সংঘটিত করার জন্যই তাদের বের করে আনা হয়। নয়ন বন্ডও তেমন ছিলেন। ক্ষমতাসীন কারো না কারো হাতের পুতুল ছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, সে কারণেই তাকে বিচারের আওতায় না এনে মেরে ফেলা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করলে অনেকেরই অনেক তথ্য বের হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল।

বলা হচ্ছে, নয়ন বন্ড আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। সে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বরগুনা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ একে অন্যকে অভিযুক্ত করলেও কেউ বলছে না যে, নয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত না কিংবা অন্য ঘটনার মতো বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর জন্য বলছে না, সে বিএনপি বা জামায়াতের লোক ছিল। বরং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এসেছে খোদ সরকারি দলের নেতাদের থেকেই। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেছেন, নয়ন ছিলেন সাংসদপুত্র সুনাম দেবনাথের ঘনিষ্ঠ। আর সাংসদপুত্রের অভিযোগ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানই তাদের আশ্রয়দাতা।

এতেই স্পষ্ট হয়েছে, কী কারণে নয়নকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যে সরকারি ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে তার অপরাধের মাত্রা থেকে। নয়ন বন্ডের বিরুদ্ধে এই প্রথম অভিযোগ ওঠেনি। মাদক, ছিনতাই, প্রতিপক্ষকে মারধরসহ তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা ছিল। তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। আবার জেল থেকে বেরিয়েও এসেছেন কিংবা জেল থেকে বের করে আনা হয়েছে, কারো না কারো প্রয়োজনে।

কিন্তু কীভাবে বেরিয়ে এলেন, কারা বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছেন, সেটি খুঁজে বের করা প্রয়োজন, কারণ এর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কেন তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হলো, সেটির কারণ। এটি আর আড়ালের কথা নয় যে, নয়ন বন্ড কোনো না কোনো নেতার ‘ডান হাত-বাম হাত’ নামধারীদের একজন ছিলেন। তা না হলে তিনি দিনদুপুরে এক ঘণ্টা ধরে চাপাতি চালিয়ে কাউকে খুন করার সাহস করতেন না। সময় নিয়ে, রয়ে, সয়ে, নান্দনিকভাবে জায়গামতো রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করছে। তাদের পরিচয় জেনে যাওয়া, গণধোলাই কিংবা পুলিশ বা আইনের ভয়-সবই তাদের জানা।

এগুলো জানা সত্ত্বেও কতটা আয়েশে, কতটা নিরাপদে, কতটা স্বস্তি নিয়ে ঘাতকরা রামদা দিয়ে কুপিয়ে একজনকে জনসমক্ষে হত্যা করার মতো সাহস দেখাতে পারে! হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য একটি কলেজের মুখের রাস্তাকে বেছে নিতে পারে? কেননা তারা জানে, এ ধরনের রাস্তা ফাঁকা থাকে না। তবু তারা দিনেই সবার সামনে হত্যাকা-টি চালিয়েছে। এই অপরাধের জন্য উন্মুক্ত মাঠে আমরা অনিরাপদ, কিন্তু ঘাতকরা জানে, তারা নিরাপদ। আমাদের অনিরাপত্তার কারণগুলোই তাদের উপহার দেয় নিরাপত্তা নামক অতি কাক্সিক্ষত বিষয়টি। আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তার পেছনে থাকা রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ এবং অন্যান্য ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে নয়ন বন্ডকে। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেই অপরাধের নানা ধরনের ক্লুকে।

নয়ন বন্ড বেঁচে থাকলে অনেক কিছুই বলে দিতে পারেন, বের হয়ে যাবে অনেকের অপরাধের মুখোশ। তাই নয়ন বন্ডরা বেঁচে থাকলেও যেমন তাদের লাভ, তেমনি তাদের মেরে ফেললেও তাদের লাভ। কারণ এই নয়ন বন্ডদের তৈরি করেছেন তারাই। নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে। না, এখন আর কিছুই জানা যাবে না। কীভাবে শুধু নয়ন নয়, তার মতো অনেকেই অপরাধ জগতে আসে? কারা তাকে নিজেদের ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করেছেন? নয়ন আসলে কার লোক ছিলেন? নয়নরা একা নয়।

এ রকম হাজারো নয়ন ক্ষমতাসীন নেতারা তৈরি করেন, তাদের প্রয়োজনে। কিন্তু নয়নরা জানেন না যে, যারা তাদের তৈরি করেন তারা নিমিষেই তাদের হত্যা করতে পারেন। তারা জানেন, নয়নরা তাদের ক্ষমতাকে যে কোনো সময় ধসিয়ে দিতে পারে। তাই নয়নদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করলে অপরাধ কমবে তা নয়, বরং যারা নয়নদের তৈরি করে অপরাধ তৈরিতে তাগাদা তৈরি করেন, ক্ষমতার হুঙ্কার তৈরিতে অবদান রাখতে সহায়তা করেন, বিচারের আওতায় প্রথম তাদেরই আনা দরকার।

তারা জানেন, নয়নরা একবার মুখ খুললে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে, তাদের আসল রূপ জনগণ জেনে যাবে, সে জন্য তারা নয়নদের হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেন। এ সমাজে নয়নরা একা নয়। বহু নয়ন আছে আমার, আপনার পাশে। আরও আছে বহু মুখোশধারী ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, যারা চালু রেখেছে নয়নদের তৈরি করার কারখানা। একজন নয়নকে মেরে ফেললেই মনে করা যাবে না যে, অপরাধ শেষ হয়ে গেছে কিংবা অপরাধী মারা গেছে।

কারণ গোড়ার অপরাধীরা তো রয়েই গেছে, তাদের কারখানা তো চালু আছেই। আরও অনেক নয়নই প্রতিদিন তারা তৈরি করছেন। এ রকম দু-চারটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আমরা শুধু গুটিকয়েকজনের নাম জানতে পারি। কিন্তু বিচারবহির্ভূতভাবে তাদের মেরে ফেলা হয় বলে আমরা কখনো জানতে পারি না নয়নদের কারিগরদের নাম, যা জানাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।

ড. জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।