advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাংলাদেশের লাখপতি কোটিপতি সমাচার

১৩ জুলাই ২০১৯ ০০:০০
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৯ ০৮:৪০
advertisement

বাংলাদেশে বর্তমানে কোটিপতির সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন। না, এটি কোটিপতির সংখ্যা নয়, ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি জমা রেখেছেন এমন আমানতকারীর সংখ্যা। এই সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ৫ হাজার ৬৪০ জন করে বেড়ে চলেছে। তা হলে প্রকৃত কোটিপতির সংখ্যা কত? আর প্রতিবছর কতজন প্রকৃত অর্থে কোটির সীমারেখা পেরিয়ে খান্দানি কোটিপতি হচ্ছেন?

এ ব্যাপারে সত্যিই কোনো তথ্য নেই। তবে বাস্তবে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা যে আরও অনেক বেশি সে কথা তো সহজেই বোঝা যায়। এক সময় এ দেশের মানুষ লাখপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখত। লাখ টাকার অবশ্য অনেক দাম ছিল তখন। দশ-বিশ গ্রাম ঘুরেও একজন লাখপতি পাওয়া যেত না। যদি কেউ লাখপতি হতেন তা হলে তিনি তার ইজ্জত বাড়ানোর জন্য রাতে লাখের বাতি জ্বালাতেন। বাড়ির পাশে একটা উঁচু গাছের ওপর বাঁশ বেঁধে তার ওপর লাল কাপড়ে ঢাকা হারিকেন রাতভর আশপাশের এলাকার মানুষকে জানান দিত যে, এখানে একজন লাখপতি আছেন।

এই লাখের বাতি সমাজে লোকটির মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দিত। আগের দিনে ধনী হওয়ার এই প্রদর্শনী যে শুধু বাংলাদেশে সীমিত ছিল তা নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায়ও এই লাখের বাতি জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত ছিল। লাখপতির কথাই বা বলি কেন? আমাদের দেশে কেউ কেউ হাজার টাকার মালিক হলেই নামের শেষে ‘হাজারী’ শব্দটি যোগ করে দিতেন। এই ‘হাজারী’ শব্দ যোগ করার মানে হলো যে, তিনি কমপক্ষে এক হাজার টাকার মালিক। এখনো বংশপরম্পরায় এই হাজারীরা বাংলাদেশে আছেন। তাদের অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন, কিন্তু নামের শেষে ‘হাজারী’ শব্দটিই ধনশালীর আলো ছড়াচ্ছে।

পৃথিবীতে টাকা বা কয়েন আবিষ্কারের আগে ভারতবর্ষে কড়িকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ঠিক এভাবেই বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার মানুষ বিভিন্ন জিনিসকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। এগুলোর ভেতর আছে হামিং বার্ডের পালক, লবণ, কুড়াল, তামাকগাছের ডালপালা, পশুদের দাঁত, ঝিনুক, তিমি মাছের দাঁত, টিনের তৈরি টুপি, হাতের বালা, সামুদ্রিক প্রাণীর খোলস, মানুষের মাথার খুলি, চায়ের পাতার পুঁটুলি ইত্যাদি। প্রশান্ত মহাসাগরের ইয়াপ দ্বীপে পাথরের চাকাকে টাকা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখানে পাথরের চাকার মাঝখানে ফুটো করা হতো। তার পর এর ভেতর দিয়ে লাঠি ঢুকিয়ে দুজন লোক কাঁধে করে এই টাকা বাজারে নিয়ে যেত। সেই দ্বীপে যার কাছে যত বেশি পাথরের চাকা থাকত সে তত ধনী বলে বিবেচিত হতো।

কোনো লোক কত ধনী তা মানুষকে জানানোর জন্য বাড়ির সামনে অনেকগুলো পাথরের চাকা ফেলে রাখা হতো। ব্যাংকে আমানত রাখার দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় দশ বছর আগে এ দেশে কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯ হাজার ১৬৩ জন। অর্থাৎ দশ বছরে আমানতকারী কোটিপতির সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশে সরকারের দারিদ্র্যমুক্তকরণ প্রোগ্রাম চলমান রয়েছে। দেশের সব মানুষের মাথায় ব্যাংকিং ছায়া প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দরিদ্র বা অতিদরিদ্র মানুষের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। আবার গ্রহহীনদের জন্য ন্যূনতম মাথা গোঁজার ঠাঁই প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদানের কথা প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নকরণের লক্ষ্যে যাবতীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় দেশের মানুষের গড় আয় বৃদ্ধি পাবে, তাদের জীবনে কিছুটা হলেও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আসবে এটাই স্বাভাবিক।

আর উন্নয়ন কার্যক্রম চলাকালে কিছু লোক কাজ করবে, তাদের পকেটে টাকা যাবে, এটা বিচিত্র কিছু নয়। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, এ সংবাদটি ঝুঁকিযুক্তভাবে ইতিবাচক। এটি নির্ভেজালভাবে ইতিবাচক নয়। দেশের মানুষের হাতে এই যে টাকা আসছে, এর উৎস কী? যদি এই টাকার উৎস যথাযথ হয়ে থাকে তা হলে সংবাদটি ইতিবাচক। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে অনেকেই শিল্পপতি হয়েছেন। তারা দেশে-বিদেশে পণ্য বিক্রি করে ব্যবসায়িক স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ঘরে টাকা আনছেন। আয় অনুসারে এই লোকগুলো করও পরিশোধ করছেন। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে ঠিকাদারি করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় টাকা রোজগারও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু টাকা যদি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘বালিশ’ কেনার মতো ঘটনা ঘটিয়ে উপার্জিত হয় তা হলে এ ধরনের আর্থিক উপার্জন ও অগ্রগতি দেশের উপকারে আসবে না। প্রথমত, দুর্নীতির জন্য সরকারি দায়িত্ব পালন করা হয় না।

তা ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা বৈধ আর্থিক খাতে প্রবেশ করতে পারে না। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকার প্রতি দরদও কম থাকে বিধায় অনেক অন্যায় কাজে খরচ করা হয়। দেশে মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি করতে পারে এ ধরনের দুর্নীতিলব্ধ টাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতির টাকা বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। এ ধরনের পাচার দেশে হুন্ডি ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। আর হুন্ডি ব্যবসায়ের সূত্র ধরে দেশে চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদকের আমদানি বেড়ে যায়। নিজেদের অবৈধ টাকাকে পাহারা দেওয়ার জন্য সন্ত্রাসীদের লালন করতে হয়।

এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসে অর্থায়ন করে হলেও শত্রু দমন বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজ পরিচালনার উদ্যোগ নেয় এই অবৈধ সম্পদের মালিকরা। আবার সরকার যদি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করে দেশে একটি স্বচ্ছ অর্থনীতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে তা হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা দেশকে দ্রুত উন্নত দেশে পরিণত করবে। সে উন্নয়ন হবে স্থায়ী ধরনের উন্নয়ন। দেশের ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন মানুষ তাদের টাকা লুকিয়ে রাখেননি। তারা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। এই টাকা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগছে। আশা করা যায়, এই মানুষদের হিসাবে সঞ্চিত টাকা বৈধপথে রোজগার করা হয়েছে। তাই তারা সাহস করে ব্যাংকে রেখেছেন।

যদি তা না হতো, তা হলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের জালে হয়তো তারা ধরা পড়তেন। কারণ ব্যাংকে লেনদেনের ক্ষেত্রে সবগুলো ব্যাংকই নগদ লেনদেন রিপোর্টিং এবং সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং করে থাকে। ব্যাংক থেকে যারা প্রথাবিরুদ্ধভাবে জাল কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নিতে সক্ষম হয়েছেন তারাও হয়তো কোটিপতি। কিন্তু দেশের ভেতর তাদের সম্পদের হদিস পাওয়া যায় না। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা যায়। এই লোকগুলো দেশের চরম ক্ষতি করেছে। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, এ কথা আমরা সবাই জানি।

এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কোনো কারসাজি আছে কিনা, নাগরিকদের হাতে আসা টাকা স্বচ্ছ উপায়ে অর্জিত কিনা এবং এই টাকার ব্যবহার কোন খাতে হচ্ছে, ঝিলিমিলি অর্থনীতির পেছনে কোনো রাক্ষুসে ঘুণপোকা সবকিছু কেটে নাশ করে দিচ্ছে কিনা-এগুলোর সবই সরকারকে সচেতনভাবে দেখতে হবে। সমাজে যেমন ভালো মানুষ আছে, তেমনি আছে খারাপ মানুষ। একটুখানি সুযোগ পেলে এই খারাপ মানুষগুলো দেশের অর্থনীতিকে খুবলে খেয়ে ফেলবে। সেজন্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও অসৎ ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎকারীদের দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

অন্যথায় দিনে দিনে দুর্নীতিবাজের সংখ্যা বাড়বে, অন্যায় করা নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে; তখন আর শত চেষ্টা করেও এই অন্যায়কারীদের প্রতিহত করা যাবে না। উদাহরণ হচ্ছে ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী মোটরসাইকেল। এদের এখন আর সামলানো যাচ্ছে না। 

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement