advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চারিত্রিক স্খলনের মহামারী ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
১০ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৯ ০৮:৩৩
advertisement

ধর্ষণ ও ধর্ষণসংশ্লিষ্ট খুন এখন মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। যৌন হয়রানির হোতা হিসেবে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নামও জড়িয়ে যাচ্ছে। এর চেয়ে মর্মান্তিক বাস্তবতা আর কী হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনার মধ্যে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের হাতে যৌন লাঞ্ছনার শিকার হয়। অতঃপর মারা যায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হতভাগ্য নুসরাত। নারায়ণগঞ্জের অক্সফোর্ড স্কুলের শিক্ষক আরিফুলের লালসার শিকার হয় অন্তত ২০ ছাত্রী।

এর পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে নারায়ণগঞ্জের এক মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আল-আমিন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝে মধ্যেই শিক্ষকের হাতে ছাত্রীর প্রতি যৌন হয়রানির খবর বের হয়। এ ধরনের চারিত্রিক স্খলন যেন এখন মহামারীর মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনস্তত্ত্ববিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা এ অবস্থাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন, তা জানি না। সব ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি যে রিপুর তাড়নায় হচ্ছে, এমনও নয়। আরও জঘন্য প্রেক্ষাপট রয়েছে। যেমন-শিক্ষক আরিফুল যৌনদৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে টাকাও আদায় করত। ইভটিজিং থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি একই সূত্রে গাঁথা।

এসব অসুস্থ বিকৃত মানসিকতার পুরুষ বিবেকের দংশনে শুদ্ধ হয়ে উঠবে-এমন বিশ্বাস হয় না। আইনের শাসন ও পারিবারিক-সামাজিক ধিক্কার যদি তাদের মানুষে পরিণত করে, তা হলেই রক্ষা। কিন্তু ওই ভরসা কি আমরা করতে পারি! স্মৃতি ও তথ্য থেকে দেখতে পাচ্ছি, প্রায় দুই দশক আগেও এমন বীভৎস দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছিল। আজ পর্যন্তও তা চলমান। হয়তো এসব চরিত্রহীন মানুষকে রাষ্ট্রের আইন ও সমাজ তেমনভাবে শাসনের মুখোমুখি করতে পারেনি।

২০০১ সালের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রী সিমির আত্মহননের ঘটনা সংবেদনশীল মানুষের মন এখনো ছুঁয়ে আছে। ওই ঘটনা যারা মনে করতে পারবেন, তারা জানেন খিলগাঁওয়ে পাড়ার বখাটেদের সঙ্গে জুটেছিল বখাটে পুলিশ সদস্য। তারা ইভটিজিং বা যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল সিমির জীবন। সমাজ এগিয়ে আসেনি সিমিকে রক্ষা করতে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সিমির পরিবার পায়নি প্রয়োজনীয় সহায়তা। শেষ পর্যন্ত এই ব্যর্থ সমাজের প্রতি তীব্র ধিক্কার দিয়ে সিমিকে আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে নিজের সম্মান রক্ষা করতে হয়েছিল।

আমরা ভেবেছিলাম, সিমি নিজের জীবন দিয়ে সমাজকে শুচিশুভ্র করার পথ করে দিয়েছিল। তার পরিবারকে বিব্রত ও বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। এভাবেই জিতে গিয়েছিল সিমির বিদেহী আত্মা। এর পর ধারাবাহিকভাবে যৌন হেনস্তার ঘটনা ঘটে যাওয়া দেখে ও শুনে মনে হয়, সমাজের কিছুই বদলে যায়নি। ওই সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার আরেকটি নাজুক ছবি ভেসে উঠেছিল গণমাধ্যমে। জানা গিয়েছিল, সিমি আত্মহত্যার মদদদাতাদের অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবার হামলে পড়েছিল সিমির পরিবারের ওপর।

অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ভীত ও অতিষ্ঠ সিমির পরিবার ৬০টির মতো সাধারণ ডায়েরি করেছিল থানায়। এর পরও নিরাপদ হতে পারেননি তারা। খোদ রাজধানীতে কয়েক বখাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়ে কত বেশি ক্ষমতাধর যে, তারা অধরা থেকে সদম্ভে অত্যাচার চালাতে পেরেছিল একটি পরিবারের ওপর। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসতে হয়েছিল সংবাদপত্রকে। পত্রিকার রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, সিমির পরিবারের জন্য পুলিশ প্রহরা থাকার কথা থাকলেও সব সময় পালিত হতো না।

আমরা ভেবে পাই না, কিছুসংখ্যক মাস্তান মাস্তানি করবে আর এ জন্য দিনের পর দিন পুলিশ প্রহরা বসাতে হবে কেন! ওই মাস্তানরা তো হাতের কাছেই থাকে। পুলিশ ধারে-কাছে না থাকলেই সিমিদের বাসায় ঢিল ছুড়ত। ইলেকট্রিক লাইনে আগুন ধরিয়ে দিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের হাত এত ছোট যে, এসব বখাটে মাস্তান সিনা টান করে মুক্ত বাতাসে মাস্তানি করতে পারত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওইসব অন্যায়ের মাত্রা শুধু বেড়েছে। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হলে তো রক্ষাই নেই। না হলের ফেনীর নুসরাতকে যৌন হয়রানিকারী মাদ্রাসা অধ্যক্ষকে রক্ষা করার জন্য রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ-সবাইকে সক্রিয় হতে হয়েছিল কেন! একমাত্র সব সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে পান।

বিপন্ন মানুষের সামনে তারা অদ্ভুত পরিসংখ্যান হাজির করেন। ...অমুক সরকারের সময় থেকে কতটা খুন কম হয়েছে, ডাকাতি, ছিনতাই। এ বছর আগের চেয়ে দুটি কম হয়েছে বলে স্বস্তি খোঁজেন। খোঁজ নেন না পুলিশের ওপর থেকে কেন মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধারণীকরণ করে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই না। জঙ্গি দমন থেকে নানা ক্ষেত্রে এই বাহিনীর সাফল্য আছে। কিন্তু যেসব অভিযোগ শুনলে ভুক্তভোগী মানুষ বিশ্বাস করে, সেটিকে কলঙ্কমুক্ত করার জন্য কি সংশ্লিষ্ট দপ্তর এগিয়ে এসেছে? সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রের জরুরি এই প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বদলে নীতিনির্ধারকরা কেবল সংকট আড়াল করতে চান। আড়াল করার ঢঙটিও প্রায় একই রকম। অনেকটা ফাঁকিবাজ ছেলের পরীক্ষায় ফেল করার অজুহাতের মতো।

বর্তমান সরকার এর আগেরবার ক্ষমতা গ্রহণের পর কয়েক মাসের মধ্যে যখন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বাড়বাড়ন্ত হতে লাগল, তখন প্রকৃত শাসন না করে সরকারদলীয় বিধায়করা অজুহাত দিতে লাগলেন-ছাত্রলীগের ভেতর ছদ্মবেশী শিবির ও ছাত্রদল ঢুকে পড়ে ছাত্রলীগের ইমেজ নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে মেতেছে। কিন্তু এসবের প্রবক্তারা একবারও ভাবেননি, এ ধারার অজুহাতে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেবে। যেমন-ছাত্রলীগ এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, অন্য বলয়ের ষড়যন্ত্রকারীরা ঢুকে পড়ল অথচ তারা টের পেল না! অথবা বিরুদ্ধ পক্ষ ছাত্রলীগের পরিচয় বুকে সেঁটে অনাচার করছে আর বিশুদ্ধ ছাত্রলীগ সদস্যরা তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে পেছনে দাঁড়াচ্ছে। ছাত্রলীগের দেখভাল করার জাতীয় নেতারা অসহায়ভাবে তা-ই দেখছেন! এসব অজুহাত সব সময়ই হতাশা ও অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ।

ষড়যন্ত্রকারীরা যদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে যায় এবং তা দায়িত্বশীলরা মেনে নেন, তা হলে ভঙ্গুর কাঠামোর রাস টেনে ধরা কঠিন। বর্তমানের বাস্তবতায় জনসংখ্যা আধিক্য এবং নানা সমস্যার এ দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সততা ও সবল অবস্থান সমাজজীবনকে স্বস্তি দিতে পারে। সমাজের মানুষ যদি বিশ্বাস করতে পারে, দেশের পুলিশিব্যবস্থায় তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব সমস্যা নিরসনে নিশ্চিন্ত আশ্রয় নেওয়া যায়, তা হলে সামাজিক অস্থিরতা অনেক কমে যাবে।

এ জন্য প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ ও অভিপ্রায়ের পুনর্গঠন এবং এই সংস্থার সদস্যদের ভেতর আস্থা ফিরিয়ে আনা। আমরা বিশ্বাস করি, যে দেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন, পাকিস্তানিদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে রাজারবাগে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে জীবন দেন-ওই দেশের পুলিশের সাধারণ বা এলিট ফোর্সের সদস্যরা নষ্ট হয়ে যেতে পারেন না।

পুলিশ-র‌্যাবে অসংখ্য দায়িত্ববান, সৎ ও দেশপ্রেমিক সদস্য আছেন। কিন্তু তাদের আমরা যোগ্যভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। সর্বক্ষেত্রে রাজনীতিকীকরণের কারণ ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে এই বাহিনীকে ব্যবহার করতে গিয়ে সৃষ্টি করেছি এক অসহনীয় নৈরাজ্য। আমাদের রাজনীতিকদের মধ্যে দেশপ্রেমের লক্ষণ ততটা স্পষ্ট নয়, যতটা স্পষ্ট দলপ্রীতি ও ক্ষমতাপ্রীতির অভিলাষ। এ কারণে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতাসীন হওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় সব জরুরি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতে চান। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াতের ভাবনা আর আওয়ামী লীগের ভাবনা এক হওয়া উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া এই ঐতিহ্যবাহী দলটির আচরণ হওয়া উচিত অনেক মুক্ত ও জনস্বার্থবান্ধব। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখানেই, নেতিবাচক দিকগুলোয় ক্ষমতার দৌড়ে থাকা সব দলই যেন পরস্পরের অনুসারী।

দলীয় সংকীর্ণতায় না থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যদি দেশ ও সমাজের স্বার্থ রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেত, তা হলে এতে একদিকে যেমন এই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেত-অন্যদিকে তেমনি সাধিত হতো দেশকল্যাণ। বরাবরই একটি অভিযোগ রয়েছে, এ দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারি দলের অনুগত থাকে বা থাকতে বাধ্য হয়। অভিযোগটি এ দেশের ভুক্তভোগী মানুষ অবিশ্বাস করে না। এই বাহিনীর সদস্যদের স্থানীয় পর্যায়ে সরকারদলীয় এমপি কিংবা ছোট-বড় নেতাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশ মানতে হয়। জাতীয় পর্যায়ে এই নিয়ন্ত্রণের বলয়টা আরও বড়।

সব সরকারের আমলেই এভাবে দলীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ অব্যাহত থেকেছে। এমন বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সততা, দৃঢ়তা ও মনোবল অটুট রাখার অনুকূল নয়। দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ও সরকারের এ সত্যটি গভীরভাবে অনুধাবন করা উচিত যে, একটি স্থিতিশীল সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি। প্রতিদিনের খুনাখুনি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, নদী দখল সমাজজীবনকে অস্থির করে তুলছে। সমাজ হতাশাগ্রস্ত হলে নানা নৈরাজ্য জায়গা করে নেয়। দলীয়করণের ঘূর্ণিতে বন্দি হয়ে পড়লে পুলিশ প্রশাসন তার স্বাভাবিক যোগ্যতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারে না।

দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে যদি চাকরির উন্নতির সোপান হয় এবং যথেচ্ছাচার করার লাইসেন্স পাওয়া যায়, তা হলে জনকল্যাণের মানসিকতা নির্বাপিত হতে বাধ্য। এসব কারণে আমরা মনে করি, জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে সমাজ ও মানুষের যাপিতজীবন সুরক্ষার স্বার্থে অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্ত হাতে সরকারকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তেমনিভাবে সব রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদেরও নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে না পারলে এ অঞ্চল থেকে সততা দাবি করা যাবে না। অন্যায় সুবিধা নিতে চাইলে বিনিময়ে অন্যায় সুবিধালাভের পথও করে দিতে হবে। এমন বাস্তবতা সমাজে বিরাজ করছে বলেই ধর্ষক-নিপীড়করা প্রতিদিন তাদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। চারিত্রিক স্খলন প্রকাশ্য হচ্ছে। এর রাস যদি এখনই টানা না যায়, তা হলে ঘোরতর অন্ধকারকে এড়ানো কঠিন হবে। ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়