advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দেশে এসব কী হচ্ছে

হাসান আল জাভেদ
১২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯ ১২:০১
প্রতীকী ছবি
advertisement

মানবতার ধ্বজা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সভ্যতা। কিন্তু আমাদের চোখের সামনে এমন কিছু কাণ্ডও ঘটছে, যেসব কাণ্ড মানবতার সেই ধ্বজাকে ভূলুণ্ঠিত করে; আমরা সত্যিই সভ্যতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি, নাকি অসভ্যতার উল্টো পথে ফিরে যাচ্ছি বর্বর আদিম যুগে?-এমন প্রশ্ন মেলে ধরে চোখের সামনে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি একের পর এক ঘটে যাচ্ছে এমন অমানবিক, নির্মম কাণ্ড।

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যু আমাদের হৃদয়ে দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই বরগুনায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে খুন করার দৃশ্য আমাদের ক্ষত হৃদয়কে ফের রক্তাক্ত করে; চেপে ধরে মানবতার টুঁটি। দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক ঘটে যাচ্ছে এহেন ন্যক্কারজনক পাশবিক কাণ্ড।

বিবেকবান মানুষের মনে এখন প্রশ্ন, দেশে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিষয়ক বিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, হত্যা-ধর্ষণসহ মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সহজাত। কিন্তু পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই হ্রাস পাওয়া, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ অপব্যবহার বৃদ্ধি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভাব, রাজনৈতিক পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়া, সামাজিক অবক্ষয়, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণই মূলত আমাদের মানবিক গুণগুলোকে গ্রাস করছে, করে তুলছে পাশবিক। এতে করে নিরীহ কুসুমকোমল হৃদয়ের সাধারণ মানুষ এখন মারাত্মক ভীতিকর অবস্থার মধ্যে আছে। রিফাত শরীফ কিংবা নুসরাত জাহান রাফির মতো নির্মম মৃত্যুর শিকার মানুষের তালিকা চারপাশে ক্রমেই বাড়ছে।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ চাঁদ উদ্যানে এক যুবককে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় কিশোর-তরুণেরা। নিহত পঁচিশোর্ধ্ব ওই যুবক ও হত্যাকারীদের পরিচয় শনাক্ত হয়নি এ পর্যন্ত। বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ রেলস্টেশনে অজ্ঞাত যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৯ জুন রাতে শরীয়তপুরের জাজিরায় এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন পৌর মেয়র ইউনুছ বেপারির ছেলে মাসুদ বেপারি।

কিন্তু ৮ দিনের মাথায় মেয়রপুত্র জামিনে মুক্তি পাওয়ায় ভুক্তভোগী ওই কলেজছাত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা এখন ভয়াবহ আতঙ্কের মধ্যে আছেন। এভাবে প্রতিদিনই পিটিয়ে, কুপিয়ে, ছুরিকাঘাতে, কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে, গণপিটুনি দিয়ে, ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়নের পর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হচ্ছে মানুষ। এমনকি পাঁচ-ছয় বছরের শিশুরাও এমন পাশবিকতা, বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের পর অবুঝ শিশুদের গলা টিপে মেরে ফেলা হচ্ছে।

বিচারবহির্ভূত হামলার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বা পোড়ার দহনে অনেকেই জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছেন। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে শুধু বখাটেদের হাতে ১১০ নারী ও ৭ জন পুরুষ লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে খুন হয়েছেন ৩ নারী ও ২ পুরুষ। একই সময়ে ধর্ষণ ও গণধর্ষণে ২৮ জন নিহত, ধর্ষণের পর ৩৭ জনকে হত্যা, ১১টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।

এ সময় ৬৯২টি শিশু নির্যাতন, ৩৯২ শিশু ধর্ষণ এবং ২০৩ শিশু হত্যা করা হয়েছে। এই ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ/আটক ও রহস্যজনক নিখোঁজ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, হত্যার মতো অনেক নৃশংস ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, সারাদেশে গত ৫ বছরে (২০১৪-২০১৮ সাল) নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ২৭৪ নারী ও কন্যাশিশু। এ সময় ধর্ষিত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৮০ জন, গণধর্ষণের শিকার হন ৯৪৫ জন, ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩৪৯ জনের, আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭৩০ নারী-শিশুকে।

উদ্বেগজনক তথ্য হলো, গত ৫ বছরে যে সংখ্যক নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সেই সংখ্যার প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ২ হাজার ৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতিত হয়েছে গেল ৬ মাসে (জানু-জুন)। এই সময়ে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩১ জন নারী ও শিশু। যাদের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে ২৬ জনকে। এ ছাড়া এসিড সন্ত্রাস, যৌতুক, পাচার, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তো ঘটছেই। দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান এসব নির্যাতনের ঘটনার বিচার হয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। ২৬ এপ্রিল পঞ্চগড় কারাগারে অগ্নিদগ্ধ হন আইনজীবী পলাশ কুমার রায়। চার দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এরই মধ্যে নরসিংদীতে ফুলন রানী বর্মণ নামে এক কলেজছাত্রী ও জান্নাতি বেগম নামে গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান জানান, ফুলন রানী হত্যাকা-ে ৩ জন এবং জান্নাতির ঘটনায় ৫ জন আসামি গ্রেপ্তারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নৃশংস ঘটনাগুলোর যে কোনো একটি গণমাধ্যমে এলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে।

