advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেবা

মো. আব্দুল মতিন
৯ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ৯ জুলাই ২০১৯ ০৯:১৭
advertisement

লোকমুখে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সেবার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছিলাম যে, অনেক সময় সিস্টার ও ব্রাদারদের পরিবর্তে সেখানকার ক্লিনাররা নোংরা হাতে রোগীর ড্রেসিং খোলার কাজ ও ড্রেসিং করার কাজ করে থাকে। ঘটনাটি বিশ্বাস হয়নি তাই লেখার উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

কিন্তু ঘটনাচক্রে ও কাকতালীয়ভাবে কিছুদিন আগে নিজেই পা পোড়া রোগী হয়ে সেখানকার বার্ন ইউনিটে চিকিৎসার জন্য যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। চলনসই পোশাক পরিধান অবস্থায় পোড়ার দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল এবং সেই পোশাকেই হাসপাতালে যাওয়া যেত। কিন্তু তখন হঠাৎ করে বিশ্ব বিখ্যাত ফার্সি গদ্যের জনক ও মহাকবি ‘শেখ শাদীর’ লেখা একটি প্রবন্ধ নাম ‘পোশাকের বাহাদুরি’র সারাংশের কথা মনে পড়ে যায়, যা ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে পড়েছিলাম। তখন পরীক্ষান্তে শেখ শাদী সাহেবকে অনুসরণ করে পরিধানের চলনসই পোশাক পরিবর্তন করে আধুনিক পোশাক পরিধান করে, চোখে অভিজাত চশমা ও এক পা পুড়ে পাদুকা পরার অনুপযোগী হলেও অপর পায়ে বিদেশি পাদুকাটি পরিধান করে বার্ন ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাহেবের সামনে উপস্থিত হই। ডাক্তার ছিলেন স্মার্ট এবং তার সেবা ছিল আরও অনেক বেশি সুন্দর।

শুধু তাই নয়, তিনি অতি মনোযোগ দিয়ে আমার পোড়া ক্ষতস্থান পরীক্ষা করেন ও অতি সদয় হয়ে ড্রেসিংরুম থেকে এক ব্রাদারকে ডেকে এনে খুঁটিনাটি সবকিছু বুঝিয়ে দেন ও মনোযোগ দিয়ে যেন ড্রেসিংটি করে দেয়, তাও বলে দেন। সরকারি হাসপাতালে এমন ভালো সেবা পাওয়া যাবে তা কল্পনাও করতে পারিনি। প্রশ্ন জাগে সবাই কি এমন সেবা পেয়ে থাকে? আমি ডাক্তারের সেবাটি সেই বিশ্ব বিখ্যাত লেখক শেখ শাদীর সেই প্রবন্ধের অনুসরণে পেয়েছিলাম কিনা জানি না। তবে সেই সেবার ঠিক উল্টাটি পেয়েছিলাম কয়েকদিন পরই, নতুন করে ড্রেসিং করতে গিয়ে।

ড্রেসিংরুমে গিয়ে ডিউটিরত ব্রাদারের কাছে গেলে সে আঙুল ইশারায় জানতে চায় আমি কি চাই? আমি বলি ডাক্তার সাহেব ড্রেসিং খুলে দেখাতে বলেছেন। ইতোমধ্যে নোংরা এক ক্লিনার রুমের মেজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পচা রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা ব্যান্ডেজ আবর্জনা ইত্যাদি ঝাড়ু শেষে ব্রাদরের কাছে দাঁড়ায়। ব্রাদার সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্লিনারকে আমার ড্রেসিং খোলার নির্দেশ দেয়। তখন নোংরা ক্লিনার সেই নোংরা হাতে আমাকে একটি কাপড়ে ঘেরা জায়গায় নিয়ে আমার পায়ের ব্যান্ডেজযুক্ত ক্ষতস্থানটি নরম করার জন্য স্যালাইন ওয়াটার দিয়ে ভিজায় ও নরম হওয়ার সময় না দিয়ে নির্দয়ের মতো সঙ্গে সঙ্গে শুকনা অবস্থায়ই ঝটকা টান দিয়ে তীব্র ব্যথাযুক্ত নতুন জখম সৃষ্টি করে দেয়।

ফলে আমাকে আরও বেশ কয়েকদিন বেশি ভুগতে হয়েছে। আরও অবাক করা ঘটনা যে, ড্রেসিং খোলার সঙ্গে সঙ্গে কর্কশ ভাষায় সে বলে টাকা দেন, মনে হলো যেন পাওনা টাকা আদায়ের তাগিদ। তখন হতভম্ব হয়ে যাই ও বুঝতে পেরেছিলাম এভাবে প্রায় সবার থেকেই টাকা আদায় করাই এখানকার নিয়ম। তখন আমার স্ত্রী তাকে একশ টাকা দিতে বাধ্য হয়। টাকাটা পেয়ে সে ওলটপালট করে দেখতে থাকে হয়তো বা পরিমাণে কম হওয়ায়। আরও এক-দুবার এখানে আসতে হবে বিধায় এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। জাতিসংঘ মিশনের চাকরির সুবাদে পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। আমাদের দেশের চেয়ে অনেক গরিব দেশও ভ্রমণ করেছি, সেসব দেশের সরকারি হাসপাতালে এমন নিম্নমানের সেবা ও অনিয়মের ঘটনা চোখে পড়েনি।

এসব কাজের তদারকিতে যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন বলে রোগী ও জনসাধারণ মনে করে। অন্যথায় সরকারি হাসপাতালে সেবা বলতে আর কিছুই থাকবে না। তাই তো আমাদের মন্ত্রীগণ চিকিৎসার জন্য উড়াল দিয়ে বিদেশে চলে যায় ও দেশের টাকা বিদেশিদের দিয়ে আসেন। এমন চলতে থাকলে স্বাস্থ্য বিভাগের বারটা বাজতে দেরি হবে না। হাসপাতালের বাইরে জরুরি বিভাগের গেটের অবস্থাও খারাপ। রিকশা, ভ্যানগাড়ি, আইসক্রিমের ভ্যান, চানাচুরের ভ্যান, সিএনজি ইত্যাদি দ্বারা গেট জ্যাম করে রাখে ফলে রোগীবাহী গাড়ি প্রবেশে বিলম্ব হয়। আবার গেটের ঠিক উল্টোদিকে মেইন রোডের ফুটপাতের কোনো অস্তিত্বই নেই। কারণ অবৈধ দখলদাররা ফুটপাতে রিকশাওয়ালা ও ঠেলাওয়ালাদের জন্য সস্তা ভাতের হোটেল তৈরি করে ভাড়া দিয়েছে। এদিকেও তদারকি করার মতো কেউ নেই যা কিছুতেই কাম্য নয়। দেশের সাধারণ জনগণ এর প্রতিকার চায়।

মো. আব্দুল মতিন : প্রাবন্ধিক

advertisement