advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বুড়িগঙ্গা, টেমস, অতিশয়োক্তি ও থামতে জানা

চিররঞ্জন সরকার
১২ জুলাই ২০১৯ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯ ০০:১৩
advertisement

আমাদের দেশে মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর ‘ট্যাকসো’ আরোপ করা হলেও মন্ত্রী-এমপিদের কথার ওপর কোনো ‘ট্যাকসো’ নেই। আর তাই তো তারা মনের আনন্দে কথা বলেন। যা খুশি তাই বলেন। যা হয়েছে, তা যেমন বলেন, যা হওয়ার নয়, তাও বলেন। যেমন সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীকে বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আগামীতে টেমস নদী দেখতে লন্ডন নয়, বুড়িগঙ্গায় গেলেই হবে। এর আগে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, শেখ হাসিনার জাদুকরী নেতৃত্বে বদলে গেছে বাংলাদেশ। আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে লস অ্যাঞ্জেলেস মনে হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার দেখলে মনে হয় এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য!

সুন্দরের সঙ্গে তুলনা দেওয়া, নিজের দেশকে উন্নত করার বাসনা অবশ্যই ভালো। কিন্তু তার একটা সীমারেখা থাকা চাই। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া চাই। কিন্তু তাই বলে ঢাকা শহরকে লস অ্যাঞ্জেলেস, বুড়িগঙ্গাকে টেমসের সঙ্গে তুলনা?

আসলে আমাদের দেশের মানুষ এমনিতেই অতিশয়োক্তিতে অভ্যস্ত। তিলকে তাল বানানো, ইঁদুর দেখে এসে হাতির কবলে পড়ার গল্প ফাঁদাÑ এগুলো খুবই সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যখন যেটায় সুবিধা, তেমন সাজতে সাজাতে আমাদের দেশের মানুষের জুড়ি মেলা ভার। যখন গরিব সাজলে সুবিধা বেশি, তখন আমাদের দেশের একজন মিলিয়নিয়ারও নিজেকে ‘গরিব মানুষ’ হিসেবে পরিচয় দেন। আবার যেখানে ফুটানি দেখালে লাভ বেশি, সেখানে একজন ভিখারিও নিজেকে ‘বিরাট ধনী’ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। তবে বাড়িয়ে বলা বা অতিশয়োক্তির কারণে অনেক সময় বিপদও ঘটে। এ ব্যাপারে আমরা একটা পুরনো কৌতুক উল্লেখ করতে পারি।

রাস্তায় চলতে গিয়ে এক ছেলের খুব মনে ধরেছে এক মেয়েকে। সরাসরি মেয়েটিকে ভালো লাগার কথা ব্যক্ত করাতে মেয়েটির স্মার্ট জবাব, ফাজলামো করার সময় বা বয়স আপনার-আমার নয়। ভালো লেগে থাকলে আমার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়েটির কথায় ছেলেটি আশায় বুক বাঁধে কিন্তু নিজের অবস্থার কথা ভেবে দমে যায়। অনেক ভেবে এক বন্ধুকে জোগাড় করে, যে অতিশয়োক্তিতে খুব পারদর্শী। বন্ধুকে সে বলে, মেয়ের বাবা আমার বিষয়ে যা যা জিজ্ঞাসা করবে তুই সবকিছু বাড়িয়ে বলবি।

একদিন দুই বন্ধু মেয়ের বাসায় যায়। মেয়ের বাবা দুজনকেই আপদমস্তক চোখ বুলিয়ে জানতে চান আগমনের হেতু কী?

বন্ধুটি জানায়, এ আমার বন্ধু, আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, তাই এসেছি।

মেয়ের বাবা ছেলেকে বললেন : তোমার লেখাপড়া কী?

ছেলের বন্ধু : আংকেল অনেক, দেশের পড়া শেষ করে বিদেশেও উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছে।

মেয়ের বাবা : বাড়ি আছে নিজের?

