advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রাস্তায় শেষ ২৪ কোটি টাকা

সানাউল হক সানী
১২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯ ০১:৩৮
advertisement

রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন ও নগরবাসীর জীবনমান সহজ করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) হাতে নিয়েছিল তিনটি প্রকল্প। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৪ কোটি টাকা। মিনি ওয়েস্টবিন, সৌরবাতি ও বাগানবিলাস বৃক্ষ রোপণের নামে বিশাল অঙ্কের এই টাকার প্রায় সবটাই ব্যয় হলেও সুফল মেলেনি কোনো। ফলে করপোরেশনের আর্থিক ক্ষতি হলেও লাভবান হয়েছে একটি সিন্ডিকেট ও ঠিকাদাররা।

নগরবিদরা বলছেন, শহরজুড়ে এসব প্রকল্প তৈরির আগে এর সুফল বা কুফল নিয়ে মাঠ পর্যায়ের জরিপ পরিচালনা করা হয়নি। ঘাটতি ছিল সুষ্ঠু পরিকল্পনারও। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে রাজধানীর সড়কগুলোতে প্রায় ১১ হাজার মিনি ওয়েস্টবিন বসিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। আর এর জন্য মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

কিন্তু বর্তমানে এই বিনগুলোর অধিকাংশই উধাও হয়ে গেছে। কিছু ডাস্টবিন ব্যবস্থাপনার অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। ভালো বিনগুলোতে ফেলা ময়লা পরিষ্কারও করা হয় না। ফলে বিনগুলো কোনো কাজেই আসছে না। আবার কয়েকবার সংস্কার ও চুরি হওয়ার পর অনেক এলাকায় বসানো ডাস্টবিন পুনঃস্থাপন করতে হয়েছে। এতেও খরচ হয়েছে কয়েক দফা।

দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্যানুসারে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের আওতাধীন এলাকায় এক হাজারটি বিন স্থাপন করেছে। যার খরচ পড়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। বর্তমানে এসব বিনের প্রায় ৭০ ভাগেরও বেশি নষ্ট। অন্যদিকে ডিএসসিসি তাদের আওতাধীন এলাকায় ১০ হাজার ২৬০টি বিন স্থাপন করে। যাতে খরচ হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা।

এসব বিনেরও প্রায় ৭০ ভাগ নষ্ট। বাকিগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী। বিশাল অঙ্কের এ টাকা খরচ হলেও বিনগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল লাগানোর সময়ই। হালকাভাবে লাগানো স্টিলের এ বিনগুলো খুলে ফেলা সম্ভব অনায়াসেই। যদিও রাজধানীর বেশ কিছু আবাসিক এলাকা ও হাতিরঝিল এলাকায় অনেক ওয়েস্টবিন লাগানো থাকলেও এসব চুরি হওয়ার ভয় কম।

বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, অনেকগুলো বিন নষ্ট হয়ে গেছে এটা সত্যি। কিছু ক্ষেত্রে রাস্তায় উন্নয়ন কাজ হওয়ায় খুলে ফেলতে হয়েছে। অল্প কিছু চুরি হয়ে গেছে। তবে নতুন করে সব জায়গায় আবার বিন লাগানো হবে। কিছু রিপেয়ার করা হবে।

অন্যদিকে ডিএসসিসি এলাকার সড়ক বিভাজকের (ডিভাইডার) সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় প্রায় দুই বছর আগে। সড়ক বিভাজকে ফুলগাছ লাগিয়ে সৌন্দর্য বৃদ্ধির এ মেগা প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের জুনে। কিন্তু বাস্তবতা হলো যেসব স্থানে ফুলগাছ লাগানো হয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ গাছেই ফুল ফুটছে না। যদিও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দাবি, তারা গাছে ফুল ফোটাতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, অতীতে সড়কের সৌন্দর্যবর্ধন করা হতো বেসরকারিভাবে। বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব দু-চারটি বিজ্ঞাপন প্রচার করত। এতে সড়ক বিভাজকের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি এ খাতে রাজস্ব ব্যয় থেকে মুক্তি পেত সিটি করপোরেশন। কিন্তু সাঈদ খোকন ডিএসসিসির মেয়র নির্বাচিত হয়ে নগর ভবনে আসার এক বছরের মাথায় এ সংক্রান্ত সব চুক্তি বাতিল করে নতুন প্রকল্প হাতে নেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্প শুরুর আগে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল।