কিন্তু এরপর তদন্ত, চার্জশিট, আদালতে কচ্ছপ গতিতে চলা বিচার কার্যক্রম, সাক্ষীর গরহাজিরের কারণে বছরের পর বছর ধরে ভুক্তভোগীরা বিড়ম্বনার শিকার হন। অনেক সময় ঘুষের কারণে মামলার রায় আসে আসামির পক্ষে বা তারা জামিনে বের হয়। আর যেসব ঘটনার আড়ালে থেকে যায় সেগুলোয় আসামিরা গ্রেপ্তার পর্যন্ত হচ্ছে না। যে কারণে অপরাধীদের মধ্যে ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড করেও পার পাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে।

সামাজিক অপরাধ, সংহিসতা বা মানুষের মধ্যে ফুটে ওঠা নৃশংসতার চিত্র প্রায় সব জেলাতেই। একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনার জন্ম হয়। ঢাকা পড়ে আগেরটি। গত ৩ জুলাই সাভারে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে সবুজ (২৫) নামে এক তরুণকে মারধর করায় মারা যান। গত ১০ জুলাই কুমিল্লার দেবীদ্বারে দুই নারী ও এক শিশুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

২ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করে তার স্বামী। ১১ জুলাই ফেনীর পরশুরামে পারিবারিক কলহের জের ধরে বড় ভাইকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে তার ছোট ভাই ও ভাতিজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৩ জুন শরীয়তপুরের নড়িয়ায় যুবলীগ নেতা ইমরান সরদারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৪ জুন ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হাকিম মিঝিকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ৩০ জুন লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জয়নাল হোসেন (৩৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

২৮ মে নোয়াখালীর পশ্চিম মাইজদীতে পারিবারিক কলহের জেরে ছোট ভাইয়ের বঁটির কোপে বড় ভাই মাহে আলম (৪৫) নিহত হন। ২৪ মে নওগাঁর শৈলকূপায় রাসেল হোসেন (১৫) নামে এক স্কুলছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ বলছে, অপরাধ দমনে তারা বরাবরই তৎপর। এমনকি দুর্বৃত্ত/সন্ত্রাসীদের হাতে তারা নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছে। বগুড়ার সোনাতলার দিগদাইড়ের একটি মেলায় গত ১ মে জুয়ার আসর বন্ধ করতে যান থানা পুলিশ। কিন্তু মেলা কমিটির লোকজন চার পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে আহত করে। ওই ঘটনার পাঁচদিন পর রাজধানীর রামপুরার জামতলা এলাকায় রাসেল (১৯) নামে পুলিশের সোর্সকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনো তদন্তই চলছে।

রামপুরা থানার ওসি আবদুল কুদ্দুস ফকির জানান, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে রাসেলকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। পরিবার, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন এখন আগের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তাই অপরাধ প্রবণতাও বদলে গেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেছেন, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে সব অপরাধীকে সমান চোখে দেখে বিচারের আওতায় আনা গেলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন বলেন, অপরাধ আগে ছিল না সেটা নয়, এখন হার বেড়ে গেছে। সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু যেভাবে অপরাধ বাড়ছে সে হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে শাস্তি হচ্ছে না। বাংলাদেশে আইন আছে অথচ শাস্তির নিশ্চয়তা নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পুলিশের তদন্ত থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বছরের পর বছর ঘুরে ভুক্তভোগীরা বিচার না পেলেও সহিংস অপরাধী বেরিয়ে যাচ্ছে।

এ জন্য রাষ্ট্রকেই সর্বপ্রথম দ্রুততম বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ ত্বরান্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, এক সময় ইভটিজিংয়ের দৌরাত্ম্য ছিল। তখন মানুষ সামাজিকভাবে এটি প্রতিহত করেছে। এখনো সেভাবে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিকভাবে এসব অপরাধমূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন আমাদের সময়কে বলেন, পুরো সমাজেই সাধারণের মনে আতঙ্ক। একটা সমাজ যদি আদর্শবিবর্জিত হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনা যখন দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায়। দেশে যখন বিচার থাকে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক হিংসা অস্থিরতা থাকে। তখন রাষ্ট্র-সমাজকে দুর্বৃত্তরা তাদের স্বর্গরাজ্য মনে করে। এরা দুর্বলের ওপর আঘাত হানে। নারী ও শিশুদের দুর্বল মনে করে সর্বপ্রথম তাদের ওপর আঘাত হানছে।

advertisement