advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রেল নাকি জেল

ইকবাল খন্দকার
৯ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ জুলাই ২০১৯ ০৯:২৪
advertisement

‘দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা বন্ধু চিরকাল রেললাইন বহে সমান্তরাল।’

হ্যাঁ, রেললাইন সমান্তরালই বয়ে চলার কথা। কিন্তু সব কি আর কথা অনুযায়ী হয়? হয় না। অথবা আমরা হতে দিই না। আর তাতেই ঘটে দুর্ঘটনা। বিশেষ করে রেললাইন যখন সমান্তরাল চলতে পারে না, তখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না রেলও। ঘটে লাইনচ্যুতির ঘটনা। ঘটে রক্তপাত আর প্রাণনাশের ঘটনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমান্তরাল রেললাইনকে অসমান্তরাল করে কারা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসবে অনেকের থলের বিড়াল। হতে পারে সেই বিড়ালের রঙ কালো। মানে কালো বিড়াল। তাই বলে কি আমরা উত্তর খুঁজব না? কেন খুঁজব না? অবশ্যই খুঁজব। খুঁজতে হবে। নইলে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটতে ঘটতে পুরো রেল খাতই চলে যাবে বেলাইনে। তা হলে শুরু হয়ে যাক উত্তর খোঁজা। তার আগে একটা পুরনো কৌতুক। রেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলল কৃষকরা। বিশেষ করে যাদের বাড়ি রেললাইনের পাশে। তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করল।

রেল কর্তৃপক্ষ অভিযোগের কারণ খতিয়ে না দেখেই আশ্বাস দিল, এখন থেকে আর কারও কোনো ক্ষতি হবে না। এবার ক্ষেপে গেল কৃষকরা। বলল-আগে তো শুনবেন আমাদের ক্ষতিটা কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলল-এত শোনার কিছু নেই। রেল চলাচলের কারণে তোমাদের গাছপালার ক্ষতি হয়, লাইনের পাশের জমির ফসলের ক্ষতি হয়, রেলের কারণে যে ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়, এর জন্য তোমাদের ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরে, এই তো?

কৃষকরা জানাল তাদের ক্ষতিটা গরুকেন্দ্রিক। রেল কর্তৃপক্ষ এবার বলল-বুঝতে পারছি, রেললাইনে তোমাদের গরু কাটা পড়ছে। কৃষকরা বলল-জি না। আমাদের সমস্যা অন্য। আর সেই সমস্যাটা হচ্ছে রেলের গতির কারণে। আপনাদের রেলগাড়ি এতটাই কম গতিতে চলে যে, যাত্রীরা নেমে আমাদের গাই থেকে দুধ দুইয়ে নিয়ে চলে যায়। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, আমাদের রেল কি এতটাই কম গতিতে চলে, যতটা কম গতি হলে যাত্রীরা নেমে গরু থেকে দুধ দুইয়ে আবার সেই রেলে চড়ে চলে যেতে পারে? না, এত কম গতিতে চলে না। কৌতুকে একটু বাড়িয়েই বলা হয়েছে।

তবে একেবারে অসত্য বলা হয়েছে, এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। কৌতুকে যতটা কম বলা হয়েছে, ততটা কম না হলেও আমাদের রেলের গতি অবশ্যই কম। এক জরিপে প্রকাশ-পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রেলের গতি কম। কেন কম? কারণ, আমরা কেনাকাটায় অসৎ। নিশ্চয়ই ভাবছেন কেনাকাটার প্রসঙ্গ এখানে আসছে কেন। কেনাকাটা তো একেবারেই পারিবারিক বিষয়। স্ত্রী-কন্যাদের ব্যাপার। না, কেনাকাটাকে একটা পারিবারিক কিংবা ঘরোয়া বানিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

কেনাকাটা সব ক্ষেত্রেই হয়, হতে পারে। রেল খাতে তো বটেই। এখানে নিয়মিত কেনা হচ্ছে যেসব জিনিস, সেগুলো হলো ওয়াগন, কোচ, ইঞ্জিন, ডেমু ট্রেন ইত্যাদি। কিন্তু দুর্নীতির কারণে সঠিক জিনিসটি আসছে না। ফলে রেলও চলতে পারছে না প্রয়োজনীয় গতিতে। আবার অহরহ ঘটছে লাইনচ্যুতির ঘটনা। সমান্তরাল রেললাইন হয়ে যাচ্ছে অসমান্তরাল। লাইনের রেল চলে যাচ্ছে বেলাইন তথা ধানক্ষেতে। কিংবা পানির নিচে। গন্তব্যে যাত্রী পৌঁছাচ্ছে না, পৌঁছাচ্ছে যাত্রীর লাশ।

হিসাব মতে, ২০১৪ থেকে চলতি বছরের গত মাস তথা জুন পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে ৮৬৮ বার। আর এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১১ জন। আহত হয়েছেন ২৯৮ জন। আর রেলের নিচে কাটা পড়ে যে কতজনের প্রাণ গেছে, তার কোনো হিসাব-নিকাশই নেই। এই যে এত এত প্রাণনাশ, এর দায় কার? অবশ্যই রেলের। যেখানে প্রতি ইঞ্চি রেললাইন নিরাপদ কিনা, সেটি দেখভালের জন্যও লোক নিয়োগ দেওয়া আছে, সেখানে কেন রেললাইনকে কেন্দ্র করে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে? জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার গত ১১ বছরে রেলের উন্নয়নে খরচ করেছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

আর নতুন লোকবল নিয়োগ দিয়েছে প্রায় ১৩ হাজার। তবু বিশেষ কোনো সুফল মিলছে না কেন? তা হলে কি যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে, তারা অদক্ষ? কিন্তু অদক্ষ লোক কেন নিয়োগ দেওয়া হবে? দেশে তো শিক্ষিত আর যোগ্য তরুণের অভাব নেই! তাই ঘুষবাণিজ্য কিংবা রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে চলে আসাটা খুবই স্বাভাবিক। রেল কর্তৃপক্ষ কি এই অভিযোগ উড়িয়ে দিতে পারবে? যদি পারে, তা হলে আমরা খুশিতে তালি বাজাব। আর যদি না পারে, তা হলে এই যে এত এত জানমালের ক্ষতি, এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে দেবে, সেই উপায় আজ হোক আর কাল হোক-অবশ্যই খুঁজতে হবে। ‘নয়টার ট্রেন কয়টায় আসে?’-বিদ্রুপাত্মক এই প্রশ্নটা আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বহু বছর ধরে। আর এই প্রশ্নের নেপথ্য কারণ কী, সবারই কমবেশি জানা।

তবে আশার কথা হচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে, ততই প্রাসঙ্গিকতা কমে আসছে প্রশ্নটির। কারণ এখন অধিকাংশ ট্রেনই সময়মতো ছাড়ে। এটি নিঃসন্দেহে রেল কর্তৃপক্ষের অনেক বড় একটি সফলতা। এই সফলতা ধরে রাখতে পারলে রেলের ওপর যাত্রীদের আস্থা বাড়বে। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। রেল তখনই সময়মতো ছাড়ে এবং গন্তব্যে পৌঁছে, যখন ইঞ্জিন ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু হতাশাজনক হলেও সত্য, ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে চলেছে যখন-তখন। যেমন গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে রেলের পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন বিকল হয়েছে ২৭ বার। এর কারণে রেল চলাচলে সার্বিক বিলম্ব হয়েছে ৬৪ ঘণ্টা। এই যে ইঞ্জিন বিকল হওয়া, এটা কেন? এখানে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে-অযত্ন আর মেয়াদ উত্তীর্ণের বিষয়টিকে।

রেলের ইঞ্জিনের সংখ্যা ২৭২। এর মধ্যে ১৯৫টি মেয়াদোত্তীর্ণ। ভাবা যায়? ভাবা না গেলেও এটাই সত্য। আর এটাও সত্য, আমরা জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে যাতায়াত করছি। অথচ রেলকে বিবেচনা করা হয় নিরাপদ বাহন হিসেবে। মানুষের বিশ্বাস আর কর্তৃপক্ষের কার্যকলাপের মধ্যে এই যে ফারাক, এই ফারাক ঘোচানোর দায়িত্ব কার-আমাদের জানা নেই। হয়তো জানার চেষ্টাও করি না। ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষেত্র বিশেষে আমরা নিজেরাও হয়ে উঠি ‘ভক্ষক’। যে কারণে দেখা যায় রেললাইনের পাথর চুরি হয়ে যায়। কখনো কখনো নাট-বল্টু। এ প্রসঙ্গে একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল। এক লোক রেলে ওঠার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে টয়লেটে ঢুকল। এ সময় তার চোখে পড়ল রেল কর্তৃপক্ষের একটা লেখা-‘রেল আপনার সম্পদ। এর হেফাজত করুন।’

লোকটা আর দেরি করল না। বাথরুমের আয়নাটা খুলে ফেলল। আর সেখানে লিখে রাখল-‘যেহেতু রেল আমার সম্পদ, অতএব আমার সম্পদের ভাগ আমি নিয়ে গেলাম। আর এই যে হেফাজতের বিষয়টা, না, হেফাজতের কোনো ত্রুটি হবে না।’ এ কথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই যে, আমরা রেলকে কমবেশি নিজের সম্পত্তি মনে করেছি সব সময়ই। যে কারণে যাবতীয় যানবাহনে টাকার বিনিময়ে চড়লেও রেলে চড়ার চেষ্টা করেছি বিনা টিকিটে। রেলের এই নাজুকদশার জন্য আমাদের এই মানসিকতাও অনেকাংশে দায়ী।

এই দায়, সেই দায়, এই লোভ, ওই লোভ-এভাবেই তিলে তিলে হুমকির মুখে পড়েছে রেল খাত। যে হুমকির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আমাদের জীবন-মৃত্যু। তাই নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই আমাদের উচিত রেলের সঙ্গে সদাচরণ করা। আর কর্তৃপক্ষ! রেলের প্রতি আপনাদের আচরণ কেমন হবে? যদি মনে করেন রেলে আপনাদের পরিবার-পরিজন কিংবা দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজনও চড়ে, তা হলে দয়া করে রেলের প্রতি সদয় হোন। সামান্য স্বার্থের কারণে নিরাপদ একটা যোগাযোগমাধ্যমকে আর ভয়ঙ্কর করে তুলবেন না। দোহাই আপনাদের।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক