advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘কাজ করি অনেক কষ্টে, রাত কাটে আতঙ্কে’

বাইজিদ আল হাসান ওমান
৮ জুলাই ২০১৯ ১৯:২৫ | আপডেট: ৮ জুলাই ২০১৯ ১৯:২৫
advertisement

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ ওমান। দেশটিতে প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী আছেন। যা ওমানে থাকা বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।কাজের সন্ধানে প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি ছুটে আসেন দেশটিতে। প্রথম দিকে এসব শ্রমিকরা এসে ওঠেন প্রসিদ্ধ শহর হামরিয়াতে। যেখান থেকে কাজ পাওয়া যায় খুব দ্রুত কিন্তু সেই হামরিয়াতেই এখন আর কোনো কাজ নেই। একসময় যেখানে উচ্চ হাকডাকে শ্রমিকদের কাজে নিয়ে যাওয়ার দর উঠেতো, সেখানে এখন নীরবতা।মূলত কাজ না যেনে দালালদের খপ্পরে পরে দেশটিতে যাওয়ায় এর অন্যতম কারণ।

ওমানে প্রায় শুক্রবারেই সন্ধ্যার পর পুলিশের চেকিং হয় এই হামরিয়াতে। যদি কেউ বুঝতে পারে পুলিশ আসছে, সে এমন এক আওয়াজ করে যাতে অন্যরা বুঝতে পেরে যে যার মতো এদিক-সেদিক পালিয়ে যায়।

যারা পুলিশের হাতে আটক হয় তাদের বেশিরভাগ লোকের দেশে চলে যেতে হয়। অন্যথায় জেল খাটতে হয়, আর যাদের আরবাব (ওমানি স্পন্সরকে আরবাব বলে) ভালো, তাদের আরবাব থানায় এসে জরিমানা দিয়ে তাদের মালিকরা ছাড়িয়ে নিয়ে যান।

ভিটেমাটি বিক্রি করে প্রবাসে এসে এভাবেই অনিশ্চয়তার মাঝে দিন পার করেন বেশীরভাগ শ্রমিকরা। শুধুমাত্র ওমানেই নয়,এই চিত্রটি গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই দেখা যায়।আর এ ধরণের সমস্যার অন্যতম কারণ হলো- দালালদের প্ররোচনায় পড়ে বিদেশ গমন,কাজ না জেনে অদক্ষ হিসেবে প্রবাসে গমন,ঋণ নিয়ে বিদেশগমন এসবের অন্যতম কারণ।

কুমিল্লার মুহাম্মাদ দেলোয়ার। দুই বছর আগে দালালের লোভনীয় কথায় ‘ফ্রি ভিসা’ নিয়ে ওমানে এসেছিলেন, এয়ারপোর্টে কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও ওমান আসার পর কাজ মিলে মরুভূমিতে। ৪৮ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করতে হয় এখন দেলোয়ারকে। মাস্কাট থেকে প্রায় ৮৫০ কিমি দূরে মারমুল পিডিও এরিয়াতে কাজ করেন তিনি। আশেপাশে শুধু মরুভূমির বালু ছাড়া আর কিছুই নেই।

তিনি বলেন,‘দালালের মাধ্যমে এ দেশে এসেছিলাম, যে কাজ দেওয়ার কথা ছিল তা দেয়নি।ঋণ নিয়ে এসেছিলাম বলে দেশে ফিরে যায়নি।দেশে গেলে তো পাওনাদাররা ধরমু,কি করে টাকা দিমু। তাই থাইক্যা গেছি। অল্প বেতনে কষ্ট করে কাজ করবার পারলেও,রাতে ঘুমোতি হয় আতঙ্কে,পুলিশের ভয়ে।’

ব্যাংকের ঋণ ও পরিবারের কথা চিন্তা করে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে এখন ওমানের মরুভূমিতে কন্সট্রাকসনের কাজ করেন। সারাদিন কাজকরে ক্লান্ত শরীরে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতেও পারেন না তিনি।

দেলোয়ারের মতো ওমানের মোবেলা সানাইয়া শহরে বিল্ডিং কনস্ট্রাকসনে কাজ করেন ফরিদপুরের মুবারক। চার বছর আগে এলাকার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে ওমানে এসেছিলেন তিনি। প্রথমে মালিকের কাজ করলেও এখন অবৈধ হয়ে গেছেন। চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া এবং মাস শেষে বেতন না পাওয়ার কারণে মালিকের থেকে পালিয়ে এখন অবৈধ হয়ে কাজ করছেন তিনি। সারাদিন কাজের মধ্যে পার করলেও রাত কাটে নানা দুশ্চিন্তায়! একদিকে পরিবারের চিন্তা অপরদিকে যে কোনো সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের ভয়।

ওমানের হামরিয়ায় এমন কয়েক হাজার শ্রমিক রয়েছে, যাদের এখন দেশটিতে বৈধ কাগজপত্র নেই। অবৈধ হয়ে অল্প টাকা বেতনে তারা কাজ করেন। কিন্তু এতোদিন কোনোভাবে তাদের দিন কাটলেও সম্প্রতি ওমানে অবৈধ ব্যবসা বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের ওপর কঠোরতার খড়গ নেমে এসেছে। যার বেশিরভাগ ভুক্তভোগি বাংলাদেশি শ্রমিকরা।কাজ নেই বলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। অনেকে এ অবস্থা থেকে বাঁচতে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

গালফ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় ওমানিরা বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন। বাংলাদেশিদের দক্ষতা আর সুনামের কারণে দেশটির সরকারের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে বাংলাদেশিদের প্রতি।

ওমানে বাংলাদেশি প্রবাসী ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ ইয়াসিন চৌধুরী (সিআইপি) জানান, বর্তমানে দেশটির বাংলাদেশি শ্রমিকরা তেমন ভালো নেই। সেইসাথে যারা ব্যবসা বাণিজ্য করছেন তাদের ব্যবসাও অনেক মন্দা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রবাসীরা খুব একটা ভালো নেই।

উল্লেখ্য, ওমানে বর্তমানে ৮ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি রয়েছে। যাদের বেশিরভাগ শ্রমিক হিসেবে কর্মরত আছেন।

advertisement