এর পর প্রায় আট কিলোমিটার সড়কের বিভাজকে বাগানবিলাস গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সড়কগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলাপ শাহ মাজার থেকে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড়, বঙ্গবাজার থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড়, রমনা থানার সামনে থেকে সবজিবাগান এলাকা এবং মতিঝিলের বলাকা চত্বর এলাকা। প্রকল্পের আওতায় সড়ক বিভাজকে ফুলগাছ লাগানোর পাশাপাশি তা সুরক্ষায় লোহার গ্রিল দেওয়ারও কথা ছিল।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভূঁইয়া অ্যান্ড কোংয়ের স্বত্বাধিকারী নুরু ভূঁইয়া কিছুদিন আগে আমাদের সময়কে বলেছিলেন, আমরা গাছ লাগিয়েছি। পরিচর্যাও করছি। এরপরেও গাছে ফুল না ফুটলে আমরা কী করতে পারি? উল্টো আমাদের বিল দিচ্ছে না করপোরেশন। এদিকে রাজধানীর সড়কগুলোয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সৌরবাতি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল ডিএসসিসি।

প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাথমিক অবস্থায় এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল কয়েকটি সড়কে। ওই সব সড়কে লাগানো সৌরবাতিতে আলোই জ্বলেনি। পরে সেখানে নতুন করে লাগানো হয় এলইডি বাতি। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন গচ্চা দিয়েছে সোয়া ২ কোটি টাকা। অন্যদিকে এলইডি বাতি লাগানো হলেও ওই সড়কের সৌর প্যানেলগুলো খুলে নেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরীক্ষামূলকভাবে সৌরবাতির প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয় রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ থেকে নটর ডেম কলেজ পর্যন্ত সড়কে। এ প্রকল্প সফল হলে পরবর্তী সময়ে আরামবাগ, বাংলামোটর, গুলশান, হাতিরঝিল, নাবিস্কো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তা স্থাপনের কথা ছিল। বিশেষ করে কাকরাইল-নটর ডেম কলেজ প্রকল্পে ৬১টি ল্যাম্পপোস্ট বসানো হয়েছিল।

প্রতিটি পোস্টের ওপর বসানো হয় সাড়ে ৫ ফুট আয়তনের এক জোড়া সোলার প্যানেল। ৬১ পোলে মোট ১২২টি বাতির এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে দরপত্রে সর্বনিম্ন ২ কোটি ২৪ লাখ ২১ হাজার ৬৫০ টাকার দরদাতা পাওয়ায় পুরো টাকার আর প্রয়োজন হয়নি। নগর ভবন সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজ নিতে ২১টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। তবে কাজ পায় এলাইক সোলার এনার্জি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বব্যাংক এ কাজের জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শতকরা ৪৩ ভাগ কম রেটে দরপত্র জমা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেলেও মানের দিক থেকে তা খুব ভালো ছিল না বলে নগর ভবনের বিদ্যুৎ সার্কেলের কর্মকর্তারা জানান। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পে বরাদ্দের অর্ধেক টাকায় দরপত্র পাওয়ায় নিম্নমানের জিনিসপত্র ব্যবহার করেছে। প্যানেলের বাতিগুলো ছিল মাত্র ৬০ ওয়াটের। অথচ এ সড়কে আগের সোডিয়াম বাতিগুলো ছিল ১৫০ ওয়াটের।

এ ছাড়া সোলার প্যানেল নিম্নমানের হওয়ায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বা কয়েকদিন বৃষ্টি হলে আর আলো পাওয়া যেত না। এ বিষয়ে ডিএসসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) মাহতাব হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে করা হয়েছিল। তবে সফলতা আসেনি। তাই সেখানে এলইডি বাতি লাগানো হয়েছে।

advertisement