ছেলের বন্ধু : আংকেল, একটা নয়, কয়েকটা আছে, সব ওর নিজের।

মেয়ের বাবা : গাড়ি আছে?

ছেলের বন্ধু : আংকেল, তাও লেটেস্ট মডেলের কয়েকটা আছে।

এমন অতিশয়োক্তি শোনার পর ছেলে হাসি আটকাতে গিয়ে খুক খুক করে কাশি দিয়ে ফেলে। কাশি শুনে মেয়ের বাবা বলেন : ছেলের কি কাশি আছে?

বন্ধুর তাৎক্ষণিক উত্তর : কাশি মানে আংকেল, একেবারে যক্ষ্মা, মাঝে তো ক্যানসারের দিকেই মোড় নিয়েছিল!

মেয়ের বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন, যাও বিদায় হও এমন কঠিন রোগীর সঙ্গে আমি মেয়ে বিয়ে দেব না!

আসলে কথা বলতে গেলে আমাদের অনেকেরই হুঁশ থাকে না। আমরা আসলে সময়মতো ‘থামতে’ জানি না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে দুজন বিখ্যাত ব্যক্তির সংলাপ।

একবার সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায় সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে একটি জলসা শুনতে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করতে থাকেন। শরৎচন্দ্র দিলীপকুমারকে বললনে, না ভাই ও সব কালোয়াতি গানটান আমি বুঝি নাÑ তুমিই যাও।

দিলীপকুমার নাছোড়বান্দা। কেবল বলতে থাকেন, দাদা, এ সে রকমের জলসা নয়। ঘরোয়া ব্যাপার, সেখানে যে কালোয়াতটি আসবেন তিনি একজন খুব উঁচুদরের গুণী, আপনি তার গান শুনলে মোহিত হয়ে যাবেন। চমৎকার গান, একবারটি শুনেই না হয় চলে আসবেন, তবু চলুন।

শরৎচন্দ্র সব শুনে একটু চিন্তিতভাবে বলে উঠলেন, হুঁ, তুমি যা বলছ দিলীপ, সবই বুঝলুম, গুণী লোক, গানও গায় ভালো, কিন্তু থামে তো?

দিলীপকুমারসহ উপস্থিত সবাই শরৎচন্দ্রের এ কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন, কিন্তু শরৎচন্দ্রের এ প্রশ্নটি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা অনেক কিছু শিখেছি কিন্তু কোথায় থামতে হয়, সেটাই শিখিনি। আমাদের গান থামে না, বক্তৃতা থামে না, কথা থামে না, উপদেশ থামে না, ধর্মীয় বয়ান থামে না, গালাগালি তো থামতেই চায় নাÑ এ এক মরণ জ্বালা।

আমরা ছোটবেলা থেকে উপদেশ শুনতে আরম্ভ করলামÑ তা আর থামল না। গুরুজনরা আমাদের ভালো করার জন্য এত উপদেশ বিতরণ করলেন যে, সব করণীয় কাজ ভুলে গেলাম। এ যেন সরকারের নিত্যনতুন আইন পাস ও তা অনুসরণের নির্দেশÑ সব ধারাগুলো মুখস্থ থাকলে ভালো উকিল হওয়া যায়, টেলিভিশনের টকশোয় ডাক পাওয়া যায়, আর তা না হলে আহাম্মক পাবলিকের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই করো না, তাই করো না, এই কর, তাই কর বলতে বলতে আমাদের আর কোনো কিছু করতে হলো না, একেবারে কাজের বাইরে চলে গেলাম! তারা যদি উপদেশ একটু স্বল্পমাত্রায় দিতেনÑ উপকার হতো। মাত্রা বাড়াতেই বিপদ হয়ে গেল। ওভারডোজ আমাদের হজম হলো না!

