advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গুরু পাপে লঘু দণ্ড!

চট্টগ্রাম ব্যুরো
১২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯ ০১:৪৩
advertisement

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) ইংরেজি বিভাগের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মাসুদ মাহমুদের গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার কাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে প্রতিষ্ঠানটির ৪ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ওই কাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এক শিক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য এবং অন্য তিনজনকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বহিষ্কৃতদের ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

গতকাল ইউএসটিসি প্রশাসন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানানো হয়। এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং এর ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন ভুক্তভোগী ড. মাসুদ মাহমুদ।

প্রবীণ এ অধ্যাপকের মতে, ন্যক্কারজনক এ কাণ্ডে সরাসরি জড়িত ২১ শিক্ষার্থী ও ৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করছেন। শুধু তাই নয়, যেসব ছাত্রী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির ‘মিথ্যে অভিযোগ’ এনেছেন এবং তাকে লাঞ্ছিত করার নেপথ্যে যারা ‘মদদ’ দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। বলেছেন, ইউএসটিসিতে তিনি আর শিক্ষকতা করবেন না।

প্রসঙ্গত গত ২ জুলাই দুপুরে অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদকে অফিস থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে রাস্তায় নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে লাঞ্ছিত করেন কতিপয় শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থীরাই এর পর ইউএসটিসির সামনের ব্যস্ততম জাকির হোসেন সড়ক ঘণ্টাখানেক অবরুদ্ধ করে রেখে প্রবীণ এ অধ্যাপকের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

বিষয়টি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কাজী নুর-ই-আলম সিদ্দিকী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একই বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. শেখ রাসেল শাহেন শাহ, স্নাতকোত্তর শ্রেণির মো. মইনুল আলম এবং মোহাম্মদ আলী হোসাইন নামে তিন ছাত্রকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

তবে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও কেন একজনকে স্থায়ী বহিষ্কার আর তিনজনকে মাত্র এক বছরের জন্য বরখাস্ত করা হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএসটিসির প্রক্টর কাজী নুর-ই-আলম বলেন, আমরা সবকিছু বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিয়েছি। আর উপমন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই পুলিশ সেই ব্যবস্থা নেবে।

অধ্যাপক ড. মাসুদ মাহমুদ আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিবেদন দেখে আমি হতাশ। তদন্ত কমিটি আমার কাছ থেকে বক্তব্য নিয়েছিল। আমি সুনির্দিষ্টভাবে ২২ জনের নাম উল্লেখ করেছিলাম। এ ছাড়া যেসব মেয়ে আমার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মতো অসত্য অভিযোগ এনেছিল, যারা কোনোদিন আমার ক্লাসও করেনি, তাদের বিরুদ্ধেও তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারাই তো পরে আমাকে অপমান করেছে। ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। তাই এ তদন্ত ও কর্তৃপক্ষের নেওয়া সিদ্ধান্ত আমি প্রত্যাখ্যান করছি। আমাকে অপমান করার সঙ্গে জড়িত ছাত্রছাত্রীদের খুশি করার তদন্ত এটা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত ভিসি, বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রার-কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি; সামান্যতম সহানুভূতি প্রদর্শনের সৌজন্যতাটুকুও দেখাননি। তাই ইউএসটিসির শিক্ষকতায় আর যাব না আমি। এদিকে সংবাদ সম্মেলনে ২২ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ড. মাসুদ মাহমুদের আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রক্টর বলেন, ওই দিন স্যারকে ওই চারজনই অপমান করেছেন। অন্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রীরাও তো এ দেশের নাগরিক। তারা তো মতপ্রকাশের অধিকার রাখেন। সুনির্দিষ্ট তথ্য না পেলে, মতপ্রকাশের জন্য তো কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। অন্যদিকে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী বলেন, মাহমুদুল হাসানকে প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ইউএসটিসির উপাচার্যের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করেছি।

রিমান্ড চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে- ঘটনা সে একাই ঘটিয়েছে। তবে আন্দোলনে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। আমরা তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের গায়ে কেরোসিন দেওয়ার ঘটনার পর পুলিশ ইউএসটিসির ক্যাম্পাস থেকে মাহমুদুল হাসানকে আটক করে। রাতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ কুমার বড়ুয়া বাদী হয়ে খুলশী থানায় শুধু মাহামুদুল হাসানকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

এ ঘটনা তদন্তে ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি গত ৮ জুলাই ইউএসটিসির উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে যেখানে ওই কা-ে চার শিক্ষার্থী জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটির সভায় সেই চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ বছর শিক্ষকতা করার পর বছর তিনেক আগে ইউএসটিসির ইংরেজি বিভাগে যোগ দেন অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ।

এক বছর আগে তিনি বিভাগটির উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। এর পর বিভাগের শৃঙ্খলা ফেরানো ও উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি কিছু উদ্যোগ নেন। এ উদ্যোগের জেরে কিছু শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস না করায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারান। এ ছাড়া দক্ষতার প্রশ্নে চাকরিচ্যুত হন কয়েকজন শিক্ষক। এর নেপথ্যে অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ রয়েছেন বলে মনে করছেন তারা। গত এপ্রিলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে মাঠে নামেন কিছু শিক্ষার্থী।