এদের পর আরম্ভ হলো মাস্টারসাহেবদের উপদেশ। তার পর অফিসের কর্তাদের, তারও পর বন্ধুদের। সর্বশেষ বাড়ির লোকদের। কেউ কখনো থামলেন না। এদের সবার নজর এড়িয়ে একটু ড্রইংরুমে নিঃসঙ্গ বসে টিভি দেখবেন? সেখানেও ‘জাতীয় চাপাবাজদের’ নিয়মিত উপদেশ বর্ষণের ঠ্যালায় মাথা-টাতা সব গুলিয়ে যাবে!

কাজকর্ম সমাজ-সংসার সব ত্যাগ করে ধর্মঘট তো আর করা যায় না! তাতে রাজনীতিকদের জীবন চলে; কিন্তু আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জীবন চলে না! আমাদের করে খেতে হবে, লড়ে যেতে হবে!

অথচ কারোর জীবনেই কোনো দুর্ভোগ হয় না, যদি যথাস্থানে থামার আর্টটা সবার জানা থাকে। গরগর করে হম্বিতম্বি পর্যন্ত ভালো, কিন্তু হুট করে কারো নাকে ঘুষি বসিয়ে দেবেন না কখনো, তা হলেই সর্বনাশ। প্রতিপক্ষকে কখনো কিলের ওজন বুঝতে দিতে নেই। বাগ্যুদ্ধ করে, মুখে মুখে যত খুশি রাজা-উজির মারুন, কেল্লা ফতে করুন, কিন্তু খবরদার নিজে থেকে কখনো সত্যি যুদ্ধ করতে যাবেন নাÑ মারা পড়বেন। কিন্তু মজা এমন যে, একবার পরিপূর্ণ আবেগ এলে তার বেগকে ঠিক তালমাফিক থামানোর কায়দা দেশবাসীর জানা নেই।

ঋষিরা বলেছেন : চরৈবতিÑ আরও এগিয়ে চলো বাবা, থেম না। তবেই ব্রহ্মমাকে উপলব্ধি করতে পারবে। কিন্তু আমরা সেদিকে না এগিয়ে যতসব বিদ্ঘুটে ব্যাপারের দিকে এগিয়েছি। অনেক ব্যাপারে থেমে যাওয়াটা যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, এটা আমাদের দেশে কে কাকে বোঝাবে?

যথাসময়ে যথাস্থানে থামতে না জানলে পরিণতি কী হয়, তার প্রমাণ আমরা অতীতে নানা ঘটনায় দেখেছি। তার পরও আমরা কেউ কিছু শিখছি না!

চতুর্দিকে আমাদের এত বিপদ ঘনিয়ে আসছে কেন? কারণ আমরা থামতে জানি না। নাচ, গান বক্তৃতা, গলাবাজি, হুজুগ, মিথ্যাচার, পরচর্চা, আন্দোলন, শোভাযাত্রা, টকশো, গোলটেবিল বৈঠক, শোকসভা, গালাগাল কিছুই বাদ পড়ছে না! অবাধ, নিরঙ্কুশ, স্বাধীন ও অশ্রান্তভাবে একটা বিষয় নিয়েই অবিরাম মোচ্ছব চালিয়ে যাচ্ছি, থামার নাম নেই আমাদের।

কিন্তু থামা দরকার। রসিকমাত্রই কোথায় থামতে হয়, ঠিক জানেন। ঈশ্বরকে বলা হয়Ñ রসো বৈ সঃ অর্থাৎ তিনি প্রকৃত সুরসিক! তার প্রমাণÑ যথাসময়ে তিনি আমাদের নাচনকোদন ও আস্ফালনকে একেবারে জন্মের মতো থামিয়ে দেন!

তবে থামিয়ে দেওয়ার চেয়ে নিজে নিজে যে থামতে জানেন, সেই প্রকৃত বিচক্ষণ বা জ্ঞানী। হায় এমন বিচক্ষণ বা জ্ঞানী মানুষ আমরা কোথায় পাব?

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক